একজন শিশু, চোখে দেখে কম। মা পথেঘাটে ভিক্ষা করেন। মেয়েকে কোথায় রেখে যাবেন, সেটা ভেবে পথে সঙ্গে নিয়েই থাকেন। সকালে ভিক্ষা করতে গিয়ে বাসায় ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। এই মায়ের সঙ্গে থাকা সেই মেয়েশিশু মিমের জীবন বদলে যায় পথশিশুদের ‘মজার ইশকুলের’ উদ্যোগে। ২০১৭ সালে ভর্তি করে নেওয়া হয় তাকে। চিকিৎসক দেখিয়ে জানা যায়, কিছু সহায়তা পেলে সে চোখে দেখবে ও পড়তে পারবে। সঙ্গে ছিল স্কুলের শিক্ষক ও সহপাঠীদের সহায়তা। পড়াশোনা শুরুর পর মিম ভাবতেন— যারা এই সহায়তাটুকু পায় না, তাদের জন্য সবাই মিলে কিছু একটা করবেন। কেবল একা এগিয়ে গেলে তো দিন বদলাবে না, দিন বদলে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সামনে এগোতে হবে।
মিম আক্তার এখন ক্লাস নাইনে উঠেছেন। একইসঙ্গে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে— সেই স্কুলের শিশুশ্রেণির ক্লাস নেওয়ার। ছোট ছোট শিশুরা যখন নতুন জীবন শুরু করে, তখন ফেলে আসা কষ্ট ভুলে যান মিম। কেমন ছিল সেদিনগুলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একদম ভালো ছিল না। আম্মু কাজ করতো (পথে ভিক্ষাবৃত্তি), আমি কাজে সাহায্য করতাম। তখন স্বপ্ন দেখার সাহস পেতাম না। সকাল ৮টায় বের হতাম মায়ের হাত ধরে, আর ফিরতাম ৫টা-৬টার পরে। এখন স্বপ্ন দেখতে ভয় লাগে না। তবে এটাও ঠিক যে, এখন একা কিছু করার স্বপ্ন দেখি না। সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখি। রাস্তায় যে শিশুরা ভিক্ষা করে, তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে, তাদের স্কুলে ভর্তি করিয়ে জীবনটা বদলে দেওয়ার স্বপ্ন বুনি রোজ। ওদের ক্লাসে হাতে ধরে শেখানোর চেষ্টা করছি, নিজে শিখছি।’
কী পড়াতে হয় প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি ওদের সবই পড়াই। পাশাপাশি গানের ক্লাসও নিচ্ছি। গান শিখলেন কোথায়, জানতে চাইলে মিমের চটজলদি উত্তর— শেখার সুযোগ হয়নি, শুনে শুনে শিখেছি। ছোটবেলা থেকেই সবাই বলতো— আমার কণ্ঠ সুন্দর। আমি যেটুকু জানি, সেটা তাদের শেখানোর চেষ্টা করি। কিছু একটায় তারা নিজেদের যুক্ত রাখুক, এটুকুই চাওয়া।’
‘মজার ইশকুলের’ প্রধান শিক্ষক শাহনাজ পারভীন তার এই শিক্ষার্থীর জীবন-ভাবনা ও এখন সহকর্মী হিসেবে তাকে সঙ্গে পাওয়া নিয়ে উচ্ছ্বসিত। তিনি বলেন, ‘প্রথম দিকে মিম বেশ লজ্জা পেতো। আমাদের এখানে শিক্ষকরা খুব সহানুভূতিশীল। আমরা সবাই একসঙ্গে ভালো কিছু করতে চাই। এখানে কেউ নিজেকে আলাদা ভাবার সুযোগ নেই। মিম আমাদের খুব দক্ষ শিক্ষার্থী। এখন সে শিশুশ্রেণিতে পড়ানোর কাজ করছে।’ মিম নিজে চোখে দেখতো না, তাহলে কীভাবে পড়লো— জানতে চাইলে এই শিক্ষক বলেন, ‘আমরা তাকে চিকিৎসকের কাছে নিই। তিনি তাকে চশমা দেন, ম্যাগনিফায়িং গ্লাস দেন। সেগুলো ব্যবহার করে সে পড়তে পারে। জন্মগতভাবে তার চোখের মনিতে সমস্যা। ও যেন এসব নিয়ে হতাশাগ্রস্ত না হয়, আমাদের দিক থেকে সেসব মাথায় থাকতো।’