২০ স্থানে ‘ব্লকেড’, রাজধানী ‘স্থবির’

সরকারি চাকরিতে সব গ্রেডে ‘অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক’ কোটা বাতিলের এক দফা দাবিতে আন্দোলন চলছে। দাবি আদায়ে তৃতীয় দিনের মতো রাজধানীসহ সারা দেশে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা। সকাল ১০টার ‍দিকে তারা রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড় অবরোধ করতে শুরু করেন। বিকাল নাগাদ রাজপথের অন্তত ২০টি স্থান তারা অবরুদ্ধ করেছেন। এর ফলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে কার্যত স্থবির হয়ে গেছে পুরো রাজধানী।

বুধবার (১০ জুলাই) ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়ক ও রেলপথ ব্লক করেছেন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা। বিভিন্ন সড়কে আটকা পড়ে শত শত যানবাহন। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন লাখো মানুষ। বিশেষ করে সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ চরমে। রাস্তায় কোনও যানবাহন চলাচল করতে না পারায় শিশু, নারী ও বৃদ্ধসহ সবাই পায়ে হেঁটেই চলাচল করছেন।

অবরোধের কারণে যান চলাচল বন্ধ, বিভিন্ন রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে শত শত গাড়ি (ছবি: আসাদ আবেদীন জয়)

কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা সকালে প্রথমে রাজধানীর শাহবাগ ও সায়েন্স ল্যাব মোড় ব্লক করেন। পরে একে একে কাঁটাবন, নীলক্ষেত, ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড, বাংলামোটর, কাওরানবাজার, ফার্মগেট, বিজয়সরণি, মহাখালী, চানখারপুল, বঙ্গবাজার, শিক্ষা চত্বর, মৎস্য ভবন, জিপিও, গুলিস্তান, রামপুরা ব্রিজ, আগারগাঁও, হাতিরঝিলের মোড়ে ও মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারসহ ২০টির বেশির গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার মোড়ে ‘ব্লকেড’ তৈরি করেন তারা।

মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ফ্লাইওভার ও মগবাজার-সাতরাস্তা ফ্লাইওভারও ব্লক করে দেন আন্দোলনকারীরা।

এছাড়াও মহাখালী ও কারওয়ান বাজার রেলক্রসিংয়ে কাঠের গুঁড়ি ফেলে রেলপথ ব্লকেড করেছেন তারা। এতে ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

শাহবাগে কোটা আন্দোলনকারীদের অবরোধ (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)

সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ রাস্তায় যানবাহন আটকে আছে। কোনোদিকেই যাওয়ার মতো কোনও পরিস্থিতি নেই। গাড়ি নিয়ে বিপাকে পড়েন চালকরা। বাসের যাত্রীরা নেমে হাঁটা শুরু করলেও তারা গাড়ি রেখে কোথাও যেতেও পারছেন না।

মহাখালী এলাকায় এক ভুক্তভোগী ফাহিমুর আলম বলেন, এটা কেমন কথা, কোনও কিছু হলেই রাস্তা ব্লকেড। আন্দোলন মানে জনদুর্ভোগ। আমার চলাচলে নানা সমস্যা। এভাবে তো চলতে পারে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। কয়েক কিলোমিটার হাঁটতে হবে। কোনও যানবাহন চলবে না। এদিকে দেখা যায়, যানবাহন চলাচল করতে না পারায় হাজার হাজার মানুষ হেঁটে চলাচল করছেন।

শাহবাগে কোটা আন্দোলনকারীদের অবরোধ (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ডাক্তার দেখিয়ে মহাখালীর বাসায় ফিরছিলেন মধ্যবয়সী শফিক। তিনি বলেন, ডাক্তার দেখানোর পর বাসায় যাওয়ার জন্য কোনও গাড়ি পাচ্ছি না। কোনও রিকশাও চলছে না। কিছু পথ হেঁটে এলাম। এখন একটু বিশ্রাম নিচ্ছি। বাকি পথও হেঁটে যেতে হবে।

বাস ছেড়ে হেঁটে গন্তব্যে রওনা হন সাধারণ মানুষ (ছবি: আসাদ আবেদীন জয়)

কাওরানবাজার এলাকায় কথা হয় কোটা আন্দোলনের সেন্ট্রাল ভলান্টিয়ার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী নিহাল মোহাম্মদ আসিফের সঙ্গে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছি। আমার দাবি আদায়ে রাস্তা ব্লকেড কর্মসূচি পালন করছি। এতে সাধারণ মানুষের সাময়িক দুর্ভোগ হলেও গোটা জাতির স্বার্থে তারা এটা মেনে নিচ্ছেন। অনেক সাধারণ মানুষ আমাদের আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন। তারা আমাদের যৌক্তিক আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে সাময়িক দুর্ভোগ মেনে নিচ্ছেন। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই আমাদের দাবি মেনে নিন। দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

শাহবাগে কোটা আন্দোলনকারীদের অবরোধ (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)

এদিকে সরকারি চাকরির প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ে চার সপ্তাহের স্থিতাবস্থা জারি করেছেন আপিল বিভাগ। পৃথক দুটি আবেদনের পর প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ আজ বুধবার এ স্থিতাবস্থা জারি করেন। তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা এ আদেশ প্রত্যাখ্যান করে দেশজুড়ে চলমান ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

অবরোধের কারণে নানা রকম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে (ছবি: নাসিরুল ইসলাম)

আপিল বিভাগের আদেশের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আদালতের সঙ্গে আমাদের আজকের আন্দোলনের কোনও সম্পর্ক নেই। আমরা মূলত নির্বাহী বিভাগের কাছেই কোটা সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান চাইছি। এক দফা দাবি। এটি আদালতের এখতিয়ার নয়। এটি একমাত্র নির্বাহী বিভাগই পূরণ করতে পারবে। সরকারের কাছ থেকেই আমরা সুস্পষ্ট বক্তব্য আশা করছি।’