নারী অধিকার কমিশন-শ্রমিক অধিকার কমিশন হবে কবে!

সংস্কারের অনেক কমিশন হচ্ছে কিন্তু নারী অধিকার কমিশন, শ্রমিক অধিকার কমিশন গঠনের কোনও খবর নাই। কবে এই কমিশন গঠন করা হবে? বিদ্যমান সংবিধান জনজীবনে নারীদের অধিকার দিয়েছে কিন্তু পারিবারিক অধিকার, সম্পত্তির অধিকার রয়ে গেছে যার যার ধর্মের অধীন।

শনিবার (২১ সেপ্টেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে ‘গণঅভ্যুত্থান ও নারী প্রশ্ন’ শীর্ষক এক সংলাপে এসব কথা বলেন বিভিন্ন শ্রেণিপেশার নারীদের নিয়ে গঠিত প্ল্যাটফর্ম ‘ক্ষুব্ধ নারী সমাজ’।

এই সংলাপে অংশ নেন সমাজের বিভিন্ন অংশের নারী, আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নারী, ছাত্র নেতৃত্ব, শিক্ষক, শিল্পী, থিয়েটার এক্টিভিস্ট, আলোকচিত্রী এক্টিভিস্ট, ডাক্তার, নার্স, আইনজীবী, সাংবাদিক, যৌনকর্মী, গার্মেন্টশ্রমিক, নারী সংগঠনের নেতা, আন্দোলনে নিহত ও আহতদের অভিভাবকসহ সমাজের বিভিন্ন অংশের নারীরা।

সংলাপে বক্তারা বলেন, জুলাই-আগস্ট মাসের ছাত্র-শ্রমিক-জনতার স্বৈরাচারী দুঃশাসনবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অর্জিত গণঅভ্যুত্থান আমাদের নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখার সাহস দিয়েছে। নতুন রাজনৈতিক পরিবেশে পুঁজি ও পুরুষতন্ত্রের শৃঙ্খল ভেঙে নারী-পুরুষসহ সবার জন্য মর্যাদাপূর্ণ নতুন বাংলাদেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষা দানা বেঁধেছে।

পুলিশের গুলির সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো একজন আবু সাঈদ হয়ে ওঠেন ’২৪-এর মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রামের প্রতীক। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব লিঙ্গ-জাতি-ধর্মের মানুষকে দায়বদ্ধ করে আবু সাঈদ। সাঈদের মতো শহীদের পেছনে থাকা সেই মায়েরা ছিলেন এই আন্দোলনের সৈনিক। সব বাধা-ভয় পেরিয়ে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানের রূপ দেয়। ফ্যাসিবাদী অন্যায়, অবিচার ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতি সমর্থন-সংহতি জানায় সাধারণ জনগণ।

বক্তারা বলেন, সংস্কারের অনেক কমিশন হচ্ছে কিন্তু নারী অধিকার কমিশন, শ্রমিক অধিকার কমিশন গঠনের কোনও খবর নাই। সংবিধান প্রণয়নের দাবি উঠেছে। নারীরা তাতে অংশগ্রহণ করবে। নারী হিসেবে আমাদের মতামতকে রাষ্ট্র গঠনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে, তাই সংবিধানে নারী অধিকার নিয়ে যে দুর্বলতা রয়েছে বিশেষত সম্পত্তিতে নারীর অধিকারের প্রশ্নে সব ধর্মের নারীরা যেন একইভাবে সম্পত্তির অধিকার পেতে পারেন।

নারীদের অধিকার রক্ষায় ক্ষুব্ধ নারী সমাজের নেতারা বেশ কিছু প্রত্যাশা ব্যক্ত করছেন। সেগুলো হলো–

১. নাগরিক ও মানুষ হিসাবে রাষ্ট্রে বাঁচা ও জীবন ধারনের অধিকার চাই।

২. গণতন্ত্র-জবাবদিহি-স্বচ্ছতা ঘর-সংসার-সংগঠন-দল ও রাষ্ট্র সর্বত্র নারীকে দেখতে চাই।

৩. নারীর অধিকার বাস্তবায়নে রাষ্ট্র ও সংবিধানের সংস্কার চাই।

৪. সারা দেশে অব্যাহত ধর্ষণ-যৌন নিপীড়নের সঙ্গে যুক্তদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

৫. হাইকোর্ট প্রণীত যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালাকে সব প্রতিষ্ঠানে-কারখানায় বাধ্যতামূলক ও কার্যকর করতে হবে। একইসঙ্গে সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ (সংশোধিত) এর ১৪৬ (৩) ধারা সংশোধনসহ সব নারীবিদ্বেষী আইন বাতিল করতে হবে।

৬. সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় সংসদে নারীর ন্যূনতম ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠায় শতকরা ৩০ ভাগ নারী ও ট্রান্সজেন্ডারদের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে। একইভাবে অন্যান্য স্থানীয় নির্বাচনগুলোতেও এই অনুপাতে প্রতিনিধি মনোনয়ন ও নির্বাচনের অধিকার দিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোতেও একই হারে প্রতিনিধি মনোনয়ন দিতে হবে।

৭. পারিবারিক ও উত্তরাধিকার আইনে নারী-পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠায় নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সংক্রান্ত কনভেনশন দলিলের পূর্ণ স্বীকৃতি ও বাস্তবায়ন করতে হবে। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব মানুষের জন্য অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়ন করতে হবে। বিয়ে, বিয়ে বিচ্ছেদ, সন্তান লালন-পালনে নারী-পুরুষের সমানাধিকার এবং দায়িত্ব নির্ধারণ নিশ্চিত করতে হবে।

৮. সব ধরনের পেশায় মজুরি, পদমর্যাদা এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ বৈষম্য দূর করতে হবে। প্রতিষ্ঠানে বা কারখানায় ন্যূনতম শতকরা ৩০ ভাগ নারীকর্মী নিশ্চিত করতে হবে, পরিচালনা পর্ষদেও একই অনুপাত বজায় রাখতে হবে।

৯. পেশাজীবী-শ্রমজীবী সব নারীর জন্য ছয় মাস বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা করতে হবে এবং যথাযথ কার্যকর করতে হবে। একইভাবে সব প্রতিষ্ঠানে-কারখানায় অন্তত ১৫ দিনের সবেতন পিতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা করতে হবে।

১০. সব কারখানা-প্রতিষ্ঠানে শিশুদিবা যত্নকেন্দ্রের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বড় শহরগুলোতে ওয়ার্ডভিত্তিক সস্তায় শিশুদিবা যত্নকেন্দ্রের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ঋতু সাত্তারের সঞ্চালনায় সংলাপে অংশ নেন– অন্তর্বর্তী সরকারের মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, নারী অধিকার ও মানবাধিকারকর্মী শারমিন মুর্শিদ, নারীগ্রন্থ প্রবর্তনার সীমা দাস সীমু, বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির তসলিমা আখতার, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত গার্মেন্টস শ্রমিক সুমনের মা এবং শহীদ মুগ্ধের দাদি। এছাড়াও ছিলেন– ফাতেমা রহমান বিথি, বৈষম্যবিরেধী শিক্ষার্থী উমামা, বাংলাদেশ গার্মেন্ট সংহতির অপরাজিতা, শ্যামল শীল, বিথি ঘোষ প্রমুখ।