শুক্রাবাদে দগ্ধ তিন জনের মৃত্যু

একই কক্ষে ছয় মাসে দুবার গ্যাস বিস্ফোরণ, আতঙ্কে স্থানীয়রা

সম্প্রতি রাজধানীর শুক্রাবাদের একটি বাসায় গ্যাস বিস্ফোরণে শিশু সন্তানসহ এক দম্পতি দগ্ধ হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় একে একে মারা গেছেন সবাই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই একই কক্ষে ছয় মাস আগেই একবার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সেসময়ের দুর্ঘটনায়ও একজন প্রাণ হারিয়েছেন। পরপর এই দুই বিস্ফোরণের ঘটনায় এখনও কোনও মামলা দায়ের হয়নি। জানা যায়নি বিস্ফোরণের কারণও। তবে ভুক্তভোগীদের পরিবারের ধারণা, গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকেই এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটতে পারে। যদিও সংশ্লিষ্টরা যাচাইয়ের পর গ্যাস লাইনে কোনও ত্রুটি না থাকার কথা জানিয়েছেন। ফলে এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

গত শনিবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে গ্যাস লিকেজ থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একই পরিবারের বাবা, মা ও তাদের তিন বছরের একটি শিশু সন্তান দগ্ধ অবস্থায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। পরে মঙ্গলবার (১ অক্টোবর) রাতে স্বামী টোটন মিয়া (৩৫) এবং পরদিন বুধবার (২ অক্টোবর) স্ত্রী নিপা আক্তার (৩০) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাদের শরীরে ৫০ ও ৩০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছিল। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (৩ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে তাদের একমাত্র সন্তান মো. বায়জিদ (৩) মারা গেছেন। তার শরীরে ৪৫ শতাংশ দগ্ধ ছিল।

বাড়ির মালিকের আত্মীয় ও প্রতিবেশী সনিয়া ইসলাম বলেন, ওই দিন বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনে বাইরে বেরিয়ে দেখি টোটন মিয়া আগুনে পোড়া অবস্থায় রাস্তায় বেরিয়ে এসেছেন। এর একটু পরই তার স্ত্রী নিপাও দগ্ধ অবস্থায় বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসেন। পরে রুমের ভেতর থেকে তাদের শিশু সন্তানকে উদ্ধার করে সবাইকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

শুক্রবাদের ওই বাসার বাইরের দিকে দেখা গেছে একাধিক গ্যাসের লাইন

নিহতদের আত্মীয় মানিক জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী থানার ছাতিরচর গ্রামের। টোটন মিয়া পুরান ঢাকার একটি প্লাস্টিক কারখানায় কাজ করতো। আর নিপা আক্তার গৃহিণী ছিলেন। তারা শুক্রাবাদ এলাকায় ৩২/৪ নম্বর বাড়িতে একটি রুমে ভাড়া থাকতেন। তবে এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে কোনও মামলা করা হবে না বলেও জানান নিহতদের স্বজনরা।

বাড়ির মালিকের চাচাতো ভাই আনোয়ার হোসেন বলেন, এই বাড়িতে একই রুমে গত রমজান মাসে সকালে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল। পরে দগ্ধ সেই ছেলেটি চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৭ দিন পর মারা যান। 

জানা যায়, মারা যাওয়া ওই যুবকের নাম রাকিবুল ইসলাম (২৫)। তিনি ধানমন্ডির একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করতেন। গত মার্চ মাসে তিন জন ব্যাচেলর ওই রুমটি ভাড়া নেন। গত ২২ মার্চ রোজার সময় সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রুমের ভেতরের টয়লেটে গিয়ে সিগারেট খেতে আগুন ধরান। ঠিক ওই সময় বিকট বিস্ফোরণে রাকিব দগ্ধ হন। ওই ঘটনার পর কোনও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানা যায়নি।

শুক্রবার (৪ অক্টোবর) বিকালে শুক্রাবাদের সেই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তিনতলা বাড়িটির নিচতলায় ছয়টি কক্ষে ছয়টি পরিবার ভাড়া থাকে। দোতলায় চারটি কক্ষে চারটি পরিবার ও তিনতলায় বাড়ির মালিক নিজাম উদ্দিন পরিবার নিয়ে থাকেন। নিচতলায় দক্ষিণ-পশ্চিম কর্নারে একটি কক্ষে পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকতেন টোটন মিয়া। গত জুলাই মাসে তিনি ঘর ভাড়া নেন। 

ওই কক্ষটিতে গিয়ে দেখা যায়, রুমের ফ্লোরে একটি তোশক ও কিছু হাঁড়ি-পাতিল রয়েছে। ঘরের জানালার পাশে তোশক ও প্লাস্টিক জাতীয় কিছু জিনিসপত্রের পোড়া অংশ পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

জানালার পাশ দিয়ে তোশক ও প্লাস্টিক জাতীয় কিছু জিনিসপত্রে পোড়া অংশ পড়ে থাকতে দেখা গেছে

স্থানীয়রা জানান, এই কক্ষে গত ছয় মাসের ব্যবধানে দুবার গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। অথচ বাড়ির মালিক বিষয়টি আমলে নেননি। বাড়ির আশপাশে একাধিক গ্যাসের পাইপ রয়েছে। এসব পাইপ থেকে গ্যাস বের হতে পারে।

বাড়ির মালিক নিজাম উদ্দিন বলেন, ওই ঘটনার পর আমি গ্যাস লাইন চেক করিয়েছি। কোনও লিকেজ পাওয়া যায়নি। এবারও লোকজন এসে চেক করে লিকেজ পায়নি। কেন পর পর এমন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলো কেউ বলতে পারছেন না। আমি বিষয়টি থানাকে অবগত করেছি।

তিতাসের সোবাহানবাগ জোন অফিসের উপমহাব্যবস্থাপক নজিবুর রহমান বলেন, ঘটনার পর পর আমাদের একটি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ওই রুমের ভেতরে আমাদের কোনও লাইন সংযোগ নেই। কী কারণে বিস্ফোরণ হয়েছে তা এখনও জানা যায়নি। এটি এলপিজি গ্যাস, বায়োগ্যাস নাকি অন্য কোনও কারণে হয়েছে তা পুলিশের তদন্তের পর জানা যাবে।

শের-ই-বাংলা নগর থানা অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) মোজ্জামেল হক বলেন, এ ঘটনায় তিতাস কর্তৃপক্ষ সাধারণ ডায়েরি করেছে। তবে বিস্ফোরণের কারণ এখনও জানা যায়নি। মৃতদের স্বজনরাও কোনও অভিযোগ করেনি। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।