‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন শুধু মানুষ বদলেছে, সিস্টেম বদলায়নি’

‘ফ্যাসিবাদী সরকার মাত্র ৩৬ দিনে ১৫০০ মানুষকে হত্যা করেছে, ৩০ হাজার মানুষকে আহত করেছে এবং প্রায় ৪ হাজার মানুষকে অন্ধ করা হয়েছে যেটা এদেশের বিগত স্বৈরাচারী শাসকদের সময়ও করা হয়নি। আমরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলাম। কিন্তু আমরা এখন কী দেখছি? আমরা দেখছি রাষ্ট্র সংস্কারে নারীদের বাদ দেওয়া হয়েছে, পাহাড়ী আদিবাসীদের বাদ দেওয়া হয়েছে।  আন্দোলনের সময় আমরা কল্পনা চাকমাকে উদ্ধৃত করেছিলাম, কিন্তু আন্দোলনের পরে তাকে কি কেউ খোঁজার চেষ্টা করেছি? আমরা বরং দেখতে পাই মৌলবাদীদের ক্ষমতায় নিয়ে আসা হয়েছে, ধনাঢ্য শ্রেণিকে ক্ষমতায় নিয়ে আসা হয়েছে। দেশের সমস্ত সিস্টেম স্বৈরাচারী বানানোর পথ খোলা করে রেখেছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন শুধু মানুষ বদলেছে, সিস্টেম বদলায়নি।’

‘মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন: জুলাই গণঅভ্যুত্থান, রাষ্ট্র সংস্কার ও আদিবাসী জাতিসমূহের অংশীদারিত্বে বাহাস ও মতামত’ শীর্ষক আলোচনা সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস এসব কথা বলেছেন। মঙ্গলবার (৮ অক্টোবর)  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরসি মজুমদার মিলনায়তনের লেকচার থিয়েটার হলে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। মাওরুম জার্নাল ও আইপিনিউজ বিডি এর আয়োজন করে।

রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, এই সংবিধান একটি সামন্তবাদী সংবিধান। সংবিধানে রাষ্ট্র সিস্টেমে বহুত্ববাদের স্থান দেওয়া হয়নি। অথচ বাংলাদেশ একটি বহুভাষা, বহুজাতির, বহু সংস্কৃতির দেশ। আমরা যে বহুত্ববাদী সংবিধানের কথা বলি সে বহুত্ববাদী সংবিধান হতে গেলে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সমাজ দর্শনকে গুরুত্ব দিতে হবে।

সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ। তিনি বলেন, মানবেন্দ্র লারমায় প্রথম ব্যক্তি যিনি বলেছেন, বাংলাদেশের সংবিধানে হরিজন, বেদে, ভিখারি, ভবঘুরে, কারখানা মজুর, রিকশাচালক, মেথর, যৌনকর্মীর অধিকারের কথা বলা হয়নি। তিনি পুঁজিবাদী কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তিনি সংবিধানে ‘নারীর জন্য স্পষ্ট কোনও অধিকারের জায়গায় নাই’ এমন বহাস তুলেছেন।

আইপিনিউজ বিডির উপ-সম্পাদক সচেজ চাকমার সঞ্চালনায় এসময় উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আমিনা মহসিন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাহমুদুল সুমন, সাংবাদিক এহসান মাসুদ, জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র সামান্তা শারমিন, কবি ও লেখক মিঠু রাখসাম, জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য অনিক রায় ও জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য ও আইনজিবি সায়ক চাকমা।

অধ্যাপক আমিনা মহসিন বলেন, আমরা কী ধরনের পরিচয়ের কথা বলি সেটি আমাদের জানতে হবে। আমরা যদি আদিবাসী পরিচয়ের কথা বলি, তাহলে সেটার একটা সংজ্ঞা হওয়া দরকার। সেটা রাজনৈতিক পরিচয় হবে নাকি সাংস্কৃতিক হবে সেটাও বলতে হবে। আবার জুম্ম জাতীয়তাবাদ বলতে গেলে সেখানেও সমস্যা আছে। সেখানে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে কাউন্টার দিতে গিয়ে যেটির কথা বলছেন সে সংজ্ঞায় অন্যদের অন্তর্ভুক্ত করে কিনা সেটাও দেখতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাহমুদুল সুমন বলেন, এম এন লারমাই প্রথম যিনি জাতি এবং জাতীয়তার ব্যপারে প্রশ্ন করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে উপজাতী শব্দটির ব্যবহার একটি উপনিবেশিক মনঃস্তত্ত্বের বহিঃপ্রকাশ। এ সময়ে এসে এ ধরনের চিন্তা করা সঠিক নয়। তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে আজকের বিষয়গুলোকে সংস্কার করতে হবে।

সামান্তা শারমিন বলেন, আমরা যেই এক দফার জন্য লড়াই করেছি তা বাস্তবায়ন হয়নি। ফ্যসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ হয়নি, তা আমাদের বিলোপ করতে হবে। গত ১৫ বছর ধরে আমরা অনেক কিছু বলতে পারি নাই, এখন আমরা করতে পারছি। আমাদের দেশে একসময় সংবিধান নিয়ে আলাপ করতে পারতাম না, এখন আমরা সংবিধান নতুন করে লিখবো কিনা সেটা নিয়ে আলাপ করতে পারছি। আমাদের দেশে আলাপের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা যেন সব সময়ই অব্যাহত থাকে সেটা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।

সায়ক চাকমা বলেন, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা সময়ের তুলনায় অনেক বেশি অগ্রসর ছিলেন। তার বিষয়গুলো নিয়ে আমরা চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর পরে এসে বলছি–তিনি ঠিক ছিলেন। সংবিধানে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেছেন। সংবিধান সংস্কার কমিটি গঠিত হয়েছে, সেখানকার সদস্যরা সবাই অবশ্যই একাডেমিক হিসেবে বেশ যোগ্য, কিন্তু সেখানে সমতল ও পাহাড়ের আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব নেই। আমরা যেই নতুন বাংলাদেশ গঠন করতে যাচ্ছি সেখানে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।