৩৪ বছর সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পর অবসরে গেলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব মাশফি বিনতে সামস। নবম ব্যাচের কর্মকর্তা হিসেবে ১৯৯১ সালের জানুয়ারি মাসে সহকারী সচিব হিসেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন তিনি। মেধাবী ছাত্রী মাশফি বুয়েট থেকে পাস করা প্রথম নারী প্রকৌশলী— যিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দিয়েছিলেন।
চাকরিতে যোগদানের শুরু থেকে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছেন তিনি। একজন নির্ভরযোগ্য কর্মকর্তা হিসেবে সবসময় জ্যেষ্ঠদের কাছে পরিচিত ছিলেন মাশফি। ১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে যোগ দেওয়ার সময় সন্তান-সম্ভবা ছিলেন তিনি। সে কারনে তাকে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন ভারী কোনও দায়িত্ব দিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে। তখন নিয়ম ছিল তিন মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি, কিন্তু বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরে ছয় সপ্তাহের ছুটি দেওয়া হতো। ওই হিসেবে জুন মাসে ‘কাজ কম’ ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অনুবিভাগে পদায়ন করা হয় মাশফি বিনতে সামসকে। কিন্তু ওই সময়ে বিধাতা মনে হয় হেসেছিলেন! কারণ, ১৯৯২ সালে তাকে তিনটি শীর্ষ সম্মেলনের সফর সামলাতে হয়েছে।
মাশফি বলেন, ‘এসব ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের মধ্যে রয়েছে— কমনওয়েলথ, ওআইসিসহ আরও কয়েকটি সংস্থা। ১৯৯২ সালে তিনটি সংস্থার শীর্ষ সম্মেলন হয়েছে এবং প্রতিটি সফর সামলাতে হয়েছে আমাদের ছোট একটি টিমকে।’
সফলতার সঙ্গে সফর সামলানোর পর যুক্তরাজ্য থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে দেশে ফিরে আসলে ১৯৯৫ সালে রোমে প্রথম বিদেশে পোস্টিংয়ে যান তিনি।
থাইল্যান্ড পোস্টিং
বঙ্গবন্ধুর খুনি বজলুল হুদাকে থাইল্যান্ড থেকে ফেরত আনার জন্য ১৯৯৬ থেকে চেষ্টা করছিলেন ওই সময়ের থাইল্যান্ডে দায়িত্বরত রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদের। এ রকম পরিস্থিতিতে রোম থেকে ব্যাংককে পদায়ন করা মাশফি বিনতে সামসকে। বজলুল হুদাকে ফেরত আনার প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন রাষ্ট্রদূত ও কনস্যুলার কর্মকর্তা হানিফ ইকবাল। পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছিলেন মাশফি বিনতে সামসসহ অন্যরা।
মাশফি বলেন, ‘আকরামুল কাদের স্যারের কাছে অনেক কিছু শিখেছি। এ ধরনের বড় কাজ কীভাবে করতে হয়, সেটি আমরা সামনে থেকে প্রত্যক্ষ করেছি। এটি আমার একটি বড় অভিজ্ঞতা।’
দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে প্রেম
২০০১ সালের শেষে বাংলাদেশে ফেরত আসার পর সদর দফতরে যোগ দেন মাশফি বিনতে সামস। এর দুই মাস পরই কাঠমান্ডুতে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে, এর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল বাংলাদেশ। শীর্ষ পর্যায়ের সফর সামলানোর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মাশফি বিনতে সামসকে পদায়ন করা হয় সার্ক অনুবিভাগে। ২০০২ সালের জানুয়ারিতে সার্ক সম্মেলন শেষ হলে তাকে দক্ষিণ এশিয়া অনুবিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পদায়ন করা হয়। এই অনুবিভাগের দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে— ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তানসহ এ অঞ্চলের অন্যদেশ, যারা বাংলাদেশের প্রতিবেশী। কূটনীতিতে সবসময় প্রতিবেশীদের গুরুত্ব ভিন্ন মাত্রার থাকে।
মাশফি বিনতে সামস বলেন, ‘ওই সময় থেকে দক্ষিণ এশিয়া দেখভাল করেছি আমি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া অনুবিভাগে দুই বছর পরিচালক হিসেবে কাজ করার পর দিল্লিতে পোস্টিং হয়। সেখানে ৬ বছর দায়িত্ব পালন করে ২০১০ সালে ফেরত আসি এবং একই অনুবিভাগের মহাপরিচালক হিসেবে যোগ দেই।’
উল্লেখ্য, চারদলীয় জোটের শাসনামল (২০০১-০৪) এবং ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সঙ্গে সম্পূর্ণ ভিন্ন সম্পর্ক ছিল। ওই দুই শাসনামলের সঙ্গে জড়িত থেকে দুদেশের সম্পর্ক রূপান্তরের সাক্ষী তিনি।
২০১১ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ঐতিহাসিক স্থল সীমান্ত চুক্তির প্রটোকল সই করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।
২০১৩ সালে নেপালে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া মাশফি বিনতে সামসকে। ২০২০ সালে ফেরত আসার আগে নেপালে দায়িত্ব পালনকালে কাঠমান্ডুতে ইউএস বাংলা প্লেন দুর্ঘটনা এবং ভয়াবহ ভূমিকম্প পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে তাকে।
ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমির রেক্টর
ভবিষ্যৎ কূটনীতিক গড়ে তোলা হয় ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই প্রতিষ্ঠানে পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মৌলিক শিক্ষাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অবসরে যাওয়ার আগে এই প্রতিষ্ঠানের রেক্টর, অর্থাৎ প্রধান হিসেবে দুই বছর দায়িত্ব পালন করেছেন মাশফি।
দুই বছরের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের কোর্স আয়োজনের পাশাপাশি নতুন ধরনের প্রশিক্ষণ আয়োজন, বিভিন্ন দেশের ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমির সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি, বিদেশি কূটনীতিকদের বাংলাদেশে প্রশিক্ষণসহ তার বিভিন্ন উদ্যোগ সবার প্রশংসা কুড়িয়েছে।
এসিআর
১৯৯৫ সালে পররাষ্ট্র সচিব ছিলেন ফারুক সোবহান। নির্ভরযোগ্য কর্মকর্তা হওয়ার কারণে মাশফি বিনতে সামসকে পছন্দ করতেন তিনি। একদিন মাশফিকে তিনি ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, রোমে পোস্টিংয়ের কথা।
ওই সময়ে রোমে রাষ্ট্রদূত ছিলেন ফারুক সোবহানের ব্যাচমেট খুরশিদ হামিদ।
খবরটি শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন মাশফি। এটি দেখে ফারুক সোবহান সঙ্গে সঙ্গে ফোন করলেন, খুরশিদ হামিদকে।
মাশফি বিনতে সামস বলেন, ফারুক সোবহান স্যার খুরশিদ হামিদ স্যারকে ফোনে বলছেন— ‘আমি মাশফিকে তোমার ওখানে পাঠাচ্ছি। তাকে দেখাশোনা করবে। মনে রাখবে, তুমি ওর এসিআর লিখবে না, মাশফি তোমার এসিআর লিখবে।’