খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শরিক দলের মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাতীয় পার্টির (জেপি) প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমাদানে বাধা ও ভয়ভীতিসহ নানা অভিযোগ ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে দল দুটি। জোটভুক্ত অন্য কয়েকটি দলের প্রার্থীরাও স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনি দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
এদিকে, ওয়ার্কার্স পার্টি শনিবার সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু অনুষ্ঠান নিয়ে তাদের সংশয়ের কথা জানিয়েছে। অবশ্য প্রধান শরিক আওয়ামী লীগ এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে আখ্যায়িত করেছে।
ইসি দেশের চার সহস্রাধিক ইউনিয়ন পরিষদে মার্চ থেকে জুনের মধ্যে ৬ ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতোমধ্যে ৩টি ধাপে প্রায় দুই হাজারের মতো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী প্রথম ধাপে ৭৩২টি ইউপির ভোটগ্রহণ আগামী ২২ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে।
এ ধাপে আওয়ামী লীগের শরিকদের মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, জাতীয় পার্টি (জেপি) ও ন্যাপ নির্বাচনে মাঠে রয়েছে। অবশ্য, প্রথম ধাপে না থাকলেও গণতন্ত্রী পার্টি, সাম্যবাদী দল ও বাসদসহ ক্ষমতাসীন জোটের শরিকদের কয়েকটি দল অন্যান্য ধাপে তাদের প্রার্থী দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্ষমতাসীন জোটের শরিকদের মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সরকারের বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন ইউপি নির্বাচন নিয়ে প্রথমই প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, নির্বাচন নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ করতে না পারলে ইসি ও সরকারের ওপর মানুষ আস্থা হারাবে। মানুষ আর নির্বাচনি ব্যবস্থাকে বিশ্বাস করবে না। সবাই সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সংশয়ের কথা বলছেন। বাধা দেওয়া হলে ১৪ দলের মধ্যকার আস্থা ও বিশ্বাস নষ্ট হবে। তিনি বরিশালে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে ইউপি নির্বাচন অবাধ-সুষ্ঠু না হলে প্রতিরোধ গড়ে তোলারও হুঁশিয়ারি দেন।
সর্বশেষ শনিবার দলটির পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে ইউপি নির্বাচন নিয়ে নানা অভিযোগের কথা জানানো হয়। দলীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই সংবাদ সম্মেলনে দলের সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা সাংবাদিকদের বলেন, ক্ষমতাসীন দলের অগণতান্ত্রিক আচরণ, প্রতিনিয়ত নির্বাচনি বিধিভঙ্গ, নির্বাচনি পরিবেশ নষ্ট, জনগণকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে একক প্রার্থী বানিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা, ভিন্ন দলের প্রার্থীদের ভয়-ভীতি, স্বতন্ত্র, বিদ্রোহী প্রার্থীদের রাতের অন্ধকারে বা ভিন্ন কায়দায় নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে।
সরকারি দলের বাইরের প্রার্থীরা নিচুতলা থেকে ওপর তলার নির্বাচনি কর্মকর্তাদের কাছে সুষ্ঠু নির্বাচনের ও নিরাপত্তার আকুতি ঘোষণা করেও কোনও ফল পাচ্ছেন না। জোটের শরিক সংগঠনের প্রার্থীদেরও বাধা দেওয়া হচ্ছে। র্যাব, পুলিশ, প্রশাসন ক্ষমতাসীন দলের মার্কাকে জিতিয়ে দেওয়ার ‘আবহ’ তৈরি করছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বিরোধী প্রার্থী বিহীন পরিবেশ তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ‘ফুলমার্ক’ নিয়ে পাস করে নেতৃত্ব টেকানোর অপচেষ্টা করছেন।
জোটের শরিক ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এনামুল হকও একই ধরনের মন্তব্য করেন। বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, এবার দলীয় ভিত্তিতে ইউপি নির্বাচন হচ্ছে। আমরা মনে করেছিলাম, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসবমুখর পরিবেশে এই নির্বাচন হবে। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতি উৎসবের আমেজ বহন করছে না।
গণতন্ত্রী পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য নুরুর রহমান সেলিম বলেন, প্রথম ধাপে আমাদের প্রার্থী নেই, যে কারণে আমরা বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি না। কিন্তু পত্রপত্রিকায় যেটা দেখছি, শুনছি, সেটা ভালো লক্ষণ নয়। জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারলে, তার দায় সরকারের ওপরই বর্তাবে।
অবশ্য এসব আশঙ্কা ও অভিযোগের বিষয়ে জোটের প্রধান শরিক আওয়ামী লীগে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। এসব অভিযোগকে প্রকাশ্যে অস্বীকার করলেও বিভিন্ন স্থানে সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের প্রভাব বিস্তার ও আতঙ্ক সৃষ্টির বিষয়গুলোকে ‘অসত্য নয়’ বলেও মন্তব্য করছেন দলের কেউ-কেউ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দলের পক্ষে অবস্থান নিয়ে কথা বললে বলতে হবে ‘এগুলো ভিত্তিহীন’। আবার যদি ভিত্তিহীন বলি, তাহলে তা পুরোপুরি সত্য কথা হবে না। কাজেই এটা নিয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে চাই না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এ ধরনের অভিযোগের কোনও ভিত্তি নেই। স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত কোনও রেষারেষি থাকতে পারে। দলীয়ভাবে নির্বাচনে কোনও ধরনের প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে না। কমিশনকে জানিয়ে দিয়েছি, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে তাদের যেকোনও সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাব।
নির্বাচন কমিশন শাহ নেওয়াজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দলীয়ভাবে কে কী বললেন, সেটা আমরা বিবেচনায় নিতে চাই না। আমাদের কাছে কেউ অভিযোগ নিয়ে এলে আমরা সেটা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিচ্ছি। নিরপেক্ষ নির্বাচনে কমিশনের আন্তরিকতার কোনও ঘাটতি নেই।
/এমএনএইচ/