ঢাকায় প্রতিদিন ২৩০ টন মানববর্জ্য জলাশয়ে পড়ছে, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

প্রতিদিন শুধু ঢাকাতেই আনুমানিক ২৩০ টন মানববর্জ্য উন্মুক্ত জলাশয়ে গিয়ে পড়ছে। এর ফলে গুরুতর পরিবেশ দূষণ ঘটছে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বিশেষ করে শিশুদের স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সাড়ে ছয় কোটিরও বেশি মানুষ অর্থাৎ বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ নিরাপদ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার সুবিধাবঞ্চিত। তাই পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা বা স্বাস্থ্যবিধি ও পয়ঃনিষ্কাশনের ক্ষেত্রে অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার জরুরি প্রয়োজনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে ইউনিসেফ, ওয়াটার এইড, এসএনভি এবং আইটিএন-বুয়েট।

মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল টয়লেট কনফারেন্স ২০২৫–এ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ এবং ওয়াটার এইড বাংলাদেশ। গেটস ফাউন্ডেশন, কিম্বার্লি-ক্লার্ক, কিংডম অব নেদারল্যান্ডস দূতাবাস, সুইডেনের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা এবং ইউকে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এই সম্মেলনটি আয়োজনে সহযোগিতা করেছে।

বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, “খোলা জায়গায় মলত্যাগ শিশুদের স্বাস্থ্য ও বিকাশের ক্ষেত্রে একটি বড় অন্তরায়; তবে এই ক্ষতিকর চর্চা বন্ধে বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক দ্রুত এবং প্রশংসনীয় সফলতা অর্জন করেছে যার ফলে শিশুরা উপকৃত হচ্ছে। কিন্তু গত বছর আমরা সবাই দেখেছি, ফেনীর ঐতিহাসিক বন্যার মতন জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে এসকল অগ্রগতিকে নিমিষে ধ্বংস হয়ে যেতে, দেখেছি জরুরি সকল অবকাঠামোকে নিশ্চিহ্ন হতে, যার ফলে শিশুরা আবার খোলা জায়গায় মলত্যাগে বাধ্য হয়েছে। ”

তিনি আরও বলেন, “শিশুদের স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে ওঠার অধিকার রয়েছে আর যথাযথ পয়ঃনিষ্কাশনের অভাবে তাদের সুস্থভাবে ও নিরাপদে বেড়ে ওঠা বিঘ্নিত হয়। নারী ও শিশুসহ সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য যথাযথ পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতকে সঙ্গে নিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া দরকার‌, সেই সঙ্গে ওয়াশ (পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যবিধি) খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা দরকার; দরকার ভূপৃষ্ঠের উপরিতলের পানির দূষণ ও এর ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি টেকসই সমাধান ও মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত করতে আইনি কাঠামোগুলোকে জোরদার করা।”

বন্যা ও চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনাবলীর প্রকোপ বৃদ্ধিসহ জলবায়ু সংকটের প্রভাব বাড়তে থাকায় বাংলাদেশ পয়ঃনিষ্কাশন বা স্যানিটেশন পরিষেবার পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়েছে। উদাহরণস্বরূপ গত বছর ফেনীতে যা ঘটলো, তার কথা বলা যেতে পারে; গত ৫০ বছরে এমন পরিস্থিতি আর দেখা যায়নি। এই দুর্যোগগুলো সারা দেশে বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও উপকূলীয় কমিউনিটিগুলোতে বিদ্যমান অবকাঠামো ও পানি সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছে।

ওয়াটারএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিন জাহান বলেন, “বিশ্বব্যাপী চলমান পয়ঃনিষ্কাশন (স্যানিটেশন) আন্দোলনে টয়লেট কনফারেন্স-২০২৫ এর গুরুত্ব ব্যাপক। এর মাধ্যমে টয়লেট বা শৌচালয়কে উপেক্ষিত একটি চাহিদা থেকে মর্যাদা, সুস্বাস্থ্য এবং উদ্ভাবনের প্রতীক হিসাবে রূপান্তর করার একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে। এই সম্মেলন কেবল একটি আলোচনা নয়; এটি পুরানো অভ্যাসকে চ্যালেঞ্জ করে; আহ্বান জানায় কার্যকরী, উপযুক্ত ও অত্যাধুনিক সমাধানগুলোকে কাজে লাগানোর জন্য, আর আহ্বান জানায় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, টেকসই পরিবেশ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য যথাযথ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাকে অপরিহার্য হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য। প্রতিটি শিশুর স্কুলে টিকে থাকার জন্য একটি শৌচাগার প্রয়োজন, প্রতিটি নারীর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য নিরাপদ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার প্রয়োজন আর আমাদের গ্রহকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজন প্রতিটি কমিউনিটির দায়িত্বের সাথে নিজ কমিউনিটিতে সঠিকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। উপযুক্ত শৌচাগার ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিয়ে আমাদের সবার ভাবতে হবে।”

ওয়াটার এইড জানায়, অনুন্নত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশের আনুমানিক ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে, যা এদেশের ২০১৮ সালের জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ। অবশ্য ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরিচালিত জয়েন্ট মনিটরিং প্রোগ্রাম ২০২২–এ বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে বর্তমানে যে গতিতে কাজ হচ্ছে তা অন্তত আট গুণ বাড়ানো প্রয়োজন।

ইউনিসেফ ও ওয়াটার এইড বাংলাদেশে পয়ঃনিষ্কাশন (স্যানিটেশন) সংকট মোকাবিলায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও জরুরি ভিত্তিতে নতুন টেকসই সমাধান উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

সবার জন্য নিরাপদ ও টেকসই স্যানিটেশনের সুবিধা নিশ্চিতে সমস্যা ও সমাধান চিহ্নিত করার লক্ষ্যে আয়োজিত এই সম্মেলনে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি, নীতি নির্ধারক, কারিগরি বিশেষজ্ঞ, দাতা সংস্থার প্রতিনিধি, শিক্ষক, নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধি ও ওয়াশ খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।