রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলিতে থাকা বিভিন্ন স্থানে অহরহ ম্যানহোলের ঢাকনা চুরির ঘটনা ঘটছে। গত কয়েকমাস ধরে এই চুরির ঘটনা যেন বেড়েই চলেছে। সড়কে ম্যানহোলের ঢাকনা না থাকায় প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। ফলে চলাচলের ক্ষেত্রে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে নগরবাসীর।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীর অন্তত অর্ধশতাধিক এলাকার সড়ক ও অলিগলিতে ম্যানহোলের ঢাকনা নেই। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পেছনের সড়ক (এএইচএম কামরুজ্জামান সরণি)। সেখানের ৫-৬ জায়গায় ম্যানহোলের ঢাকনা নেই।
এছাড়াও পান্থপথ এফ আর টাওয়ার-এর ঠিক বিপরীত পাশে ম্যানহোলের ঢাকনা গায়েব। ধানমন্ডির সড়কেও একই দৃশ্য। বাড্ডা, সাঁতারকুল, উত্তরা, উত্তরখান, নতুনবাজার, যাত্রাবাড়ী, গেন্ডারিয়া, পুরান ঢাকার সূত্রাপুরসহ অসংখ্য জায়গার প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে ম্যানহোলের ঢাকনা নেই।
স্থানীয়রা জানান, ফুটপাতের টোকাইরা নেশার টাকা জোগাড় করতে ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে ভাঙ্গারি দোকানে কেজি দরে বিক্রি করে। বিশেষ করে পুরাতন ঢাকনা ভেঙে বা সড়ক খুঁড়ে নিয়ে যায় তারা।
এই বাসিন্দা আরও বলেন, ম্যানহোলের ঢাকনা না থাকায় প্রতিনিয়ত ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে। দূর থেকে মোটরসাইকেল চালক বা রিকশাচালকরা এমন কিছু খেয়াল না করার ফলে রিকশার চাকা পড়ে যায় গর্তে। ফলে দুর্ঘটনা ঘটেই চলছে। শিগগিরই এর সমাধান না হলে বড় দুর্ঘটনার শঙ্কা আছে।
পুরান ঢাকার বংশাল এলাকার বাসিন্দা ফিরোজ রশীদ বলেন, গত দুই মাস ধরে সাত রোজা এলাকা সংলগ্ন মসজিদের কাছে ম্যানহোলের ঢাকনা নেই। সিটি করপোরেশনের লোকজন ড্রেন পরিষ্কার করতে এসে দুদিন খোলা রেখেছিল। ওরা দেখে ঢাকনাটা নেই, চুরি হয়ে গেছে। নতুন ঢাকনা লাগানোর পরে আবারও চুরি হয়ে গেছে। তখন থেকে আর লাগানো হয় নাই।
গেন্ডারিয়া (সতীশ সরকার রোড) ডিআইটি প্লট এরিয়ার বাসিন্দা মনসুর আহমদে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কয়েক দিন ধরে স্ট্রিট লাইট নষ্ট হয়ে ছিল। তার উপর সড়কের বিভিন্ন জায়গায় ম্যানহোলের ঢাকনা নেই। ফলে রাত হলেই দুর্ঘটনা লেগেই থাকে। সিটি করপোরেশনকে জানানোর পরেও এর কোনও সমাধান হয়নি। আগে তো সমস্যা হলে সরাসরি স্থানীয় পর্যায়ে কাউন্সিলরকে জানানোর সুযোগ ছিল কিন্তু এখন তাও নেই।
ম্যানহোলের ঢাকনায় রিকশার চাকা পড়ে আহতদের একজন স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী রাহাত হোসেন। বাংলা ট্রিবিউন তিনি বলেন, আমি আমার বন্ধুদের সাথে পান্থপথ থেকে ধানমন্ডি ৩২-এর দিকে যাচ্ছিলাম আড্ডা দিতে। রিকশায় আমরা তিনজন ছিলাম। পথিমধ্যে রিকশার চাকা ম্যানহোলের ঢাকনা না থাকায় গর্তে পড়ে গেছে। রিকশাওয়ালা ভালো করে খেয়াল করেনি। রিকশায় থাকা আমরা তিনবন্ধু আহত হয়েছি। আমার পা ফ্র্যাকচার হয়েছে।
ক্ষোভ জানিয়ে এই শিক্ষার্থী বলেন, ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় ম্যানহোলের ঢাকনা গায়েবের দৃশ্য সচরাচর চোখে পড়ে। সিটি করপোরেশন লোকজন সম্ভবত অন্ধ তাই তাদের চোখে পড়ে না। আমার পায়ের যে ক্ষতি হয়েছে আমি চেয়েছিলাম সিটি করপোরেশনের বিরুদ্ধে মামলা করতে।
উত্তরখান থানার বাসিন্দা সাব্বির হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কয়দিন পর পর ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি হয়। একদিন আমি আর আমার মেয়ে স্কুল শেষে বাসার ফেরার পথে এর কারণে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছি। সিটি করপোরেশন থেকে এ নিয়ে শক্ত কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না। ম্যানহোলের ঢাকনা না থাকার কারণে প্রতিনিয়ত ছোটখাটো অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে ম্যানহোলের ঢাকনা চুরির ঘটনায় সিটি করপোরেশন কিংবা এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে কিনা এমন তথ্য জানতে রাজধানীর বেশ কয়েকটি থানায় যোগাযোগ করা হয়েছে। সেখানকার দেয়া তথ্যমতে এ নিয়ে অর্ধ শতাধিক মামলা রয়েছে। তবে এ নিয়ে গ্রেফতারের সংখ্যা খুবই নগণ্য।
ম্যানহোলের ঢাকনা চুরির সত্যতা স্বীকার করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ম্যানহোলের ঢাকনা চুরির বিষয়টি সত্য। আমি নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে অনেক জায়গায় এ অবস্থা দেখেছি। শুধু ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি নয় ল্যাম্পপোস্টের তার পর্যন্ত কেটে নিয়ে যায় চোররা। আমরা প্রতিনিয়ত যেখানে খবর পাচ্ছি সেখানেই নতুন ঢাকনা স্থাপনের ব্যবস্থা করছি।
ম্যানহোল চুরির ঘটনায় থানায় কোনো ধরনের অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, আমরা এ নিয়ে থানায় জিডি করেছি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে সেই অভিযোগও দিয়েছি। ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি নিয়ে অন্তত ৫০টি জিডি করা আছে থানায়।
এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোঃ শাহজাহান মিয়া সহ একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে ফোন দিয়েও তাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।