তিন বছরেও জানা গেলো না—বুয়েট শিক্ষার্থী সানি হত্যা নাকি দুর্ঘটনার শিকার

২০২২ সালের ১৪ জুলাই ঢাকা জেলার দোহার উপজেলার মৈনট ঘাটে ১৫ জন বন্ধুর সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে নিখোঁজ হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী তারিকুজ্জামান সানি। পরদিন দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে সেখান থেকেই উদ্ধার করা হয় তার মরদেহ। ঘটনার পরদিন নিহতের বড় ভাই হাসাদুজ্জামান দোহার থানায় সানির ১৫ বন্ধুর নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা করেন। কিন্তু দীর্ঘ তিন বছরেও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি।

বর্তমানে মামলার সব আসামি জামিনে রয়েছেন। সানির পরিবার আজও অন্ধকারে—সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে, নাকি এটি নিছকই একটি দুর্ঘটনা? বিষয়টি জানতে চায় তারা। দেরি হলেও তারা চাইছেন নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রকৃত সত্য প্রকাশ হোক।

অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, এটি একটি দুর্ঘটনা ছিল। আর এ দুর্ঘটনার কারণে ১৫টি পরিবার আজ হয়রানির শিকার। তারাও দ্রুত চার্জশিট জমা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

তদন্তে গড়িমসি

মামলার সর্বশেষ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ ছিল ২০২৫ সালের ৩ জুলাই। কিন্তু ওই দিনও প্রতিবেদন জমা পড়েনি। ফলে ঢাকার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আফরোজ সুইটির আদালত আগামী ৬ আগস্ট পরবর্তী তারিখ ধার্য করেছেন। এ পর্যন্ত মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ ২৯ বার পিছিয়েছে।

মামলার আসামিরা হলেন—শরীফুল হোসেন, শাকিল আহম্মেদ, সেজান আহমেদ, রুবেল, সজীব, নুরজামান, নাসির, মারুফ, আশরাফুল আলম, জাহাঙ্গীর হোসেন লিটন, নোমান, জাহিদ, এটিএম শাহরিয়ার মোমিন, মারুফুল হক মারুফ ও রোকনুজ্জামান ওরফে জিতু।

‘সানির অভাব কোনোদিন পূরণ হবে না’

ছোট ভাইকে হারিয়ে এখনও স্বাভাবিক হতে পারেননি সানির বড় ভাই হাসাদুজ্জামান। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘সানি আমাদের কাছে কী ছিল, সেটা ভাষায় বোঝানো যাবে না। তার মৃত্যুর পর আমাদের পরিবারের সব আনন্দ যেন থেমে গেছে। মা আজও সানির পছন্দের খাবারগুলো খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। প্রতিদিনই ভাইয়ের কথা মনে করে কাঁদেন। সানির বই-খাতা, মোটরসাইকেল, পড়ার টেবিল—সবই আগের মতো রয়েছে, শুধু সানি নেই। আমরা বাড়িতে ওর ছবিটাও রাখিনি—দেখলে হৃদয় ভেঙে যায়। এমনকি এখন আর নতুন পোশাক কেনাও আনন্দের মনে হয় না।’

তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি সন্দেহজনক। কেউ বলছে, সানিকে খেয়াল করেনি, আবার কেউ বলছে, সানি পড়ে গেলে তারা তাকে তুলতে গিয়েছিল। কিন্তু ১৫ জন মিলে একজনকে উদ্ধার করতে না পারা প্রশ্নবিদ্ধ। আমরা চাই, সত্যিকারের তদন্ত হোক। অপরাধী দোষী সাব্যস্ত হোক, আর নিরপরাধ কেউ যেন শাস্তি না পায়।’

‘এটি একটি দুর্ঘটনা ছিল’: আসামিপক্ষ

আসামিদের পক্ষের আইনজীবী প্রণব কুমার দে বলেন, ‘বুয়েটের শিক্ষার্থীরা বন্ধু হিসেবে একসঙ্গে ঘুরতে গিয়েছিলেন। হঠাৎ করে সানি কখন পানিতে পড়ে যায়, কেউ খেয়াল করেনি। পরে জানতে পেরে তারা থানায় গেছে, ফায়ার সার্ভিসে গেছে—এটা প্রমাণ করে তারা কোনও অপরাধে জড়িত ছিল না। যদি তারা দোষী হতো, তাহলে তারা থানায় যেতো না বা পলাতক থাকতো। কিন্তু তারা নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিচ্ছে।’

আরেক আইনজীবী আমিরুল ইসলাম সোহাগ বলেন, ‘আসামিরা বছরের পর বছর বিনা বিচারে আদালতে ঘুরছেন। একাধিকবার তদন্ত কর্মকর্তা বদল হলেও মামলার অগ্রগতি হয়নি। আমরা আশা করছি, তদন্ত সংস্থা দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেবে।’

তদন্ত কর্মকর্তা কী বলছেন?

মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা, কুতুবপুর নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (নিরস্ত্র) জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি সম্প্রতি মামলার দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছি। আমার তদন্তকালে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ নেশাগ্রস্ত ছিল না। ফরেনসিক রিপোর্টেও সন্দেহজনক কিছু পাইনি। তাই আমার কাছে ঘটনাটি দুর্ঘটনা বলেই মনে হয়েছে। আশা করি, নতুন তদন্ত কর্মকর্তা আমার কাজের ভিত্তিতে এগিয়ে যাবেন।’

তবে সংশ্লিষ্ট আদালতের সাধারণ নিবন্ধন শাখা মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তার নাম জানাতে পারেনি। কয়েকবার নথি ঘেঁটেও নামটি খুঁজে পাওয়া যায়নি।