উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনার পাঁচ দিন অতিবাহিত হলেও এখনও দুর্ঘটনাস্থল দেখতে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। শত শত দর্শনার্থী দূরদূরান্ত থেকে এসেছেন দুর্ঘটনাস্থল একনজর দেখার জন্য। তাদের কারও কারও চোখে-মুখে বিষণ্নতার ছাপ স্পষ্ট। আবার কেউ সেলফি তুলছেন, কেউ কেউ সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য ‘রিলস ভিডিও’ তৈরি করছেন। আবার কেউ নিহতদের স্মরণ করে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছেন।
শুক্রবার (২৫ জুলাই) বিকালে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, এর আশেপাশে শত শত দর্শনার্থী। তাদের অনেকেই স্কুলের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন। স্কুলের নিরাপত্তা কর্মীরা গেইট বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছেন। ভেতরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের (পুলিশ) উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে।
পরবর্তী সময়ে দায়িত্বরত নিরাপত্তা কর্মীরা ১০ জন করে দর্শনার্থী ধাপে ধাপে ভেতরে প্রবেশ করতে দিয়েছেন। এক পর্যায়ে মাইলস্টোন স্কুলের মেইন গেইটটি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। দর্শনার্থীদের অনেকেই ভেতরে প্রবেশের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন।
দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুর্ঘটনা পরবর্তী মাইলস্টোন স্কুলের হালচাল জানার জন্য জুমার নামাজ পড়েই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছেন।
গাজীপুর থেকে মাইলস্টোন স্কুলের পরিস্থিতি দেখতে আসা শাহেদ আলী নামের একজন দর্শনার্থী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এতো বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে, যা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। টেলিভিশনে বাচ্চাদের কান্না দেখে ডুকরে কেঁদেছি। মনে হলো আজ তো ছুটির দিন, তাই এখানে দেখতে আসলাম।
দুর্ঘটনার পাঁচ দিন পরে স্কুলের সামনে উৎসুক জনতার কাজ কী, এমন প্রশ্নের জবাবে অনেকেই বলছেন, ‘এমনিতেই এসেছি, দেখতে’। পুরান ঢাকার বংশাল থেকে আসা নাজমুন নাহার নামের একজন দর্শনার্থী বলেন, ‘দুর্ঘটনায় যারা মারা গেছেন, তারা সবাই আমার ছোট ছেলের বয়সী। শুনেছি অনেক লাশ নাকি এখনো নিখোঁজ। তাই এখানে এসেছি সত্যিকারের বিষয়টি জানতে।’
এদিকে মাইলস্টোন স্কুলে প্রবেশ করেই অনেক দর্শনার্থীকে দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে সেলফি ও ভিডিও রিলস তৈরি করতে দেখা যায়। অনেকে টিকটক ভিডিও পর্যন্ত করেছেন। রিলস ও টিকটক ভিডিও তৈরি করা কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় বাংলা ট্রিবিউনের। তারা জানান, এখানে যেহেতু অনেক লোকের সমাগম ঘটেছে এবং ঘটনাটি দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছে সেক্ষেত্রে ভিডিও দিলে অনেক বেশি ভিউ হবে। তাই ঘটনাস্থলে এসে ভিডিও তৈরি করা।
সাব্বির আহমেদ নামের একজন টিকটকার বলেন, ‘এমন দুর্ঘটনার জন্য আমরা ব্যথিত। শুনেছি এখানে অনেক শিক্ষার্থীদের লাশ গুম করা হয়েছে। সেটার খোঁজখবর নিতে এসেছি। কিন্তু এখানে এমন কিছু দেখিনি। তাই শুধুমাত্র স্কুলের আশেপাশের দৃশ্য ধারণ করে টিকটকে ভিডিও করেছি।’
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি নিয়ে জনমনে গুজবের অন্ত নেই
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে অনেকেই অপতথ্য ও গুজব ছড়িয়েছেন। জীবন বাজি রেখে এই দুর্ঘটনায় যারা উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেছেন, মরদেহ গুমের গুজব ছড়ানো হয়েছে সেসব সংস্থা ও বাহিনীর বিরুদ্ধে। খানিকটা দেরি হলেও, আহত-নিহত শিক্ষার্থীদের হিসাব তুলে ধরছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।
বস্তুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা অপতথ্য ভেসে বেড়ালেও মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জিয়াউল আলম বলেন, ‘আমি জানি না, কারা এমন অপতথ্য প্রচার করছে। কীভাবে প্রচার করছে। তারা এ সংখ্যা কোথা থেকে পেয়েছে আমি জানি না। অনেক সংবাদ অনেকদিক থেকে আসছে। কেউ বলছে শতশত শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। আমি সেদিকে কোনো খেয়াল করছি না। আমি আমার কাজটা ঠিকমতো করছি।’
নিরাপত্তাবাহিনীসহ নানা সংস্থার বিরুদ্ধে অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ার কারণ কী কিংবা এসব প্রতিরোধে সামনে করণীয় কী এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ডিসমিস ল্যাবের রিসার্চ অফিসার তামারা ইয়াসমীন তমা বলেন, ‘যারা শেয়ার করছেন তারা কিন্তু আবেগ-তাড়িত হয়েই শেয়ার করছেন। এ কারণে পুরো জিনিসটা আরও এমপ্লিফাই হচ্ছে। এরকম ক্ষেত্রে যা দরকার তা হলো যারা এখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত আছেন, তারা যেন স্বচ্ছভাবে নিয়মিত ব্রিফিং ও হালনাগাদ তথ্যটা সবার সঙ্গে শেয়ার করেন।’
মাইলস্টোন স্কুলের দুর্ঘটনাস্থল দেখতে আসা দর্শনার্থীরা বলেন, ‘মৃত্যুর বিষয়ে নানানজনে নানা কথা বলেছে। সত্যি বলতে একটি শিশুর মৃত্যুও আমাদের জন্য বেদনাদায়ক। বেশ কয়েকটি শিশুর দেহ যখন একেবারে পুড়ে গেছে তখন তো তাদের আইডেন্টিফাই করা যায়নি। সেক্ষেত্রে লাশ গুমের একটা গুজব চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা চাই আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহ যারা এর দায়িত্বে আছে তারা যেন সুষ্ঠুভাবে বিষয়টি তদন্ত করে।’