মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির একবছর: রাজউকের সাত নির্দেশনার বেশিরভাগই বাস্তবায়ন হয়নি

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট 
২১ জুলাই ২০২৬, ১৫:৪০আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৬, ১৬:০১

২০২৫ সালের ২১ জুলাই উত্তরার দিয়াবাড়িতে অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হলে ৩৬ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ২৮ জন শিক্ষার্থী ছিলেন। এই ঘটনায় প্রাণ হারান যুদ্ধবিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামও।

বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার এক বছর পেরিয়ে গেলেও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) জারি করা গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা নির্দেশনার বেশিরভাগই বাস্তবায়ন হয়নি। জানা যায়, রাজউক এবং বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) মধ্যে মতপার্থক্যের কারণে বাস্তবায়ন কার্যক্রম বিলম্বিত হচ্ছে।

আরও পড়ুন: মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: এখনও স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন সহপাঠী-সহকর্মীরা 

সাত নির্দেশনা 

রাজউকের প্রধান প্রকৌশলীর দফতরের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২১ জুলাইয়ের দুর্ঘটনার পর জরুরি ভিত্তিতে সাতটি নিরাপত্তা নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এগুলো হলো— 

১.বিমান বিধ্বস্ত হওয়া ভবন অপসারণ; 

২.মেট্রোরেলের নিরাপত্তা বাফার জোনে থাকা ইউ-আকৃতির টিনশেড ও তিন তলা ইংলিশ ভার্সন একাডেমিক ভবন অপসারণ; 

৩.অনুমোদিত ভূমি ব্যবহারের শ্রেণি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন; 

৪. অননুমোদিত হোস্টেল কার্যক্রম বন্ধ; 

৫.বিএনবিসি-২০২০ অনুযায়ী অগ্নি ও কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; 

৬. উত্তরার ৫, ১২ ও ১৪ নম্বর সেক্টরে বেবিচকের উচ্চতা সীমা অতিক্রমকারী ভবন শনাক্ত করা; 

৭.বিমান ওঠানামার করিডোরে উচ্চঘনত্বের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে এয়ার ফানেল জোন নীতিমালা প্রণয়ন। 

এছাড়া ২০০৭ সালের এক প্রজ্ঞাপনের কথা উল্লেখ করে রাজউক জানায়, মেট্রোরেল ডিপোর পাশের ৩০০ ফুট এলাকাকে সবুজ বাফার জোন হিসেবে সংরক্ষণের নির্দেশনা রয়েছে। ফলে ওই সীমার মধ্যে থাকা স্থাপনা অপসারণ আইনগত বাধ্যবাধকতা।

তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, দুর্ঘটনাকবলিত ভবনের কিছু অংশ অপসারণ এবং কিছু জরুরি অবকাঠামো যুক্ত করা হলেও বহু ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা এখনও বহাল রয়েছে। 

‘প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার’ স্বীকারোক্তি

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে রাজউকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পুরো প্রক্রিয়াটিকে ‘প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা’ বলে মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, ‘‘দায় এড়ানোর কোনও সুযোগ রাজউকের নেই। মাইলস্টোন বিমান দুর্ঘটনার পর সাত-আটটি বৈঠক হয়েছে। কিন্তু আমরা কার্যকর কোনও অপারেশনাল সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারিনি।’’

তার মতে, অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় সমস্যাকে ফলহীনতার অজুহাত হিসেবে দেখানোর সুযোগ নেই।

রাজউকের পরিকল্পনা পরিচালক আশরাফুল ইসলামও স্বীকার করেন, বেশিরভাগ উদ্যোগ এখনও পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘‘সব বিষয়েই আমরা কাজ করছি। তবে অনেক উদ্যোগ এখনও পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে।’’

এদিকে মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের মতে, দুর্বল বাস্তবায়নের দায় কোনও নিয়ন্ত্রক সংস্থা এড়িয়ে যেতে পারে না।

ভুক্তভোগী পরিবারের এক সদস্য বলেন, ‘‘এত বড় একটি দুর্ঘটনার পর এক প্রতিষ্ঠান আরেক প্রতিষ্ঠানের ওপর দায় চাপিয়ে দায়িত্ব এড়াতে পারে না। মানুষ জানতে চায়, শুরুতেই এসব ঝুঁকি তৈরি হওয়ার সুযোগ কেন দেওয়া হয়েছিল এবং কারা এর জন্য দায়ী।’’

তাদের অভিযোগ, গত এক বছরে একের পর এক কমিটি ও বৈঠক হলেও বাস্তবে হয়েছে কেবল কাগুজে অগ্রগতি। ঝুঁকিগুলো প্রায় আগের অবস্থাতেই রয়ে গেছে।

উচ্চতা বিধি লঙ্ঘন করে ৬৩০ ভবন

সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বেবিচকের উচ্চতা সীমা লঙ্ঘন করে ৬৩০টি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।

তবে এসব ভবনের মধ্যে কতটির বিরুদ্ধে তদন্ত হয়েছে, কতটিতে জরিমানা হয়েছে, কতটি বৈধ করা হয়েছে বা কতটি ভেঙে ফেলা হয়েছে— এই বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তথ্যের এই ঘাটতি নিয়ন্ত্রক সংস্থার জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা 

বুয়েটের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, ‘‘আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী বিমানবন্দরের এয়ার ফানেল জোন কঠোরভাবে সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক।’’

তার ভাষ্য, ‘‘নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সুপারিশ বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকবে। শুধু নীতিমালা নয়, কার্যকর ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ফানেল জোন সুরক্ষিত রাখতে হবে।’’

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক এস কে মেহেদী হাসান বলেন, ‘‘মাইলস্টোনের ঘটনা দেশের একটি পুরোনো প্রবণতারই প্রতিফলন।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘বড় কোনও দুর্ঘটনা ঘটে, তদন্ত কমিটি হয়, সুপারিশ আসে, কিছুদিন সংস্থাগুলো সক্রিয় থাকে। তারপর ধীরে ধীরে সব থেমে যায়। সুপারিশ বাস্তবায়নের আগেই বিষয়টি ভুলে যাওয়া হয়। এরপর আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটলে আবার একই আলোচনা শুরু হয়।’’ 

তার মতে, এই চক্র ভাঙতে হলে সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি পরিমাপযোগ্য করতে হবে, নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য 

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষের দাবি, ক্যাম্পাসের বড় একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদি সরকারি লিজের মাধ্যমে পাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থাপনার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদনও ছিল।

তবে রাজউকের নথিতে দেখা যায়, অনুমোদিত ব্যবহার ও বাস্তব ব্যবহারের মধ্যে একাধিক অসঙ্গতি রয়েছে। শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য অনুমোদিত ভবন হোস্টেল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আবার কিছু স্থাপনা অনুমোদিত উদ্দেশ্যের বাইরে অন্য কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।

এতে প্রশ্ন উঠেছে, ভবনের অনুমোদন, পরিদর্শন ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর নজরদারিতে বছরের পর বছর এসব অসঙ্গতি কীভাবে চলতে পেরেছে।  

/এসএস/এনআই/এসটি/
সম্পর্কিত
দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণ করলো মাইলস্টোন স্কুল
‘সবচেয়ে বড় আফসোস, আমরা এখনও বিচার পেলাম না’
মাইলস্টোন দুর্ঘটনার পরও বদলায়নি কিছুই, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণে অগ্রগতি নেই
সর্বশেষ খবর
একটার পর একটা ধস শুরু হইছে, বাঁধটি ভেঙে গেলে আমরা সব হারিয়ে ফেলবো
একটার পর একটা ধস শুরু হইছে, বাঁধটি ভেঙে গেলে আমরা সব হারিয়ে ফেলবো
২০২৭ সালের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করবে সরকার
২০২৭ সালের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করবে সরকার
বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মা-মেয়েসহ এক পরিবারের ৩ জনের মৃত্যু
বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মা-মেয়েসহ এক পরিবারের ৩ জনের মৃত্যু
বিল পাস ও স্থায়ী কমিটি গঠনে সরকারের ভূমিকা নিয়ে টিআইবির উদ্বেগ
বিল পাস ও স্থায়ী কমিটি গঠনে সরকারের ভূমিকা নিয়ে টিআইবির উদ্বেগ
সর্বাধিক পঠিত
এমপির ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ নানান প্রশ্ন, দ্বিতীয় স্ত্রী ও শ্বশুরের বক্তব্যে অমিল
এমপির ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ নানান প্রশ্ন, দ্বিতীয় স্ত্রী ও শ্বশুরের বক্তব্যে অমিল
জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরাল, জানা গেলো আসল ঘটনা 
জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরাল, জানা গেলো আসল ঘটনা 
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় পরিবর্তনের পথে ইসি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় পরিবর্তনের পথে ইসি
এবার কাশিমপুর মহিলা কারাগারের জেল সুপার বদলি, জেলার বরখাস্ত
এবার কাশিমপুর মহিলা কারাগারের জেল সুপার বদলি, জেলার বরখাস্ত
আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিলেন ভিডিও ছড়িয়ে পড়া এমপির প্রথম স্ত্রী
আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিলেন ভিডিও ছড়িয়ে পড়া এমপির প্রথম স্ত্রী