শাহজালালকে রুট হিসেবে ব্যবহার

আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকার মাদক মাফিয়ারা আনছে কোকেন

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার মাদক মাফিয়ারা দেশে আনছে উচ্চমূল্যের ভয়ঙ্কর মাদক কোকেন। এই কোকেনের গন্তব্য থাকে পাশ্ববর্তী দেশ। আর এই মাদক মাফিয়াদের সহযোগী দেশীয় চক্র। শাহজালাল বিমানবন্দরে কোকেনসহ আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে এমনই তথ্য পেয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি)।   

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মেহেদি হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোকেন নিয়ে বিমানবন্দরে যারাই ধরা পড়েছে তারা হয় আফ্রিকার নাগরিক, নয়তো ল্যাটিন আমেরিকার। সর্বশেষ যে নারী গ্রেফতার হলো সেও গায়ানার নাগরিক। এছাড়া আমরা পেরুর নাগরিককেও গ্রেফতার করেছিলাম। আর আফ্রিকার নাইজেরিয়া, মালি, ক্যামেরুনের নাগরিকও গ্রেফতার হয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘আমরা গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পারি, মূলত তারাই কোকেন নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। তারা এ দেশীয় কিছু চক্রকে হাত করে। যারা এয়ারপোর্ট ক্লিয়ারের নিশ্চিয়তা দেয়। বের হতে পারলে নিরাপদে থাকার আশ্বাসও দেয়। মূলত এ কারণে তারা বাংলাদেশে কোকেন পাচারের চেষ্টা করে।’

ডিএনসির ঊর্ধ্বতন এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এদেশে কোকেন ব্যবহারীর সংখ্যা খুবই কম। আর এটি ব্যয়বহুলও। পার্শ্ববর্তী দেশে এটি তুলনামূলক বেশি ব্যবহৃত হয়। হয়তো সেই দেশকে টার্গেট করে তারা বাংলাদেশকে রুট হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। কিন্তু বিমানবন্দরে কর্মরত সব সংস্থা এসবের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ও জিরো টলারেন্সে রয়েছে। এ কারণে তারা সুবিধা করতে পারছে না।’

জানা যায়, গত ২৮ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অভিনব কায়দায় আনা ৮ কেজি ৬০০ গ্রাম কোকেনসহ ধরা পড়ে ল্যাটিন আমেরিকার দেশ গায়ানার নারী এম এস কারেন পেতুলা স্টাফেল। এখন পর্যন্ত এটিই দেশের ইতিহাসে কোকেনের সর্ববৃহৎ চালান। বর্তমানে ওই নারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা। প্রায় এক বছরের মধ্যে বড় আরেকটি চালান জব্দ হওয়ার ঘটনায় কোকেন নিয়ে আবারও শুরু হয় আলোচনা।

এর আগে ২০২৪ সালে ২৪ জানুয়ারি আফ্রিকার দেশ মালাউইয়ের এক নারীকে ৮ কেজি ৩০০ গ্রাম কোকেনসহ শাহজালাল বিমানন্দর থেকে গ্রেফতার করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর রাতেই অভিযান চালিয়ে তানজানিয়ার এক নাগরিককে আরও ২০০ গ্রাম কোকেনসহ গ্রেফতার করা হয়। 

ডিএনসির কর্মকর্তারা জানান, ওই ঘটনার পর বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করা হয়। একইসঙ্গে কোকেন সিন্ডিকেটের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জন্য শুরু হয় বিশেষ অভিযান।

৮ কেজি ৬০০ গ্রাম কোকেনসহ আটক হয় গায়ানার নাগরিক এস এম কারেন পেতুলা স্টাফেল

যেভাবে কোকেন সিন্ডিকেট শনাক্ত

কর্মকর্তারা জানান, গ্রেফতারকৃত মালাউইয়ের নারী নাগরিক মমথান্ড জো টয়েরা সকো ও তানজানিয়ার নাগরিক মোহাম্মদ আলী মোহাম্মদকে জিজ্ঞাসাবাদে এবং তাদের ডিজিটাল ডিভাইসগুলো ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে কোকেন চোরাচালান চক্রের অন্যান্য সদস্যসহ মূলহোতা ডন ফ্রাঙ্কি বা জ্যাকব ফ্রাঙ্কির নাম জানা যায়। সে কোকেন সিন্ডিকেটে বিগ বস নামে পরিচিত। মূলত সে-ই এই কোকেন সিন্ডিকেটের মাস্টারমাইন্ড। নামমাত্র গার্মেন্টস ব্যবসার আড়ালে সে কোকেন চোরাচালান কার্যক্রম পরিচালনা করতো। এছাড়াও সে বাংলাদেশ নাইজেরিয়ান কমিউনিটির প্রেসিডেন্ট। তার বিরুদ্ধে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।

প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে কেলভিন ইয়েঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়। সে এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য। কোকেনের চালান বাংলাদেশ পর্যন্ত পৌঁছানোর সমন্বয়কারী সে। ২০২৪ সালের ২০ জানুয়ারি সে মোহাম্মদ আলী মোহাম্মেদের সঙ্গে বাংলাদেশে আসে এবং এ দেশে অবস্থানকারী দেশি-বিদেশি এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে সমন্বয় করে। কোকেনের চালান আটকের খবরে সে বাংলাদেশ ত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এমন সময় তাকে গ্রেফতার করা হয়।

মাস্টারমাইন্ড ডন ফ্রাঙ্কির বাংলাদেশি সমন্বয়কারী রনির বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহপূর্বক গোয়েন্দা নজরদারির এক পর্যায়ে বসুন্ধরা এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়।

রনি একটি অ্যাগ্রো মেশিনারিজ কোম্পানির পরিচালক। ডন ফ্রাঙ্কির সঙ্গে দুই বছর ধরে তার ব্যবসায়ীক লেনদেন ছিল। তার কাজ ছিল মাদক বহনকারীদের দেশে প্রবেশের প্রয়োজনীয় ইনভাইটেশন, হোটেল রিজারভেশন ও ভিসা প্রাপ্তির কার্যক্রম তদারকি করা। সে ম্যাসপেক্স লিমিটেড নামক অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের অনুকুলে ভুয়া ইনভাইটেশন লেটার প্রস্তুত করে ডন ফ্রাঙ্কির কাছে পাঠাতো। তার মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও অন্যান্য ডিভাইস বিশ্লেষণ করে একাধিক ভুয়া ইনভাইটেশন লেটার ও এর সঙ্গে যোগসূত্রতা পাওয়া যায়।

গ্রেফতারকৃত রনির কাছে ডন ফ্রাঙ্কির বারিধারায় অবস্থিত অফিস কাম বাসার ঠিকানা পাওয়া যায়। তাকে নিয়ে সেখানে অভিযান পরিচালনা  এবং তল্লাশি করে কোকেন চোরাচালান সিন্ডিকেটের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন ল্যাগেজ ও ৭০ গ্রাম কুশ পাওয়া যায়। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও বাড়ির মালিকদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ডন ফ্রাঙ্কি ৯ মাস আগে বাংলাদেশ ত্যাগ করে। তার অবর্তমানে তার ভাই উইসলি এবং ম্যানেজার আসাদুজ্জামান আপেল ওই বাসায় থেকে ব্যবসা দেখাশোনা করে। কোকেনের চালান আটকের খবর পেয়ে তারা আত্মগোপন করে।

তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশি ম্যানেজার আসাদুজ্জামান আপেলকে বারিধারা এলাকা থেকে আটক করা হয়। আটকের পরে সে জানায়, বাংলাদেশে কোকেনের চালান প্রবেশের পর তার দায়িত্ব ছিল কোকেনের পুনঃপ্যাকেজিং এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে সহায়তা করা। তার ডিজিটাল ডিভাইস বিশ্লেষণ করেও এ সংক্রান্ত প্রমাণাদি পাওয়া গেছে।

আটককৃত আপেলকে জিজ্ঞাসাবাদে এই সিন্ডিকেটের সক্রিয় বিদেশি (নাইজেরিয়ান) সদস্যদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। তার দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করে বসুন্ধরা এলাকা থেকে নাইজেরিয়ান নাগরিক অস্কার, পোডোস্কাইকে গ্রেফতার করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে অস্কার জানায়, ডন ফ্রাঙ্কি ও তার ভাই উইসলি বারিধারা বাসায় থেকে বাংলাদেশে কোকেন ট্রানজিটের বিষয়টি সমন্বয় করে। অস্কারের ডিজিটাল ডিভাইসগুলো বিশ্লেষণ করেও ডন ফ্রাঙ্কি ও উইসলির সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পোডোস্কিকে গ্রেফতার করা হয়। অস্কার জানায়, বাংলাদেশ থেকে কোকেন ট্রানজিটের কাজে পোডোস্কি সহায়তা করে।

কর্মকর্তারা বলেন, ‘অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয় সিন্ডকেটটি কিছু বাংলাদেশির সহায়তায় দেশে কোকেন আনার চেষ্টা করছে। তবে এ ব্যপারে আমরা সচেতন। আমাদের তীক্ষ্ণ নজরদারি রয়েছে।’