ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ ও বণিক বার্তা আয়োজিত তিন দিনব্যাপী নবম নন-ফিকশন বইমেলা শেষ হয়েছে। এবার ‘নন-ফিকশন গ্রন্থ সম্মাননা-২০২৫’ পেয়েছেন নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর ও গবেষক মো. ইউসুফ সিদ্দিকি।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা ড. সি. আর. আবরার। বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাবির উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ।
মেলায় অংশ নেওয়া প্রকাশকদের মনোনীত নন-ফিকশন বই থেকে বিচারক প্যানেল দুটি নির্বাচন করে লেখকদের সম্মানিত করেছে। এবার একই সঙ্গে গ্রন্থগুলোর প্রকাশককেও সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।
‘দ্বিরালাপ: চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ও পূর্বাপর রাজনীতি সম্পর্কে বিশ্লেষণমূলক আলাপচারিতা’ বইয়ের জন্য সম্মাননা পেয়েছেন নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর। বইটি প্রকাশ করেছে কথাপ্রকাশ। গবেষক মো. ইউসুফ সিদ্দিকি সম্মাননা পেয়েছেন ‘শিলালিপি: বাংলার আরবি-ফারসি প্রত্নলেখমালা’ বইয়ের জন্য। এ বইটি প্রকাশ করেছে প্রথমা প্রকাশন।
চার সদস্যের জুরি বোর্ডের সভাপতি ছিলেন বাংলা একাডেমির সভাপতি আবুল কাসেম ফজলুল হক। অন্য সদস্যরা ছিলেন—অবসরপ্রাপ্ত সচিব ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক অধ্যাপক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী, কথাসাহিত্যিক ও ব্র্যাক ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ফারুক মঈনউদ্দীন এবং জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক আফসানা বেগম।
অনুষ্ঠানে অতিথিদের ক্রেস্ট দিয়ে সম্মাননা জানানো হয়। এছাড়া বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রধান ও বিশেষ অতিথিরা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন লেখক ও অনুবাদক এবং সাবেক সচিব আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া, সাউথইস্ট ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. মুশফিকুর রহমান প্রমুখ।
প্রধান অতিথি অধ্যাপক ড. সি. আর. আবরার বলেন, “নন-ফিকশন বই কেবল তথ্য দেয় না। নন-ফিকশন বই চিন্তা তৈরি করে, প্রশ্ন তোলে, যুক্তি শেখায় এবং সমাজকে বুঝতে সাহায্য করে। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন তথ্যের অভাব নেই, কিন্তু জ্ঞান ঘাটতি রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া, দ্রুত সংবাদচক্র এবং খণ্ডিত মতামতের ভিড়ে গভীর, যাচাইকৃত ও বিশ্লেষণধর্মী জ্ঞানের প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। সেই প্রয়োজন পূরণে নন-ফিকশন বইয়ের ভূমিকা অপরিসীম।”
উপদেষ্টা আরও বলেন, “এই বইমেলার একটি বড় তাৎপর্য হলো এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালের ভেতরের জ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে এসেছে। গবেষণা, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, সমাজবিজ্ঞান—এই সব বিষয় সহজ ভাষায়, দায়িত্বশীল প্রকাশনার মাধ্যমে পাঠকের হাতে পৌঁছালে জ্ঞান সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব শুধু ডিগ্রি দেওয়া নয়, সমাজকে ভাবতে শেখানোও।”
অবিভাবক ও জুরি বোর্ডের সভাপতি আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, “কোনো জাতির উন্নতির পরিচায়ক অনেক কিছু হতে পারে। তবে বই তার মধ্যে অন্যতম। কথা–সাহিত্য, গল্প বা উপন্যাসের গুরুত্ব যেমন আছে, তেমনি চিন্তা ও গবেষণাধর্মী বইও জাতীয় জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো জাতিকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।”
জুরি বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী বলেন, “আমি তিন বছর ধরে বিচারক হিসেবে কাজ করছি। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার আমরা অনেক ভালো বই পেয়েছি। তবে তরুণদের বই এবার কম এসেছে। মূলত রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্যযুক্ত বইগুলোকে আমরা পুরস্কারের জন্য বেছে নিয়েছি।”
ফারুক মঈনউদ্দীন বলেন, “পুরস্কারের জন্য যোগ্য বইয়ের সংখ্যা এবার অনেক বেশি ছিল। আমরা সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিকভাবে বিচার করেছি। কোনো ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ছিল না। নন-ফিকশন বইমেলার রেওয়াজ আরও বিস্তৃত করা দরকার।”
আফসানা বেগম বলেন, “বর্তমানে সারা বিশ্বে নন-ফিকশন বইয়ের চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। পুরস্কার দেয়ার বিষয়টি সবসময়ই আনন্দের। এবার অনেক ভালো বই প্রকাশিত হয়েছে, বিশেষ করে ঐতিহাসিক ভিত্তি সম্পন্ন বইগুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।”
নূরুল কবীর বলেন, “আমার লেখক জীবনে একুশে পদকসহ বিভিন্ন পুরস্কার দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ এসেছে। তবে কখনোই গ্রহণ করিনি। এবারই প্রথম গ্রহণ করেছি, কারণ জুরি বোর্ডের একজন সদস্য বিষয়টি আমাকে জানালেন, যা কিছুটা বিস্ময়কর ছিল।”
দেশের বাইরে থাকায় অনুষ্ঠানে সরাসরি উপস্থিত হতে পারেননি ‘শিলালিপি: বাংলার আরবি-ফারসি প্রত্নলেখমালা’-এর লেখক মো. ইউসুফ সিদ্দিকি। তবে পাঠানো এক শুভেচ্ছা বক্তব্যে তিনি বলেন, “আরবি ও ফারসি শিলালিপি অধ্যায়ন আমাদের বাংলার ইতিহাসকে গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করবে। শিলালিপিগুলো আমাদের গৌরবময় ইতিহাসকে অনুধাবন করতে সহায়তা করে। আমার এই যৎসামান্য বইকে এত বড় স্বীকৃতি দেয়ায় কৃতজ্ঞ।”