মব হত্যার বিচার দ্রুত হবে কি

বিদায়ী বছরের শেষ দিন রাতে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ৩৫ বছর বয়সী আইনজীবী নাঈম কিবরিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। নিহতের স্বজনদের দাবি, নাঈম মব সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন এবং প্রাণ হারিয়েছেন। নাঈমের খালাতো ভাই রফিকুল ইসলাম বলেন,  “নাঈম যে প্রাইভেটকারটি চালাচ্ছিলেন সেটিও ভাঙচুর করেছে সন্ত্রাসীরা। ওই প্রাইভেটকারটি ছিল নাঈমের এক বন্ধুর।”

পুলিশ, স্থানীয় ও নিহতদের স্বজনদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য মতে, একটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে ধাক্কাকে কেন্দ্র করে দুই চাকার যানটির চালকসহ অজ্ঞাত পরিচয় যুবকরা নাঈমকে প্রাইভেটকারের গতিরোধ করে তাকে যান থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে আনেন। পরে তারা এই আইনজীবীকে দু’দফায় মারধর করে রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যান। খবর পেয়ে তার খালাতো ভাই রফিকুল এসে তাকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে যাচাই-বাছাই শেষে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা নাঈমকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ ঘটনায় সারা দেশের আইনজীবী সমাজ বিভিন্ন বিবৃতি দিয়ে কঠোর বিচারের দাবি করেছেন। গত ৪ জানুয়ারি ঢাকা আইনজীবী সমিতির সামনেও এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

নাঈম হত্যার এ ঘটনায় গত ৫ জানুয়ারি জোবায়ের হোসেন পাপ্পু নামে একজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাকে আদালতে তোলা হলে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন তিনি। আদালত জবানবন্দি নিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

নিহত নাঈম পাবনা জজ কোর্টের আইনজীবী ছিলেন। হত্যার ১০ দিন আগে তিনি পাবনা থেকে ঢাকায় আসেন হাইকোর্ট থেকে জামিন নেওয়ার জন্য। তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মামলা রয়েছে। ঢাকায় এসে পূর্বাচলে তার খালাতো ভাই রফিকুলের বাসায় ওঠেন তিনি।

শুধু কি আইনজীবী নাঈম কিবরিয়ার হত্যা? ‘মব’ করে বিভিন্ন অভিযোগ এবং অজুহাতে আইন হাতে তুলে নিয়ে হত্যা বর্তমানে খুব আলোচিত। বিশেষ করে গেল বছর মব বিষয়টি বেশ আলোচিত-সমালোচিত ছিল। রাজধানী থেকে শুরু করে দেশজুড়ে মব সন্ত্রাস নামে এসব কর্মকাণ্ড আতঙ্ক ছড়িয়েছে। মবে হত্যার শিকার পরিবারগুলো রয়েছে আতঙ্কে। এমনকি, বিচার পাওয়া নিয়েও রয়েছে তারা দুশ্চিন্তায়। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচারের দাবি জানাচ্ছে।

মব মানে কী

বর্তমান সময়ে অনেক আলোচিত-সমালোচিত শব্দ ‘মব’। ইংরেজি এই শব্দের আরেকটি সমার্থক শব্দ হলো ‘ক্রাউড’, যার বাংলা অর্থ ভিড়। সাধারণ মানুষের ভিড়কেই কি মব বলা চলে, এমন প্রশ্ন সবার মনে। বিশেষ করে যারা উচ্ছৃঙ্খল এবং ঝামেলা বা সহিংসতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কাজ করে তাদেরই মব বলা হয়। আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকেই মব শব্দটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

মব সন্ত্রাস এবং মব হত্যা কাকে বলে, এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “পরিকল্পিতভাবে বা যেকোনো উদ্দেশ্যে, যে কাউকে কোনও অভিযোগে সংঘবদ্ধভাবে হত্যা করা বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াকে মব বলে। অপরাধের ভাষা এবং আইনের ভাষায় এটাকেই মব বলে। এটা আমাদের দেশে মহামারি আকার ধারণ করেছে। কয়েকজন লোককে এক করে যেখানে সেখানে আইন হাতে তুলে নিচ্ছে। এটা এখনই বন্ধ করা না গেলে মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে খুব শঙ্কা দেখা দিবে।”

মবে হওয়া হত্যার তথ্য-উপাত্ত

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের অন্যতম গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ছিল মব সন্ত্রাস করে গণপিটুনিতে হত্যাকাণ্ড। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মব সন্ত্রাসে অন্তত ১৯৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর আগের বছর অর্থাৎ, ২০২৪ সালে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে প্রাণ হারান অন্তত ১২৮ জন।

সংস্থাটি বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের এই সময়কালে কমপক্ষে ২৯৩ জন নাগরিক মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন। মব সন্ত্রাস করে নারী, পুরুষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক অনেক মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এ ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধা, বাউল সম্প্রদায়ের মানুষসহ অনেককে হেনস্তা করা হয়েছে। মারধর থেকে শুরু জুতার মালা পরানোর ঘটনাও ঘটেছে।

আলোচিত ঘটনাসূমহ

বিদায়ী ২০২৫ সালজুড়ে বড় আতঙ্ক হয়ে উঠেছিল মব সন্ত্রাস ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। চুরি, ধর্ম অবমাননা কিংবা চাঁদা না দেওয়ার অভিযোগ তুলে দলবদ্ধভাবে পিটিয়ে হত্যা, মরদেহে আগুন দেওয়া, স্থাপনা ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। অনেক ক্ষেত্রে এসব হামলা ছিল পূর্বপরিকল্পিত ও সাজানো অভিযোগের ফল।

মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে হওয়া অন্যতম হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল গত ১৮ ডিসেম্বর। ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গার্মেন্টস শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যার পর তার মরদেহ গাছে ঝুলিয়ে আগুন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত করে ধর্ম অবমাননার কোনও ঘটনায়ই পায়নি। ওই ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

এর আগে গত বছরের ২ আগস্ট চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে চেঙ্গেরখাল সেতুতে চোর সন্দেহে কিশোর রেহান উদ্দিন ওরফে মাহিনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একই বছরের ৯ আগস্ট রংপুরের তারাগঞ্জে মেয়ের বিয়ের দিন ঠিক করতে গিয়ে চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে প্রাণ হারান রূপলাল দাস ও প্রদীপ দাস নামে দুজন।

এছাড়া ২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে চোর সন্দেহে মানসিক ভারসাম্যহীন তোফাজ্জলকে পিটিয়ে হত্যাও কম আলোচিত নয়। হত্যার ঘটনার ১৫ মাস পর ছাত্রলীগের সাবেক নেতাসহ ২৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হান্নানুল ইসলাম গেল ১৫ ডিসেম্বর অভিযোগপত্র জমা দেন।

তবে, এ তদন্তে সন্তুষ্ট নন মামলার বাদী বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের সুপারভাইজার মোহাম্মদ আমানুল্লাহ। এর আগেও মামলাটি তদন্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন শাহবাগ থানার পরিদর্শক মো. আসাদুজ্জামান। ওই অভিযোগপত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ শিক্ষার্থীকে অভিযুক্ত করা হয়। ‘তদন্ত সুষ্ঠু হয়নি’ জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে নারাজি দাখিল করা হয়। গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার তৎকালীন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুজ্জামান পিবিআইকে মামলাটি পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেন। পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হান্নানুল ইসলাম গত ১৫ ডিসেম্বর নতুন করে আরও সাত জনসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

এছাড়া ফরিদপুরের গোয়ালন্দে তৌহিদি জনতা পরিচয়ে নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার কবর, বাড়ি ও দরবার শরিফে হামলা এবং কবর থেকে মরদেহ তুলে এনে মহাসড়কে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার মতো বর্বরোচিত ঘটনা গেল বছর ঘটে গেছে।

আন্তর্জাতিকভাবে মব নিয়ে কী বলা হচ্ছে

২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পালাবদলের পর মানবাধিকার, নিরাপত্তা ও শাসনব্যবস্থার সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সক্রিয় নাগরিক সমাজের পাঁচটি সংগঠন। ‘ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস অ্যালায়েন্স’র নেতৃত্বে সংগঠনগুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতি বিষয়ক হাই-রিপ্রেজেন্টেটিভ কায়া ক্যালাসকে এই চিঠি দিয়েছেন। গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর পাঠানো ওই চিঠিতে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান, মব ভায়োলেন্স বা সংঘবদ্ধ সহিংসতা এবং গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত হওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

মবের জন্য সরকারের ওপর দোষ চাপাচ্ছে মানবাধিকারকর্মীরা

মব সন্ত্রাসের জন্য সরকারের ওপর দোষ চাপাচ্ছে মানবাধিকারকর্মীরা। তাদের দাবি, সরকার ও তার আশপাশের ছত্রছায়ায় ঘটনাগুলো হচ্ছে। হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিভি) প্রেসিডেন্ট ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বলেন, “মব যে সরকার বা ছত্রছায়ায় হচ্ছে তার অন্যতম উদাহরণ তাহরিমা ইস্যু। গাজীপুর আদালত তাকে রিমান্ডের আদেশ দিয়েও আবার মবের ভয়ে জামিন দিয়েছেন। আইন উপদেষ্টা তার বিরুদ্ধে অবস্থান না নিয়ে উল্টো তার জামিনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সুতরাং, যে উসকানি তার জন্য দায়ী সরকার ও সংশ্লিষ্টরা। এখনও যদি মবের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সুবিধা নেওয়ার চিন্তা এরা বাদ না দেয় তাহলে এই মব একদিন তাদের ওপরে এসে পড়বে।”

মব বন্ধে কী করতে হবে

মনজিল মোরশেদ বলেন, “মব সন্ত্রাস ও হত্যা বন্ধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল না বরং সঙ্গে সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেট স্পটে ঘটনাস্থলে গিয়ে বিচার করবেন এমন একটি সুনির্দিষ্ট আইন করা দরকার।”

মব হত্যার দ্রুত বিচার নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা হয় আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের স্পেশাল কনসালটেন্ট ব্যারিস্টার তানিম হোসেইন শাওনের। তিনি বলেন, “সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার রাষ্ট্রের কাছে সমান। সেক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের স্বার্থে দ্রুত বিচারের চেয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করে বিচার করা উচিত। কারণ দ্রুত বিচার করতে গিয়ে তদন্তের সমস্যা হতে পারে। সেক্ষেত্রে যেকোনও হত্যায় সঠিক তদন্তটা গুরুত্বপূর্ণ।”

কিছু মামলার ক্ষেত্রে দেখা গেছে তদন্ত খুব দ্রুত হয়ে গেছে, এমনভাবে সব হত্যার বিচারে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যারিস্টার তানিম হোসেইন শাওন বলেন, “এটা সঠিক না। কারও মামলায় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি। তবে, যেসব মামলার তথ্য-উপাত্ত খুব সহজেই পাওয়া গেছে সেগুলো ওইভাবে দ্রুত হয়ে যাচ্ছে। এমনিতে আলাদা অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে না।”

মব হত্যার দ্রুত বিচার নিয়ে কথা হয় অ্যাডিশনাল অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মো. বোরহান উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং মবের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় যেসব খুনখারাপি হচ্ছে তা বন্ধ করা খুবই প্রয়োজন। এ জন্য মব হত্যার বিচার যদি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার করা হয় তাহলে অপরাধীরাসহ সারা দেশের কাছে একটা মেসেজ যাবে। মবের ব্যাপারটা খুব ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে। এটার জন্য দেরি না করে দ্রুত তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।”

মব সৃষ্টি করে হত্যার দ্রুত বিচারের ব্যপারে অপরাধ বিশেষজ্ঞ  ড. তৌহিদুল হক বলেন, “দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে বা আইনি যেকোনো চলমান প্রক্রিয়ায় এর বিচার রাষ্ট্র করতে পারে। তা না হলে এর দ্বারা সমাজে অপরাধের মাত্রা আরও বাড়তে থাকবে। মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে থাকবে। সুতরাং, মবের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা নিতে হবে।