মিন্টো রোডের সচিবদের ফ্ল্যাট বিলাসবহুল হোটেলকেও হার মানায়: হোসেন জিল্লুর রহমান

রাজধানীর মিন্টো রোডে সরকারি সচিবদের জন্য নির্মিত ফ্ল্যাটগুলোর সুযোগ-সুবিধা এতটাই বিলাসবহুল যে তা অভিজাত হোটেলকেও হার মানায়— এমন মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, এ ধরনের রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের জন্য কারা জবাবদিহি করবে, সে বিষয়ে কোনও আলোচনা নেই। খরচের কার্যকর ব্যবস্থাপনা ছাড়া বাংলাদেশ সামনে এগোতে পারবে না।

বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) রাজধানীর তোপখানা রোডের সিরডাপ মিলনায়তনে ‘অর্থনৈতিক শাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ’ শীর্ষক এক নীতি সংলাপে এসব কথা বলেন তিনি। সংলাপটির আয়োজন করে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)।

হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার বা রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের কার্যকারিতা কতটা বেড়েছে— তার কোনও ব্যাখ্যা নেই। অপচয়মূলক প্রকল্প ও পরিচালন ব্যয় নিয়ে কার্যকর আলোচনা এবং জবাবদিহির অভাব স্পষ্ট।

রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় একাধিক গুরুতর অদক্ষতা জমে উঠেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অর্থায়ন সংকট, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব এবং ক্ষমতাবানদের ‘অহমিকা প্রদর্শনের প্রকল্প’ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করছে। সম্প্রতি বিমানের পরিচালনা পর্ষদে হঠাৎ তিনজন নিয়োগ দেওয়ার উদাহরণ টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন— যদি নিয়োগ যৌক্তিক হয়, তবে তা প্রকাশে আপত্তি কোথায়?

তিনি আরও বলেন, বহু আইসিটি পার্ক এখন কার্যত কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে শুধু দারোয়ানদের বেতন চালানোর জন্য। এ ধরনের প্রকল্প মানসিকতা রাষ্ট্রীয় চিন্তায় ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন। বলেন, সরকার ইতিহাসের সেরা নির্বাচনের কথা বললেও বাস্তবে সেটি ইতিহাসের নিকৃষ্টতম নির্বাচন হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। নির্বাচন সামনে রেখে সরকার যেসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেগুলো রুটিন প্রশাসনিক কাজের মধ্যে পড়ে না; বরং এসব সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সরকারের নেওয়ার কথা।

তিনি বলেন, দুর্নীতি কমেছে— এমন কোনও গবেষণা এখনও তা প্রমাণ করতে পারেনি। সংস্কার ও সংলাপের কথা বলা হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান কোনও উদাহরণ তৈরি হয়নি। এমনকি ট্রাফিক ব্যবস্থার মতো একটি মৌলিক ক্ষেত্রেও সরকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে।

মেগা প্রকল্পগুলোতে অগ্রাধিকার ও স্বচ্ছতার ঘাটতির অভিযোগ করে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, মানুষ আর প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না, তারা বাস্তব কাজ দেখতে চায়। দুর্নীতি দমন কমিশন ও মিডিয়া কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) সায়মা হক বিদিশা বলেন, ডিজিটালাইজেশন দুর্নীতি পুরোপুরি দূর না করলেও অনেক সমস্যা কমাতে পারে। তবে কর ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ডিজিটাল সাক্ষরতা ও বাস্তবায়নের ঘাটতি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।

র‍্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক এম আবু ইউসুফ বলেন, উন্নয়ন বাজেটের পাশাপাশি অপারেশনাল বাজেট কমানোর সুযোগ রয়েছে। এমপি ও মন্ত্রীদের গাড়ি, করমুক্ত সুবিধা এবং জনবলের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন।

অন্যদিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, এমপি ও মন্ত্রীদের সুযোগ-সুবিধা নীতিগতভাবে পর্যাপ্ত হওয়া উচিত। তার মতে, ভারতের সংসদের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের এমপিদের বেতন-ভাতা তুলনামূলকভাবে কম। তবে শর্ত একটাই— এমপি হওয়া হবে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব, কোনোভাবেই পার্টটাইম পেশা নয়। সংসদ সদস্য পরিচয় ব্যবহার করে তদবির বা ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া জরুরি।

সংলাপে আরও বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, বিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি শাহেদুল ইসলাম হেলালসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, অ্যাকাডেমিক ও ব্যবসায়ী নেতারা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী।