বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন আশুলিয়ায় ৬ জনের লাশ পোড়ানোসহ সাতজনকে হত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পুলিশের তৎকালীন এসআই আবদুল মালেক। ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়া থেকে বের হওয়ার সময় সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘‘এএসআই মনির আগুন দিয়েছে। রাজসাক্ষীও (এসআই শেখ আবজালুল হক) জড়িত ছিল। মিথ্যা মামলায় কেন সাজা দিলো? যারা জড়িত, তাদের আনা হয়নি। আল্লাহ বিচার করবে।’’
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামসহ ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড, সাতজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, দুজনের সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এছাড়া ক্ষমা পেয়েছেন রাজসাক্ষী আবজালুল হক।
রায় ঘোষণার পর সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের একে একে হাজতখানায় নেওয়া হচ্ছিল। এ সময় আদালত কক্ষের বাইরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এসআই আবদুল মালেকসহ অন্যরা নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানাতে থাকেন। একপর্যায়ে কিছুক্ষণের জন্য জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মালেক। পরে তাকে ধরাধরি করে হাজতখানায় নিয়ে যান দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা।
এর আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আশুলিয়ায় ছয় লাশ পোড়ানোসহ সাত জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামসহ ছয় জনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ, আট জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা ও রাজসাক্ষীকে খালাস দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। ফলে পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে এটি ছিলো তৃতীয় রায়। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে এটি প্রথম রায়।
দণ্ডাদেশের পাশাপাশি সাইফুল ইসলামের সম্পত্তি জব্দ করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে বণ্টনের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এছাড়াও এএফএম সায়েদ রনিকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং আসাদুজ্জামান রিপন, আব্দুল্লাহেল কাফি ও শহিদুল ইসলামকে ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, মাসুদুর রহমান, নির্মল কুমার দাস এবং আরাফাত হোসেন আরজকে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
মামলার অপর আসামিদের মধ্যে আব্দুল মালেক, বিশ্বজিৎ সাহা, মুকুল চোকদার, আরাফাত উদ্দিন এবং কামরুল হাসানকে ৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এ মামলার ১৬ আসামির মধ্যে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকা আট আসামির মধ্যে ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আব্দুল্লাহিল কাফীক যাবজ্জীবন, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) মো. শাহিদুল ইসলামকে যাবজ্জীবন, ডিবির তৎকালীন পরিদর্শক আরাফাত হোসেন আরজুকে যাবজ্জীবন, সাবেক এসআই মালেককে মৃত্যুদণ্ড, এসআই আরাফাত উদ্দিনকে সাত বছরের কারাদণ্ড, এএসআই কামরুল হাসানকে সাত বছরের কারাদণ্ড, মামলার রাজসাক্ষী হওয়ায় সাবেক এসআই শেখ আবজালুল হককে খালাস ও সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদারকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে।
পলাতক আট আসামির মধ্যে– সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড, ঢাকা রেঞ্জের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) সৈয়দ নুরুল ইসলামকে যাবজ্জীবন, ঢাকা জেলার সাবেক পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান রিপনকে যাবজ্জীবন, আশুলিয়া থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ এফ এম সায়েদকে মৃত্যুদণ্ড, সাবেক পরিদর্শক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমানকে যাবজ্জীবন, সাবেক পরিদর্শক নির্মল কুমার দাসকে যাবজ্জীবন, সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক বিশ্বজিৎ সাহাকে মৃত্যুদণ্ড ও যুবলীগের রনি ভূইয়াকে মৃত্যুদণ্ডাদেশের রায় ঘোষণা করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাভারের আশুলিয়ায় পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান ছয় তরুণ। এরপর পুলিশ ভ্যানে তাদের লাশ তুলে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। নৃশংস এ ঘটনার সময় একজন জীবিত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে পেট্রোল ঢেলে তাকেও পুড়িয়ে মারা হয়। এছাড়া এর আগের দিন একজন শহীদ হয়েছিলেন। তারা হলেন– সাজ্জাদ হোসেন সজল, আস সাবুর, তানজিল মাহমুদ সুজয়, বায়েজিদ বোস্তামী, আবুল হোসেন, ওমর ফারুক ও মোহাম্মদ সাহাবুল ইসলাম।
পরে ওই ঘটনায় একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হয়।