সিপিডির জরিপ

৭৭ শতাংশ ভোটারের ধারণা এখনও অবকাঠামোকেন্দ্রিক

উন্নয়ন সম্পর্কে ভোটারদের দৃষ্টিভঙ্গি এখনও প্রধানত দৃশ্যমান অবকাঠামো নির্মাণকেন্দ্রিক। দেশের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ ভোটার মনে করেন, রাস্তা, ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেই উন্নয়ন নিশ্চিত হয়। জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রেও এই ধারণা তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে। 

শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার ইনে আয়োজিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে ‘নির্বাচনী এলাকায় সবুজ টেকসই অর্থনীতির চালচিত্র ও প্রত্যাশা: প্রার্থী ও ভোটার জরিপের ফলাফল’ শীর্ষক জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।

মিডিয়া ব্রিফিংয়ে জরিপের তথ্য তুলে ধরেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত, অনুষ্ঠান সহযোগী সামি মোহাম্মদ, মালিহা সাবাহ ও নূর ইয়ানা জান্নাত।

জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ ভোটার উন্নয়ন বলতে সড়ক, ব্রিজ, কালভার্ট ও অন্যান্য দৃশ্যমান অবকাঠামো প্রকল্পকেই প্রধান সূচক হিসেবে বিবেচনা করেন। এসব প্রকল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান যুক্ত থাকায় ভোটারদের কাছে এগুলো উন্নয়নের বাস্তব প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

শহরাঞ্চলের প্রায় ৮৬ শতাংশ ভোটার উন্নয়নের সঙ্গে সড়ক ও ব্রিজ নির্মাণকে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করে দেখেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম, উপকূলীয় অঞ্চল, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রান্তিক এলাকাগুলোতে এই প্রবণতা আরও বেশি।

ভোটারদের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ও প্রার্থীদের মধ্যেও উন্নয়ন নিয়ে প্রায় একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা গেছে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে প্রার্থীদের উন্নয়ন ধারণা তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত। তবে সামগ্রিকভাবে অবকাঠামোকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিই প্রাধান্য পাচ্ছে।

সবুজ সমাজ নিয়ে আশাবাদ, কিন্তু ধারণায় সীমাবদ্ধতা

সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত জানান, ৯৫ শতাংশ ভোটার মনে করেন, বাংলাদেশে সবুজ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “উন্নয়ন ধারণার এই একমুখী প্রবণতা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু অভিযোজনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে আড়ালে ফেলে দিতে পারে।” তার মতে, উন্নয়ন আলোচনায় অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও সামগ্রিক জীবনমানের বিষয়গুলোকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।

জরিপে দেখা গেছে, পরিবেশ রক্ষার উপায় হিসেবে ৬১ শতাংশ ভোটার গাছ লাগানো ও প্লাস্টিক ব্যবহার কমানোর ওপর জোর দিয়েছেন। রাজনৈতিক প্রার্থীরাও একই ধরনের সমাধানের কথা বলেছেন। গবেষকদের মতে, ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের আচরণগত প্রবণতা স্পষ্ট, যে কাজগুলো ব্যক্তিগতভাবে সহজে করা যায়, সেগুলোকেই তারা পরিবেশ রক্ষার মূল সমাধান হিসেবে দেখছেন।

৪৭ শতাংশ ভোটার নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্পর্কে জানেন। প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই হার ৪২ শতাংশ। নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়নের কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি রয়েছে বলে গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সামাজিক উন্নয়ন সবচেয়ে অবহেলিত

গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবেশ ও অর্থনীতির তুলনায় সামাজিক উন্নয়নের বিষয়টি ভোটার এবং প্রার্থীরা সবচেয়ে কম গুরুত্ব দিচ্ছেন। ভোটারদের কাছে দারিদ্র্য, আয় ও কর্মসংস্থানের চাপ এতটাই প্রবল যে সামাজিক বিষয়গুলো গৌণ হয়ে উঠছে। সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভোটারদের অগ্রাধিকার সীমাবদ্ধ রয়েছে মূলত স্বাস্থ্য ও শিক্ষায়। সিপিডির মতে, এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী এখনও মৌলিক চাহিদা পূরণের লড়াইয়ে রয়েছে।

জরিপের কভারেজ

এই জরিপে দেশের ১৫০টি নির্বাচনি এলাকা থেকে ৪৫০ জন প্রার্থী ও তাদের মনোনীত প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে এক হাজার ২০০ ভোটারের মতামত সংগ্রহ করা হয়েছে। পরিবেশ, সবুজ অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়ন, এই তিন স্তম্ভের আলোকে ভোটার ও প্রার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি, প্রত্যাশা ও বাস্তব পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।