যেভাবে চিহ্নিত হয় ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র, যেমন থাকে নিরাপত্তা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত হবে। সারাদেশে একযোগে ৪২ হাজারের বেশি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হবে। এসব কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ বা সাধারণ হিসেবে চিহ্নিত করে নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র নিয়ে মানুষের মধ্যে সবসময়ই এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করে। এসব কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।

এবারের নির্বাচনে একই দিনে সারাদেশের ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। শেরপুর-৩ আসনে একজন প্রার্থীর মৃত্যুতে ওই আসনের ভোট গত সপ্তাহে স্থগিত করা হয়েছে।

জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আসনভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকা প্রস্তুত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নির্বাচন কমিশন ভোটকেন্দ্রের তালিকা চূড়ান্ত করার পর পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কয়েকটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ কেন্দ্র নির্ধারণ করে।

সাধারণত অতীতে যেসব কেন্দ্রে সহিংসতা, ভাঙচুর বা ব্যালট ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।

ভৌগোলিক অবস্থানও এক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়। পার্বত্য এলাকা, দুর্গম চরাঞ্চল বা সীমান্তবর্তী কেন্দ্রগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়। কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার বাড়ির কাছে থাকা কেন্দ্রও এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এছাড়া ভঙ্গুর যোগাযোগব্যবস্থা বা সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পৌঁছানো কঠিন—এমন কেন্দ্রগুলোও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়। অবকাঠামোগত দুর্বলতা বা সীমানাপ্রাচীরবিহীন প্রতিষ্ঠানেও থাকা কেন্দ্রগুলোকে এই তালিকায় রাখা হয়।

ঢাকায় জেলা ও সিটি করপোরেশন মিলিয়ে মোট আসন ২০টি। এর মধ্যে সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৫টি এবং সিটি করপোরেশনের বাইরে জেলার রয়েছে পাঁচটি আসন—ঢাকা-১, ঢাকা-২, ঢাকা-৩, ঢাকা-১৯ ও ঢাকা-২০।

ঢাকা পুলিশ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে পাঁচটি আসনে মোট ভোটকেন্দ্র ৮৯৩টি। এর মধ্যে ৬৮টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ বা অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৩২টি ঝুঁকিপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। বাকি ৭৯৩টি কেন্দ্র সাধারণ হিসেবে বিবেচিত।

তবে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি সিটি করপোরেশন এলাকার ১৫টি আসনে। নির্বাচন কমিশনের তালিকা অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকার ২১৩১টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১৬১৪টি ঝুঁকিপূর্ণ।

এর মধ্যে ঢাকা-১৮ আসনে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে। এ আসনের ২১৮টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৮৯টি ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া ঢাকা-৪ আসনের ১১৫টির মধ্যে ৯৩টি, ঢাকা-৫-এর ১৫০টির মধ্যে ১৩৬টি, ঢাকা-৬-এর ১০০টির মধ্যে ৭৯টি, ঢাকা-৭-এর ১৬৪টির মধ্যে ১১৮টি, ঢাকা-৮-এর ১০৮টির মধ্যে ৮৭টি, ঢাকা-৯-এর ১৬৯টির মধ্যে ১৩০টি, ঢাকা-১০-এর ১৩৬টির মধ্যে ৯০টি, ঢাকা-১১-এর ১৬২টির মধ্যে ১২৮টি, ঢাকা-১২-এর ১৩০টির মধ্যে ৭৩টি, ঢাকা-১৩-এর ১৩৮টির মধ্যে ১১০টি, ঢাকা-১৪-এর ১৫৩টির মধ্যে ১২৪টি, ঢাকা-১৫-এর ১২৭টির মধ্যে ৮৩টি, ঢাকা-১৬-এর ১৩৭টির মধ্যে ১১টি এবং ঢাকা-১৭-এর ১২৪টির মধ্যে ৬৩টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত।

ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের দফতর জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন এবং সিসিটিভি স্থাপন করা হয়েছে।

আগামীকালের ভোটকে সামনে রেখে ঢাকা মহানগরে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে পুলিশ। সাধারণ নিরাপত্তার পাশাপাশি রাজপথে মোতায়েন করা হচ্ছে সোয়াট ও কে-৯ ইউনিটসহ বিশেষায়িত দল। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি সতর্কতা থাকবে।

বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) মিন্টো রোডে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান।

তিনি জানান, ঢাকায় ডিএমপির ২৬ হাজার ৫১৫ সদস্য নির্বাচনি দায়িত্বে মোতায়েন রয়েছেন। ভোটকেন্দ্রের ভেতরের নিরাপত্তার পাশাপাশি বাইরে স্ট্রাইকিং ফোর্স, মোবাইল টিম ও রিজার্ভ ফোর্স থাকবে। যেকোনও পরিস্থিতি মোকাবিলায় বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, সোয়াট, কে-৯ ইউনিট ও ক্রাইম সিন ভ্যান প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচন উপলক্ষে ঢাকায় চেকপোস্ট ও টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনও নাশকতার আশঙ্কা নেই, তবুও পুলিশ সতর্ক রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, সুষ্ঠু পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা নিশ্চিন্তে, নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে এসে মৌলিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। পুলিশ আপনাদের পাশেই রয়েছে।’

কোনও সুনির্দিষ্ট হুমকি বা ঝুঁকির আশঙ্কা আছে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনও হুমকির আশঙ্কা করছি না। তবে সর্বাত্মক প্রস্তুতি রয়েছে এবং পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে আছে।’