উগ্রবাদীদের হামলায় গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে পুড়ে ভস্মীভূত হয় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান গণমাধ্যম প্রথম আলো। ভস্মীভূত সেই ভবনের ওপর ভিত্তি করে এবং শিল্পকর্ম, সচল শিল্প বস্তু, আলো, ধ্বনি, ছবি, ভিডিও সহ নানা সপ্রাণ ও নিষ্প্রাণ উপাদান নিয়ে শিল্প-প্রদর্শনী করা হয়েছে।
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১১টার দিকে কাওরান বাজারে প্রথম আলোর পোড়া ভবনে ‘আলো’ শীর্ষক এই প্রদর্শনী উদ্বোধন করা হয়। এ সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমব্যক্তিত্ব ও বিশিষ্টজনরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রথম আলোর আক্রান্ত ও অগ্নিদগ্ধ ভবন নিয়ে শিল্প আয়োজনে শিল্পী মাহবুবুর রহমান বলেন, পৃথিবীর মধ্যে যদি কোনও কাঠগড়া থাকে এটা সেই কাঠগড়া। এটা দেখে মনে হয়েছে পরিবারের কেউ বোধহয় আগুন পুড়ে মরে গেছে। পোড়া বইগুলো রীতিমতো চিৎকার করছে। চেয়ার টেবিলসহ প্রতিটা বস্তুকে আমার কাছে জীবন মনে হয়েছে। রুমগুলোতে প্রবেশ করলেই সেটা বোঝা যাবে। সেই জীবন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, খুবই মর্মান্তিক। আমি সবকিছুর মধ্যেই শিল্প দেখি। কারণ এটা ভেতরের জিনিসটাকে তুলে ধরে।
প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এবং বণিক বার্তার সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ বলেন, পৃথিবীতে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ কিন্তু পুরোনো ঘটনা। পত্রিকা অফিস পোড়ানো কিন্তু বেশি না। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার পোড়ানোর মধ্যদিয়ে কেবলমাত্র দুটি অফিস পোড়েনি, এর মধ্য দিয়ে সংবাদমাধ্যম আক্রান্ত হয়েছে।
জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ও কালের কণ্ঠের সম্পাদক কবি হাসান হাফিজ বলেন, ধ্বংস ও সৃষ্টি এখানে দৃশ্যমান। এই পোড়া ভবনে জাতীয় বর্বরতা ফুটে উঠেছে। এর ভেতর প্রবেশ করে দেখলাম কাঁটাতারের ভেতর দিয়ে তরুণরা যাচ্ছে, এটা দেখে গা শিউরে উঠেছে। এই ভবন পোড়ার ঘটনায় আমিও ব্যক্তিগতভাবে দগ্ধ, কারণ প্রথমা প্রকাশনী থেকে আমার বই বের হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিগত সরকার দৃঢ়তার অভাবে এটা (প্রথম আলো) রক্ষা করতে পারেনি। এই সরকারের কাছে প্রত্যাশা, তাদের অঙ্গীকার যেন থাকে গণমাধ্যমকে সুরক্ষা দেওয়া।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেন, পোড়া ভবনটা গণমাধ্যমের কঙ্কাল। এই কঙ্কাল বিশ্বে তেমন একটা নেই। সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে প্রথম আলো, ডেইলি স্টারের মতো কঙ্কালে আমরা প্রাণ দেখতে পাচ্ছি, এটা তাদের পরিশ্রমের ফল। সংবাদ প্রকাশে তাদের দৃঢ়তা গণমাধ্যমের জন্য সাহস জোগাবে। গণমাধ্যম ছাড়া সমাজ এবং রাষ্ট্র অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে। আগামীতে আমাদের গণমাধ্যম যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকবো।
নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি একে আজাদ বলেন, যেভাবে পোড়ানো হয়েছে, তা করে কিন্তু প্রথম আলোকে শেষ করা যায়নি। বিজ্ঞানের ভাষায় কোনও কিছু ধ্বংস হয় না রূপান্তরিত হয়। শক্তির কখনও বিনাশ নাই, শক্তির রূপান্তর হয়। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার পোড়েনি রূপান্তরিত হয়েছে।
নোয়াব সভাপতি আরও বলেন, এখানে শিল্পী দেখিয়েছেন, পোড়ার মধ্য দিয়ে আবার কীভাবে নতুন গাছ জন্ম নিয়েছে। এডিটর হিসেবে মতি ভাই, মাহফুজ ভাই সংবাদমাধ্যমকে যে জায়গায় নিয়েছেন তা সত্যি প্রশংসনীয়। তবে আরও কিছুটা বাকি আছে। ভবিষ্যতে আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকি তাহলে কোনও অপশক্তি আমাদের ওপর আঘাত হানতে পারবে না। সম্পাদক, প্রকাশক, সাংবাদিক আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করবো।
দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেন, প্রথম আলো, ডেইলি স্টারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পরও কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পত্রিকা দুটি মানুষের কাছে চলে গেছে। এটা কোনোভাবেই সম্ভব হতো না যদি প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের সাংবাদিকরা একনিষ্ঠ না হতেন। তাদের অবিশ্বাস্য শক্তি ও স্পৃহা।
মাহফুজ আনাম বলেন, আপনারা মেহেরবানী করে এই দুইটা পত্রিকা অফিসে আগুন দেওয়া কে তাদের সমস্যা ভাববেন না; এটা হলো, মুক্তচিন্তার পেছনে আগুন, স্বাধীনতার বিরুদ্ধে আগুন, স্বাধীন সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে আগুন এবং জাতিগতভাবে চিন্তার যে শক্তি তার বিরুদ্ধে আগুন। আমি এই সরকারের কাছে অনুরোধ করবো, কারা এর সঙ্গে জড়িত কারা উস্কানি দিয়েছেন, এখানে আগুন দিতে তাদের যেন জনসমক্ষে তুলে ধরতে।
প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, এই প্রদর্শনীর সব কৃতিত্ব মাহবুবুর রহমান এবং তার টিমের। মাত্র ২০ দিনের মধ্যে এটা করা হয়েছে। মাহবুবের অসুস্থ স্ত্রী ও যারা এখানে এসেছেন তাদের আমি ধন্যবাদ জানাই। আমরা বলছি সত্য তথ্য, সত্যের সাহস। বিগত সময়ে কোনও সরকার বা কেউ কিন্তু আমাদের সত্য প্রকাশ নিয়ে কোনও ধরনের প্রশ্ন তুলতে পারেনি।
প্রথম আলোর সম্পাদক আরও বলেন, অতীতে নয়া দিগন্ত, সংগ্রাম, যায়যায়দিন আমার দেশসহ বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদক ও সাংবাদিকের ওপর হামলা ও গ্রেফতার হয়েছে। আমরা তখন নিন্দা জানিয়েছি। আমাদের সম্পাদক পরিষদ আমাদের নোয়াব এসব নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। এটা অনেকে আমাদের ডিফেন্ড করতে পারে। তবে আমরা আমাদের জায়গায় স্পষ্ট করেছি। আমরা অতীতের যেকোনও সময়ের চেয়ে অধিক সচেতনভাবে আগামীতেও নির্ভয়ে কাজ চালিয়ে যাবো।
আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন বেলা ১১ থেকে ১টা বেলা ৩টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত এই প্রদর্শনী সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
প্রদর্শনীতে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল, ঢাকা পোস্টের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কামরুল ইসলাম, সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামাল, আইনজীবী মানজুর মতিনসহ গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী, ব্যবসায়িক প্রতিনিধি, শিল্পী, লেখক, কবি সাহিত্যিকসহ অনেক বিশিষ্টজনরা উপস্থিত ছিলেন।
ছবি: আতিক হাসান শুভ