অস্থায়ী কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আমদানি কার্গো ব্যবস্থাপনা স্থায়ী আমদানি কার্গো টার্মিনাল অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংস হওয়ার চার মাস পরও কার্গো হাউস চালুর দৃশ্যমান কোনও উদ্যোগ নেই। ফলে প্রতিদিন শত শত টন আমদানি পণ্য খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকছে, বাড়ছে জট, ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা।
রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স লিমিটেড গত ২২ ফেব্রুয়ারি সিভিল এভিয়েশন চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বর্তমান সংকটের চিত্র তুলে ধরেছে।
এ বিষয়ে বেবিচকের সদস্য (অপারেশন) এয়ার কমডোর আবু সাঈদ মেহবুব খান বলেন, পুড়ে যাওয়া কার্গো হাউস আংশিকভাবে চালু হয়েছে। আশা করছি, বর্ষার আগেই বাকি কাজ শেষ হবে। এছাড়া নবনির্মিত থার্ড টার্মিনাল চালু হলে সমস্যা হবে না। নতুন সরকার যেহেতু চালু করার ঘোষণা দিয়েছে, আমরা সে মোতাবেক কাজ শুরু করেছি।
চিঠিতে বলা হয়, গত বছরের ১৮ অক্টোবর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার বর্গফুট আয়তনের স্থায়ী আমদানি কার্গো টার্মিনাল (বিসিটি) সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেখানে প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ মেট্রিক টন পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা ছিল, তা একযোগে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমদানি কার্যক্রমে তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি হয়।
অগ্নিকাণ্ডের পর অস্থায়ীভাবে গেট নং-৯ দিয়ে ডেলিভারি শুরু হলেও পর্যাপ্ত গুদাম সুবিধা না থাকায় বিপুল পরিমাণ পণ্য বিমান ইঞ্জিনিয়ারিং হ্যাঙ্গার সংলগ্ন উন্মুক্ত স্থানে রাখতে হচ্ছে। এতে পণ্যের মানহানি, আবহাওয়াজনিত ক্ষতি ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বহুগুণে বেড়েছে। পরে ৮৭ নম্বর গেট চালু করে যানবাহন চলাচলে কিছুটা ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হলেও মূল সংকট কাটেনি।
নিউ আইসিটি সংলগ্ন এলাকায় অস্থায়ী টেন্ট ও রাবার হল বসিয়ে সীমিত স্টোরেজ সুবিধা তৈরি করা হয়েছে, কিন্তু তা ক্রমবর্ধমান পণ্যচাপ সামাল দিতে পারছে না।
দীর্ঘ সংস্কারের পর গত ১৬ ফেব্রুয়ারি আমদানি কার্গো কমপ্লেক্স এলাকায় আংশিক কার্যক্রম শুরু হয়। তবে এর আয়তন মাত্র ৪০ হাজার বর্গফুট। ফলে প্রতিদিন গড়ে বিদেশ থেকে আসা প্রায় ১,২০০ মেট্রিক টন পণ্যের বড় অংশ জমে থাকছে। ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রেকর্ড অনুযায়ী ১,২৭৮ মেট্রিক টন কার্গো ডেলিভারির অপেক্ষায় ছিল।
এদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে আমদানিনির্ভর শিল্প খাতেও প্রভাব পড়বে। বর্তমান ব্যবস্থায় অপারেশনাল ঝুঁকিও বাড়ছে। ব্রেকডাউন এলাকার প্রবেশপথ ও ড্রাইভওয়ে ভারী যানবাহনের জন্য সংকীর্ণ হওয়ায় ট্রাক প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় একাধিকবার ব্যাকিং করতে হচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে এবং সময়ক্ষেপণের কারণে সামগ্রিক কার্যক্রম বিলম্বিত হচ্ছে। আনলোডিং, ব্রেকডাউন ও লোডিং কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত ম্যানুভারিং স্পেস না থাকায় ফর্কলিফট ও ট্রলি চলাচলেও প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ক্যাটাগরিভিত্তিক স্টোরেজ তিনটি পৃথক স্থানে হওয়ায় একটি কনসাইনমেন্ট ডেলিভারির জন্য একাধিক গেট ও রুট অতিক্রম করতে হচ্ছে। এতে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, পাশাপাশি নিরাপত্তাজনিত জটিলতাও তৈরি হচ্ছে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, অগ্নিকাণ্ডের পর পুড়ে যাওয়া রাসায়নিক বর্জ্য ও ধুলাবালি যথাযথভাবে অপসারণ করা হয়নি। ফলে কর্মরত শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ সময় এ পরিবেশে কাজ করার কারণে শ্বাসযন্ত্র ও ত্বকজনিত সমস্যার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সংবেদনশীল ও ভ্যালু-অ্যাডেড পণ্যের গুণগতমানও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে কর্তৃপক্ষ বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। পোড়া বর্জ্য অপসারণ ও নিয়মিত ধুলা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ মনিটরিং ব্যবস্থা চালু। নির্দিষ্ট হ্যান্ডলিং ও ম্যানুভারিং জোন চিহ্নিত করে অপারেশনাল লে-আউট উন্নয়ন। ব্রেবভাউন, স্টোরেজ ও ডেলিভারি জোন সমন্বিতভাবে পুনর্বিন্যাস করে মাল্টিপল বুট ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা কমানো।
এদিকে, গত ৩ মার্চ মৌসুমের প্রথম বৃষ্টিতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমদানি পণ্য ভিজে একাকার হয়ে যায়। কার্গো হাউসের অভাবে খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকা শত শত টন পণ্য বৃষ্টিতে ভিজে যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কয়েকশ কোটি টাকার মালামাল সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্ষা শুরুর আগেই জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প গুদাম সুবিধা, পরিবেশগত বর্জ্য অপসারণ এবং নিরাপদ অপারেশনাল অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি স্থায়ী কার্গো হাউস পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না করলে দেশের আমদানি বাণিজ্য আরও বড় অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।