আজ শুক্রবার, ১৩ মার্চ— শহীদ মঈন হোসেন রাজুর মৃত্যুবার্ষিকী। এই দিনটিকে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিয়াশীল প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো সন্ত্রাসবিরোধী রাজু দিবস হিসেবে পালন করে। এ উপলক্ষে টিএসসির সড়কদ্বীপে অবস্থিত রাজুর বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোসহ বভিন্ন কর্মসূচি পালন করে ছাত্র ইউনিয়ন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসের প্রতিবাদ করতে গিয়ে গুলিতে প্রাণ হারানো এই তরুণ নেতার স্মৃতিকে জীবন্ত রাখতে নির্মিত হয়েছিল সন্ত্রাসবিরোধী রাজু স্মারক ভাস্কর্য। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে বিভিন্ন আন্দোলন ও প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবেও ভাস্কর্যটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
কে ছিলেন মঈন হোসেন রাজু?
১৯৮৭ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে মঈন হোসেন রাজু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগে ভর্তি হন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন তিনি। ক্যাম্পাসে ভর্তি হওয়ার আগে থেকেই বামপন্থি ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সেই সম্পর্ক আরও গভীর হয়।
রাজু যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তখন স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন চলছিল। সেই আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। শহীদ হওয়ার সময় তিনি ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সমাজকল্যাণ সম্পাদক। ১৯৯২ সালের ১৩ মার্চ, রমজান মাসে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।
রাজু ভাস্কর্য
রাজুর নিহতের পাঁচ বছর পর ১৯৯৭ সালে, তার স্মরণে টিএসসি এলাকার সড়কে নির্মিত হয় সন্ত্রাসবিরোধী রাজু স্মারক ভাস্কর্য। ওই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর ভাস্কর্যটি উদ্বোধন করা হয়। নকশা করেছিলেন ভাস্কর শ্যামল চৌধুরী।
ভাস্কর্যে মোট আটজনের অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তারা হলেন— মুনীম হোসেন রানা, শাহানা আক্তার শিলু, সাঈদ হাসান তুহিন, আবদুল্লাহ মাহমুদ খান, তাসফির সিদ্দিক, হাসান হাফিজুর রহমান সোহেল, উৎপল চন্দ্র রায় এবং গোলাম কিবরিয়া রনি।
প্রায় তিন দশক ধরে ভাস্কর্যটির পাদদেশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও প্রতিবাদের প্রতীকী স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
ছাত্র ইউনিয়নের বিভক্তি
মঈন হোসেন রাজু ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নেতা। সন্ত্রাসবিরোধী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় আইকন রাজুর সংগঠনটি বর্তমানে দুটি পৃথক অংশে বিভক্ত হয়ে পরিচালিত হচ্ছে। দুটি অংশের মধ্যে গঠনতন্ত্র বা ঘোষণাপত্রে কোনও পার্থক্য না থাকলেও তারা আলাদা কমিটির মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
একটি অংশের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন মাহির শাহরিয়ার রেজা ও বাহাউদ্দিন শুভ। তবে এই অংশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও সক্রিয় কমিটি নেই। মূলধারা হিসেবে পরিচিত এই অংশটি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে চলে বলে জানা গেছে। অপর অংশের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন তামজীদ হায়দার ও শিমুল কুম্ভকার। এই অংশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটিতে নেতৃত্বে রয়েছেন মেঘমল্লার বসু ও মাঈন আহমেদ।
বিভক্তির পটভূমি
৪০তম জাতীয় সম্মেলনের প্রক্রিয়া ও নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে মতবিরোধ থেকে ২০২১ সাল থেকে সংগঠনটি বিভক্ত হয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে কয়েক দফা আলোচনার পর দুই পক্ষ ২০২৩ সালের মার্চে ‘ঐক্যবদ্ধ ৪১তম জাতীয় সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত করে। তবু ২০২৬ সালে এসেও দুটি কমিটি পৃথকভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, ছাত্র ইউনিয়নে এটিই প্রথম বিভক্তি নয়। পাকিস্তান আমলে ১৯৬৫ সালে রাশেদ খান মেনন ও মতিয়া চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রথম বিভাজন ঘটে। এরপর ১৯৯৪ সালেও একবার ভাঙনের মুখে পড়েছিল সংগঠনটি, যদিও সেটি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
দুই অংশের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ
মূল ধারার সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন শুভ বলেন, ‘‘কর্মপদ্ধতি বা নীতিনির্ধারণী বিষয়ে মৌলিক কোনও পার্থক্য নেই, তবে কার্যপরিচালনায় কিছু মতভেদ রয়েছে।’’ তিনি অভিযোগ করেন, অপর অংশের মধ্যে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সভায় অংশ নেওয়াসহ কিছু আচরণ সাম্প্রদায়িক মানসিকতার পরিচয় দেয়, যা ছাত্র ইউনিয়নের ৭৩-৭৪ বছরের সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী ঐতিহ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
অপর অংশের সাধারণ সম্পাদক শিমুল কুম্ভকার বলেন, ‘‘৪০তম সম্মেলনে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বেশকিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটেছিল, সেটিই বিভক্তির মূল কারণ।’’ ছাত্রশিবিরের উপস্থিতিতে সভায় যোগদানের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘তারা সেই সভায় শিবিরের উপস্থিতির প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।’’ একইসঙ্গে প্রশ্ন তোলেন, ‘‘যে অংশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও কমিটিই নেই, তারা সেই সভায় অংশ নিয়েছিল কেন।’’
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির (একাংশ) সভাপতি মেঘমল্লার বসু বলেন, ‘‘ছাত্র ইউনিয়নের যে ভাঙন, সে ভাঙন হয়েছিলো গঠনতান্ত্রিক ব্যত্যয় এর জায়গা থেকে। আমরা রিক্যুইজিশন সম্মেলন দিতে চেয়েছিলাম, সেই রিক্যুইজিশন সম্মেলনের ধারা ছাত্র ইউনিয়নের গঠনতন্ত্রে আছে। রিক্যুইজিশন সম্মেলন আসলে ওই ফ্যাকশন মানে নি। তারা পরবর্তী সময়ে নতুন করে সম্মেলন করতে চায় নি।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘এখন তো আসলে রাজনীতির একটা ভিন্ন সময় চলছে। সেই সময়ে দাঁড়ায়ে আসলে এটা আবার এক হবে কিনা, যারা ছাত্র ইউনিয়ন করবে ভবিষ্যতে তাদের ওপর নির্ভর করবে। কিন্তু যে গঠনতান্ত্রিক ব্যত্যয়ের জায়গা এবং হচ্ছে যে রাজনৈতিক প্রশ্নে যে দ্বিমতের জায়গা সেই জায়গা তো আসলে আমাদের আগের জায়গাই রয়ে গেছে।’’
সাবেক নেতারা কী বলছেন?
সাবেক নেতারা মনে করেন, এই বিভক্তি আদর্শগত নয়, বরং কার্যপরিচালনাগত। যেহেতু কোনও অংশই গঠনতন্ত্র বা ঘোষণাপত্র পরিবর্তন করেনি— তাই এই বিভাজনকে তারা প্রকৃত বিভক্তি বলে মানতে নারাজ এবং এটি সমাধানযোগ্য বলে প্রত্যাশা করেন।
এ বিষয়ে সংগঠনটির সাবেক সভাপতি মানবেন্দ্র দেব বলেন, ‘‘রাজুর আদর্শকে গ্রহণ করলেই কেবল তার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব। আদর্শ এক হলে কৌশলগত বা পদ্ধতিগত মতভেদ থাকতেই পারে এবং তা সমাধানও করা যায়।’’ তবে ছাত্র ইউনিয়নের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও মুক্তবুদ্ধির চর্চায় কোনও আপস করা যাবে না বলেও তিনি জোর দিয়ে বলেন।
সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস আহমেদ উজ্জ্বল বলেন, ‘‘যদি সত্যিই দুটি আলাদা ছাত্র ইউনিয়ন থাকে, তাহলে তাদের গঠনতন্ত্র ও ঘোষণাপত্রও আলাদা হতে হবে। সেটি না হলে এই বিভক্তি কোনও অর্থবহ বিভক্তি নয়।’’ এই দ্বিধাবিভক্তি রাজনৈতিক কিনা— সেটিও যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করার দাবি রাখেন তিনি।
সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক মীর মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘‘শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের কল্যাণে কাজ করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রকৃত জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে পরিণত করাই ছিল সংগঠনের লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্যে কাজ করে গেছেন মঈন হোসেন রাজু।’’ বিভক্ত সংগঠন দুটি এখন কীভাবে সেই আদর্শকে প্রতিনিধিত্ব করতে চায়, সেটি তাদের নিজস্ব বিষয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।