জীবন চলার পথে রোগ-বালাই আসাটা খুবই স্বাভাবিক। ইসলাম আমাদের শেখায়, রোগ কোনও অভিশাপ নয়; বরং এটি একটি পরীক্ষা, যা মানুষের ধৈর্য ও ঈমানকে যাচাই করার মাধ্যম। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘অবশ্যই আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, জান ও মালের ক্ষতি এবং ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৫৫)।
এজন্য বলা যায়, সুস্থতা ও অসুস্থতা উভয়ই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য বিশেষ নেয়ামত। কেননা, রোগ আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। তাই এর জন্য কখনওই অসন্তুষ্ট হওয়া উচিত নয়। এটি মূলত মানুষের ধৈর্য ও ঈমানকে শক্তিশালী করার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা।
অনেক সময় রোগ আমাদের পাপ মোচন করে এবং আখিরাতে উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে দেয়। হাদিসে এসেছে, শাদ্দাদ ইবনে আউস (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন আমি আমার কোনও মুমিন বান্দাকে বিপদে ফেলে পরীক্ষা করি এবং সে ধৈর্য ধারণ করে ও আমার প্রশংসা করে, তখন আমি তাকে পাপমুক্ত অবস্থায় পুনরায় জীবন দান করি, যেমন সে মাতৃগর্ভ থেকে জন্মেছিলো।’
তবে, রোগে আক্রান্ত হলে বসে থাকা যাবে না। বরং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখেই তার চিকিৎসা নিতে হবে। কারণ, ইসলাম চিকিৎসার প্রতি জোর দিয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘হে আল্লাহর বান্দারা, তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। কেননা, আল্লাহ এমন কোনও রোগ দেননি, যার আরোগ্য তিনি রাখেননি। তবে বার্ধক্য ছাড়া।’
আর রোগমুক্তির সবচেয়ে কার্যকরী পথ্য হচ্ছে, পবিত্র কোরআন ও হাদিস। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি, যা মুমিনদের জন্য শেফা (রোগমুক্তি) ও রহমত স্বরূপ।’ (সুরা বনী ইসরাইল, আয়াত : ৮২)।
এর পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণেও কোনও বাধা নেই; বরং ক্ষেত্র বিশেষ তা করানো জরুরি। রমজানেও আমরা নানা রোগে আক্রান্ত হতে পারি এবং এজন্য আমাদের নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরিক্ষা করানো লাগতে পারে। এখন আমরা জানবো যে, রোজা রেখে কোন ডাক্তারি পরীক্ষার কী হুকুম?
এন্ডোস্কপি
এ পরীক্ষা করার সময় লম্বা চিকন একটি পাইপ রোগীর মুখ দিয়ে পাকস্থলীতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, যার মাথায় বাল্বজাতীয় একটি বস্তু থাকে। নলটির অপর প্রান্ত থাকে মনিটরের সঙ্গে। এভাবে চিকিৎসকগণ রোগীর পেটের অবস্থা নির্ণয় করে থাকেন।
যেহেতু এন্ডোস্কপিতে নল বা বাল্বের সঙ্গে কোনো মেডিসিন লাগানো হয় না, তাই এর কারণে সাধারণ অবস্থায় রোজা ভাঙার কথা নয়। কিন্তু, বিশেষজ্ঞ ডাক্তার থেকে জানা গেছে এবং প্রত্যক্ষভাবে দেখা গেছে যে, এন্ডোস্কপির সময় টেস্টের প্রয়োজনে চিকিৎসকগণ কখনও কখনও নলের ভেতর দিয়ে পানি ছিটিয়ে থাকেন, যা সরাসরি রোজা ভঙ্গের কারণ। সুতরাং যদি কারো ক্ষেত্রে পানি বা ওষুধ ভেতরে প্রবেশ করানো ছাড়াই টেস্টটি সম্পন্ন হয়, তাহলে তার রোজার কোনও ক্ষতি হবে না। অন্যথায় রোজা নষ্ট হয়ে যাবে।
এন্ডোস্কপি করা হয় খালি পেটে, তাহলে একজন রোজাদার রোজা অবস্থায় এ টেস্টটি না করাতে পারলে কীভাবে তা করাবে? এ প্রশ্নের জবাবে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জানান, এক্ষেত্রে রোগীর পানি পান করতে বাধা নেই। তাই রোগী ইচ্ছা করলে শুধু পানি দ্বারা ইফতার করে টেস্টটি করিয়ে নিতে পারে।
এন্ডোস্কপির মতোই মলদ্বার দিয়ে নল ঢুকিয়ে আরেকটি পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রেও একই হুকুম প্রযোজ্য হবে।
এনজিওগ্রাম
সাধারণ পদ্ধতির এনজিওগ্রামের কারণে রোজা নষ্ট হয় না।
ইনজেকশন ও ইনসুলিন
ইনজেকশনের কারণে রোজা ভাঙে না। এমনিভাবে একজন রোজাদার ইফতারের আগেও ইনসুলিন ইনজেকশন নিতে পারে। অবশ্য যেসকল ইনজেকশন খাদ্যের কাজ দেয় জটিল ওজর ছাড়া তা নিলে রোজা মাকরূহ হবে।
স্প্রে জাতীয় ওষুধ
বর্তমানে এ্যারোসল জাতীয় বেশকিছু ওষুধ দ্বারা বক্ষব্যাধি, হার্টএ্যাটাক ও অন্যান্য রোগের চিকিৎসা করানো হয়ে থাকে। গ্যাস জাতীয় এ সকল ওষুধ রোগীর মুখের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করানো হয়। নিচে রমজানে এ ওষুধগুলো ব্যবহারের হুকুম বর্ণনা করা হল।
নাইট্রোগ্লিসারিন
এ্যারোসোল জাতীয় ওষুধটি হার্টের রোগীরা ব্যবহার করে থাকে। জিহ্বার নিচে ২/৩ বার ওষুধ দিয়ে মুখ বন্ধ রাখা হয়। ডাক্তারদের মতে সঙ্গে সঙ্গে ওই ওষুধ শিরার মাধ্যমে রক্তে মিশে যায়। এ হিসেবে এ ওষুধ ব্যবহার করলে রোজা নষ্ট হবে না। তবে রোগীর কর্তব্য হলো, জিহ্বার নিচের ওষুধটি দেওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে তা গিলে না ফেলা।
ভেন্টোলিন ইনহেলার
বক্ষব্যাধির জন্য এ ওষুধ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। রোগীদেরকে মুখের ভেতর এমনভাবে ওষুধটি স্প্রে করতে বলা হয়, যাতে তা সঙ্গে সঙ্গে ভেতরের দিকে চলে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যনালী হয়ে ওষুধটি ফুসফুসে গিয়ে কাজ করে থাকে। সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের সচিত্র ব্যাখ্যা থেকে এ কথা সুস্পষ্টভাবে বোঝা গেছে, ওষুধটি স্প্রে করার পর এর কিছু অংশ খাদ্যনালীতেও প্রবেশ করে। সুতরাং এ ধরনের ইনহেলার প্রয়োগের কারণে রোজা নষ্ট হয়ে যাবে।
চিকিৎসকগণ বলেছেন, মারাত্মক জটিল রোগী ছাড়া অন্য সকলেরই সেহরিতে এক ডোজ ইনহেলার নেওয়ার পর পরবর্তী ডোজ ইফতার পর্যন্ত বিলম্ব করার সুযোগ রয়েছে। সুতরাং, রোগীর কর্তব্য হলো বিষয়টি তার চিকিৎসক থেকে বুঝে নেওয়া এবং সম্ভব হলে রোজা অবস্থায় তা ব্যবহার না করা।
অবশ্য যদি কোনও রোগীর অবস্থা এত জটিল হয় যে, ডাক্তার তাকে অবশ্যই দিনেও ওষুধটি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে ওই রোগীর এ সময়ে ইনহেলার ব্যবহার করার অবকাশ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে রোজা কাজা করে নেবে।