গ্যাস সিলিন্ডার দুর্ঘটনা বাড়ছে, প্রাণহানি উদ্বেগজনক

রান্নাঘরে নিঃশব্দে জমছে গ্যাস। চুলা জ্বালাতেই বিস্ফোরণ, আগুন, দগ্ধ শরীর। এমন ঘটনা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অহরহই। গ্যাস সিলিন্ডার ও পাইপলাইনের লিকেজ থেকে সৃষ্ট আগুন এখন নীরব এক আতঙ্ক, যা কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ, ভেঙে দিচ্ছে পরিবার।

রাজধানীসহ সারাদেশে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও পাইপলাইনের লিকেজজনিত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বাড়ছে। বিশেষ করে রমজানে ইফতার ও সেহরির সময় এসব দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। চিকিৎসকদের মতে, অসচেতনতা, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের অভাব এবং একই কক্ষে রান্না ও বসবাস—এসব কারণে দুর্ঘটনাগুলো ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

সম্প্রতি সাভারের আশুলিয়ায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে একই পরিবারের চারজন দগ্ধ হন। তারা বর্তমানে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন।

দগ্ধদের মধ্যে জুয়েল ইসলামের শরীরের প্রায় ৯০ শতাংশ পুড়ে গেছে। তার স্ত্রী শ্যামলী ৩৭ শতাংশ দগ্ধ হয়েছেন। তাদের দুই সন্তানের শরীরের যথাক্রমে ১৮ ও ১৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। চিকিৎসকদের মতে, স্বামী-স্ত্রীর অবস্থা আশঙ্কাজনক।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ১৫ মার্চ সেহরির জন্য দুধ গরম করার সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে। রান্না শেষে সিলিন্ডার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। পুনরায় সংযোগ দেওয়ার সময় বিস্ফোরণ ঘটে। জুয়েল ইসলাম সিলিন্ডারের সবচেয়ে কাছে থাকায় তিনি বেশি দগ্ধ হন। শ্যামলী ও শিশুরা কিছুটা দূরে থাকায় তুলনামূলক কম আহত হয়। পরিবারটি একটি কক্ষেই বসবাস করত, রান্নার আলাদা ব্যবস্থা ছিল না।

স্বজনদের দাবি, গ্যাস সাশ্রয়ের জন্য ব্যবহারের পর সিলিন্ডার খুলে রাখতেন শ্যামলী। তবে এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে—এ বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন না। তাদের মতে, অনেক পরিবারেই এমন অভ্যাস রয়েছে।

জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগের ইনচার্জ আশিকুর রহমান বলেন, রমজানে অন্যান্য সময়ের তুলনায় দগ্ধ রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। গ্যাসজনিত দুর্ঘটনার পাশাপাশি গরম পানি, রান্নার সময় ও বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায় দগ্ধ হয়ে রোগীরা আসছেন। অধিকাংশ ঘটনা ঘটে ইফতার ও সেহরির সময়।

তিনি জানান, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভার এলাকা থেকে বেশি রোগী আসছে, যাদের অনেকেই নিম্ন আয়ের পরিবারের।

জরুরি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ১ হাজার ৬০০, ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ৪৫০ এবং ১৫ মার্চ পর্যন্ত ৫৪৬ জন দগ্ধ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে গ্যাস সিলিন্ডার-সম্পর্কিত ঘটনায় আহত হয়েছেন ২২ জন এবং মার্চের প্রথমার্ধেই এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪ জনে। বেশিরভাগ ঘটনাই গুরুতর।

আশিকুর রহমান বলেন, অনেক রোগী জানিয়েছেন দুর্ঘটনার সময় ঘর বন্ধ ছিল। দরজা-জানালা বন্ধ থাকলে গ্যাস জমে থাকে। সামান্য স্ফুলিঙ্গ থেকেও বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। তার মতে, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল থাকলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। একই কক্ষে রান্না ও বসবাসের কারণে এক ঘটনায় পরিবারের একাধিক সদস্য দগ্ধ হওয়ার ঘটনাও বেশি।

চিকিৎসকরা জানান, জানুয়ারি থেকে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত দগ্ধ রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি ছিল, যা রমজানে আরও বেড়েছে।

এর আগে ২৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের হালিশহরে গ্যাস পাইপলাইনের লিকেজ থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে একই পরিবারের ছয়জন মারা যান। তাদের শরীরের ৪০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পুড়ে গিয়েছিল। ওই পরিবারের তিন শিশু এখনও জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন।

একই দিনে ঢাকার রায়েরবাজারে গ্যাস লিকেজজনিত অগ্নিকাণ্ডে তিন বছরের এক শিশুসহ চারজন দগ্ধ হন। পরদিন কুমিল্লার দাউদকান্দিতে গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে এক শিশুসহ চারজন আহত হন, যাদের মধ্যে দুজনের শরীরের ৪০ শতাংশের বেশি পুড়ে যায়। ২৫ ফেব্রুয়ারি চাঁদপুরের কচুয়ায় একই ধরনের ঘটনায় আরও তিনজন দগ্ধ হন।

তথ্য বলছে, চলতি বছরের শুরু থেকে অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি রোগীদের প্রায় অর্ধেকের শরীরের ২০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পুড়ে গেছে।

বার্ন ইনস্টিটিউটের রেসিডেন্ট চিকিৎসক ডা. শাওন বিন রহমান বলেন, গ্যাসজনিত দগ্ধ রোগীদের মৃত্যুহার বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ হলো ইনহেলেশন ইনজুরি—অর্থাৎ বাহ্যিক দগ্ধতার পাশাপাশি শ্বাসনালিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শরীরের বড় অংশ পুড়ে গেলে ঝুঁকি আরও বাড়ে।

তিনি জানান, শরীরের ২০ শতাংশের বেশি অংশ পুড়ে গেলে এবং শ্বাসনালি ক্ষতিগ্রস্ত হলে চিকিৎসার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। ৩০ শতাংশের বেশি দগ্ধতা এবং শ্বাসনালি আক্রান্ত হলে মৃত্যুঝুঁকি ৫০ শতাংশেরও বেশি হয়ে যায়।