ঈদ এলেই একই চিত্র— জীবনের ঝুঁকি জেনেও ট্রেনের ছাদে উঠে বাড়ি ফিরছেন মানুষ। রাজধানী থেকে জেলা, বড় স্টেশন থেকে ছোট স্টেশন— সবখানেই চোখে পড়ে এই দৃশ্য। আইন আছে, নিষেধাজ্ঞা আছে, অভিযানও হয়। তবু কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা— সেই প্রশ্নই বারবার সামনে আসছে।
আইন কী বলছে
বাংলাদেশে ট্রেনের ছাদে চড়ে ভ্রমণ স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। কার্যকর রেলওয়ে অ্যাক্ট ১৮৯০ অনুযায়ী যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত নয়— এমন স্থানে (যেমন- ছাদ বা ফুটবোর্ড) ভ্রমণ করা অপরাধ। রেলকর্মীদের সতর্কতার পরও কেউ এভাবে ছাদে ভ্রমণ করলে তাকে জরিমানা করা এবং জোর করে নামিয়ে দেওয়ার বিধান রয়েছে।
এর পাশাপাশি ২০২২ সালে হাইকোর্ট নির্দেশ দেয়— কোনও অবস্থাতেই ট্রেনের ছাদে যাত্রী বহন করা যাবে না। নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।
তারপরও কেন বন্ধ হচ্ছে না?
আইন ও নির্দেশনার পরও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। এর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ কাজ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অতিরিক্ত যাত্রী ও টিকিট সংকট
ঈদ মৌসুমে ট্রেনের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। আগাম টিকিট না পেয়ে অনেকেই শেষ মুহূর্তে স্টেশনে ভিড় করেন। ফলে বাধ্য হয়েই ঝুঁকি নিয়ে ছাদে ওঠেন অনেকে।
পর্যাপ্ত বগি ও ট্রেনের অভাব
যাত্রীসংখ্যার তুলনায় ট্রেন ও বগি কম থাকায় চাপ তৈরি হয়। এতে ছাদে ভ্রমণ এক ধরনের “অঘোষিত বিকল্প” হয়ে দাঁড়ায়।
আইন প্রয়োগে দুর্বলতা
ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ বন্ধ করতে রেল কর্তৃপক্ষ মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও সবসময় তা কার্যকর থাকে না। ফলে স্টেশন ও প্ল্যাটফর্মে নিয়ন্ত্রণের ঘাটতির সুযোগে যাত্রীরা ছাদে উঠে পড়েন।
বুধবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যাচ্ছে সুমন্ত সেন। তিনি বলেন, ‘‘বছরের পর বছর একই জিনিস দেখে আসছি। ছাদে চড়ে যাওয়া ভয়ের হলেও একশ্রেণির যাত্রী ভয় পায় না। পুলিশকে দেখেছি, প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে এথাকে, মাঝেমধ্যে ধমক দেয়। তবে এভাবে আসলে সমস্যার সমাধান সম্ভব না।’’
চট্টগ্রামের যাত্রী মোয়াজ্জেম হোসেইন বলেন, ‘‘বাসের চেয়ে ট্রেন নিরাপদ। ঈদের সময় বাসযাত্রায় বেশি এক্সিডেন্ট হয়। তার চেয়ে ট্রেনে যাওয়া ভালো। এই কারণ অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে হলেও ট্রেনেই যেতে চায়।’’
রেলওয়ে পুলিশের বক্তব্য
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশের এসপি শফিকুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘ট্রেনের ছাদে ওঠা এবং বিনা টিকিটে ভ্রমণ—দুটিই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ বিষয়ে নিয়মিত জরিমানা করা হচ্ছে এবং রেলওয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।’’
তিনি জানান, ঈদযাত্রার আগে থেকেই স্টেশনে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা হয়েছে, যাতে প্ল্যাটফর্মে অতিরিক্ত ভিড় কমানো যায়। তবে যাত্রীচাপ বেশি থাকায় শতভাগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না।
শফিকুর রহমান আরও বলেন, “কেউ যদি কোনোভাবে ছাদে উঠে পড়েন, তাদের নামাতে গেলে সময় লাগে। এতে ট্রেনের নির্ধারিত সময়সূচি ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। প্রতিটি স্টেশনে অল্প সময় থামার কারণে পুরো ছাদ খালি করা সবসময় সম্ভব হয় না।”
তিনি বলেন, এটি যেমন অবৈধ, তেমনই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। একজন যাত্রী নিজেই নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো— রেলের চাহিদার তুলনায় আমাদের সক্ষমতা কম। অনলাইনে টিকিট বিক্রির পাশাপাশি ২৫ শতাংশ স্ট্যান্ডিং টিকিট দেওয়া হলেও চাহিদা পূরণ হচ্ছে না।”
সমাধান কী?
সাধারণ যাত্রীরা বলছেন, শুধু আইন প্রয়োগ নয়— সমস্যার মূল জায়গায় সমাধান দরকার। ট্রেনের সংখ্যা ও বগি বাড়ানো, টিকিট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং স্টেশন ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। তবে সেই চাহিদার সঙ্গে সক্ষমতার সমন্বয় না হলে ট্রেনের ছাদে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার এই চিত্র পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।’’