টাঙ্গাইলে সড়ক দুর্ঘটনা

‘বাবা হামার খিলানা শুরু করছিল, আল্লাই লিয়্যা গেল’

ইমরান আলী, মান্দা (নওগাঁ) থেকে
০১ জুন ২০২৬, ১৮:৫৩ আপডেট : ০১ জুন ২০২৬, ১৯:০৭

বিকালের শেষ আলো তখন ধীরে ধীরে নেমে আসছে। সারাদিনের তপ্ত রোদের পর হালকা বাতাসে স্বস্তি খুঁজছেন মানুষ। কেউ গাছতলায় বসেছেন, কেউ বের হয়েছেন খোলা আকাশের নিচে একটু জুড়ানোর আশায়। চারপাশে শান্ত, নিরিবিলি পরিবেশ। কিন্তু সেই শান্ত বিকালেও নওগাঁর মান্দা উপজেলার একটি গ্রামে থামেনি কান্না। একের পর এক উঠান থেকে ভেসে আসছে আহাজারি। কেউ ডাকছেন ছেলেকে, কেউ স্বামীকে। কিন্তু যাঁদের জন্য এই আর্তনাদ, তাঁরা আর কোনও দিন ফিরবেন না।

একটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে গ্রামের কয়েকটি পরিবারের স্বপ্ন, ভরসা আর ভবিষ্যৎ। ঈদের আগে স্বজন হারানো পরিবারগুলো এখনও শোকের সাগরে ভাসছে। তাদের কান্নায় ভারী হয়ে আছে পুরো গ্রাম।

বলছি মান্দা উপজেলার ভারশো ইউনিয়নের রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের কথা। গত ২৫ মে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ঈদ উপলক্ষে বাড়ি ফেরা মানুষ বহনকারী রডবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে যায়। এতে নিহত হন ১৫ জন। তাঁদের মধ্যে আটজনের বাড়ি এই গ্রামে। ঈদের ঠিক আগে এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় পুরো গ্রাম এখনও স্তব্ধ। রবিবার (৩১ মে) বিকালে সরেজমিনে গিয়ে সেই শোকের চিত্রই দেখা গেল।

রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কের হাজী গোবিন্দপুর মোড় থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার ভেতরে ভারশো ইউনিয়নের বিরকইলাপুর বাজার। সেখান থেকে আরও কয়েক কিলোমিটার দূরে দেউল দুর্গাপুর ঘাট। শিবনদী রক্ষা বাঁধের দক্ষিণ পাশে গড়ে ওঠা বসতিগুলো নিয়ে রাজেন্দ্রবাটি গ্রাম।

ওই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো গ্রামের আটজন হলেন—তারেক রহমান, বাদশা, আব্দুল বারিক, সোহাগ, রবিউল, মাইনুর, সাগর ও সুজন।

‘বাবা হামার খিলানা শুরু করছিল’

নিহত সোহাগের বাড়িতে ঢুকতেই দেখা যায়, মা শরিফা বেগম মেয়েকে জড়িয়ে শুয়ে কাঁদছেন। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তাঁর কান্না যেন আরও বেড়ে যায়।

কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘বাবা হামার খিলানা (খাওয়ানো) শুরু করছিল, আর এই সময়েই আল্লা হামার বাবাক লিয়্যা গেল।’

শরিফা বেগম বলেন, তাঁর স্বামী সাকিম আলী নিয়মিত কাজ করতে পারেন না। ছেলের উপার্জনের ওপর ভর করেই সংসার একটু একটু করে দাঁড়াতে শুরু করেছিল।

‘আমাদের আর কোনও উপার্জন করার লোক নাই। ছেলেটা নোয়াখালীতে সাইকেলে কইরা হরেক রকম মাল বিক্রি করতো। গ্রামের আরও অনেকে সেখানে ছিল। কিন্তু কী হইল, কিছুই বুঝলাম না। ঈদে বাড়ি আসার সময় এমন ঘটনা ঘটল।’

কয়েক মাস আগে ছেলের বিয়ে দিয়েছিলেন। ছেলের মৃত্যুর পর পুত্রবধূও শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন।

তিনি বলেন, ‘সরকারি কিছু সহায়তা পাইছিলাম। এখন ওইটা দিয়াই কোনোমতে চলতেছি।’



নিহত তারেকের পরিবার। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

প্রতিবেশী কয়েক বাড়িতে চলছে আর্তনাদ

নিহত তারেকের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে অনেক মানুষের ভিড়। প্রতিবেশীরা এসেছেন তার মাকে সান্ত্বনা দিতে।

তারেকের বাবা সুলতান জানান, দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে তারেক ছিলেন সবার ছোট। পরিবারের সদস্যরা নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ এলাকায় সাইকেলে করে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করেন। তিনি বলেন, ‘ঈদের জন্য বাড়ি আসতেছিল। কিন্তু বাড়ি আর ফেরা হইল না।’

ছেলেকে হারিয়ে তাঁর মা মোমেনা বেগম প্রায় ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছেন। বারবার বলছিলেন, “আমার ছেলে কোথায়? আমার কাছে এনে দাও।”



নিহত বাদশার পরিবার। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

নিহত বাদশার বাড়িতেও শোকের মাতম। ছয় ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন বাদশা। তাঁর স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘আমার কেউ রইল না। একটা ছোট মেয়ে আছে। আমি এখন কোথায় যাব?’

সরকারি সহায়তার টাকাতেই এখন কোনোমতে সংসার চলছে বলে জানান তিনি। মেয়ের এই দুঃসময়ে পাশে থাকতে ছুটে এসেছেন তাঁর মা কোহিনুর বেগম। মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনিও উদ্বিগ্ন।

এভাবেই প্রতিটি পরিবারে চলছে শোক আর স্বজন হারানোর বেদনা।

‘টাকা বাঁচাতে ট্রাকে উঠেছিলাম’

ওই দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন রবিউলের ভাই রমেসও। তিনি বলেন, ‘আসলে আমরা টাকা সেভ করতে চেয়েছিলাম। ঈদের সময় গাড়িভাড়া অনেক বেশি ছিল। ট্রাকে আসলে কম খরচ হয়, তাই উঠেছিলাম।’

রমেস জানান, দুর্ঘটনার দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তাঁকে উদ্ধার করেন।

‘আমি তখন জাগাই ছিলাম। দেখলাম ট্রাকটা ব্রেক করল, আর মুহূর্তের মধ্যে উল্টে গেল। আমার হাত ভেঙে গেছে। পায়েও অনেক ব্যথা পাইছি’, বলেন রমেস।

এক গ্রামের জীবন-জীবিকা


খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ শিবনদী রক্ষা বাঁধের পাশে সরকারি জমিতে বসতি গড়ে তুলেছেন। একসময় তাঁদের প্রধান পেশা ছিল মাছ ধরা। কিন্তু নদীকেন্দ্রিক সেই জীবিকা অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

এখন গ্রামের অধিকাংশ পুরুষ নোয়াখালীর বিভিন্ন এলাকায় সাইকেলে করে প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য বিক্রি করেন।

গ্রামের বাসিন্দা বেলাল হোসেনও তাঁদের একজন। তিনি বলেন, ‘বছরের বেশির ভাগ সময় আমরা নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে থাকি। সাইকেলে করে প্লাস্টিকের মালপত্র বিক্রি করি। এতে যা আয় হয়, সংসার চলে যায়।’

কেন এত দূরে গিয়ে কাজ করেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই ওই এলাকায় আমাদের যাতায়াত। তাই আমরা সেদিকেই যাই।’

দুর্ঘটনার দিনের কথা স্মরণ করে বেলাল বলেন, ‘আমিও সেদিন বাড়ি আসছিলাম, তবে অন্য গাড়িতে। সবাই ঈদের আনন্দ করতে বাড়ি ফিরছিল। কিন্তু কী থেকে কী হয়ে গেল!’

গ্রামের আরেক বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বাঁধের ওপর পাকা রাস্তার পাশে আমরা থাকি। এগুলো মূলত সরকারি জায়গা। আমরা ভূমিহীন মানুষ। কোনোমতে মাথা গোঁজার ঠাঁই আছে। হরেক মাল বিক্রি করেই সংসার চলে।’

তিনি বলেন, ‘এই একটা ঘটনা আমাদের পুরোপুরি নাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা আসলে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি।’

ঈদের আগে বাড়ি ফেরার আনন্দে যে মানুষগুলো রওনা হয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই আর ঘরে ফিরতে পারেননি। রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের মানুষের কাছে তাই এবারের ঈদ আনন্দের নয়, বেদনার স্মৃতি হয়ে থাকবে অনেক দিন।


 

/ইউএস/এমএএল/এমওএফ/
সম্পর্কিত
শ্যামলী ওভারব্রিজের নিচে রাস্তা পারাপারের সময় গাড়ির চাপায় ২ নারী নিহত 
প্রেমিকের বাইক চালাচ্ছিলেন প্রেমিকা, একসঙ্গে দুজনেরই মৃত্যু
ঢাবি শিক্ষকের ছেলের গাড়ির ধাক্কায় ৭ শিক্ষার্থী আহত
সর্বশেষ খবর
দেশের প্রথম জলবায়ু জাদুঘর, যা প্রকৃতিকে জানার ব্যতিক্রমী ঠিকানা
দেশের প্রথম জলবায়ু জাদুঘর, যা প্রকৃতিকে জানার ব্যতিক্রমী ঠিকানা
টাকা দ্বিগুণ করার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা, গ্রেফতার ৩
টাকা দ্বিগুণ করার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা, গ্রেফতার ৩
‘মোহাম্মদ’ নাম নিয়ে ট্রাম্পের উপহাস
‘মোহাম্মদ’ নাম নিয়ে ট্রাম্পের উপহাস
ঘরোয়া বাঙালি স্বাদে লাউ-বড়ির তরকারি
ঘরোয়া বাঙালি স্বাদে লাউ-বড়ির তরকারি
সর্বাধিক পঠিত
মৃত্যুর ৪ দিন পর দাফন, নাসিমা খানের জানাজায় ছিলেন না বড় কোনও তারকা
মৃত্যুর ৪ দিন পর দাফন, নাসিমা খানের জানাজায় ছিলেন না বড় কোনও তারকা
সরকারি মাঠ দখলের অভিযোগ জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে, বললেন ‘এখন আমাদের সময়’
সরকারি মাঠ দখলের অভিযোগ জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে, বললেন ‘এখন আমাদের সময়’
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রথম দিনেই সাজেক ভ্রমণে ৫ শতাধিক পর্যটক
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রথম দিনেই সাজেক ভ্রমণে ৫ শতাধিক পর্যটক
বিএসএফের ধরে নিয়ে যাওয়া ২ পুলিশ সদস্য কেমন আছেন, জানালেন বিজিবি পরিচালক 
বিএসএফের ধরে নিয়ে যাওয়া ২ পুলিশ সদস্য কেমন আছেন, জানালেন বিজিবি পরিচালক 
দাম্পত্যের ১৪ বছর, বিবাহবার্ষিকীতে কারিনা-সাইফ আলীর নতুন খবর
দাম্পত্যের ১৪ বছর, বিবাহবার্ষিকীতে কারিনা-সাইফ আলীর নতুন খবর