বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সন্ধ্যায় ঝালকাঠি লঞ্চঘাট থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসে সুন্দরবন-১২ লঞ্চ; যার যাত্রী ছিল আমার দুই ভাগ্নি। লঞ্চ ছাড়ার কিছু আগে তাদের একজন ফেসবুকে লিখলো: ‘প্রচুর মানুষ, মানুষের ভিড়ে লঞ্চ ঢুলছে, তাও মানুষ উঠছে। চার হাজারের বেশি। জানি না পৌঁছাবো কিনা, আল্লাহ সহায়। ক্যাপাসিটির থেকে কয়েকগুণ মানুষ। অঘটন ঘটলে ফেক আহাজারি করবে কর্তৃপক্ষ।’
লঞ্চ ছাড়ার পরে আরেক যাত্রী ফেসবুকে লিখেছেন: ‘ঝালকাঠি থেকে সুন্দরবন-১২ লঞ্চ ছাড়লো এবং ধারণ ক্ষমতার থেকে অনেক বেশি যাত্রী নিলো। কী জন্য এতো অতিরিক্ত যাত্রী হওয়ার পর বরিশাল ঘাট দিয়ে আবার যাত্রী বোঝাই করা লাগলো? লঞ্চের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। এখন যদি কোনও দুর্ঘটনা হয়, তার দায় কে নেবে? এগুলা কি দেখার কেউ নাই? মানুষের জীবন গেলে তাদের কিছু এসে-যায় আদৌ? জীবনের কোনও মূল্য এই দেশে আছে?’
মুসলমানদের প্রধান দুটি ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় বাড়ি যাওয়া এবং ঈদ শেষে ঢাকায় ফেরা এখন এক বিরাট আতঙ্কের বিষয়। বলা হয়, রাষ্ট্রের সব উন্নয়ন দুই ঈদযাত্রায় এসে মুখ থুবড়ে পড়ে। তার কিছু যৌক্তিক কারণও আছে। কিন্তু সেই সমস্যাগুলো সমাধানে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন আছে, তেমনই আছে সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা এবং গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় অবিশ্বাস্যরকমের অনিয়ম ও দুর্নীতি। যে কারণে খুব ব্যতিক্রম বাদ দিলে দুটি ঈদেই অসংখ্য মানুষের আনন্দের ঈদযাত্রা পরিণত হয় মরণযাত্রায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
এবারের ঈদযাত্রার শুরুতেই একটি মর্মান্তিত ও ভয়াবহ দুর্ঘটনার সাক্ষী হয় রাজধানীর প্রধান নদীবন্দর সদরঘাট। গত ১৮ মার্চ বিকালে দুটি লঞ্চের ভয়াবহ সংঘর্ষে দুজন যাত্রী নিহত হন। তবে সংখ্যাটা যাই হোক না কেন, মোবাইল ফোনে ধরা পড়া ওই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখেছেন, তাদের পক্ষে স্থির থাকা কঠিন। ব্যক্তিগতভাবে দুয়েকজন জানিয়েছেন, ওই ভিডিও দেখার পরে আর তার কিছুই ভালো লাগছে না। অস্থির লাগছে। বুকে চাপ অনুভব করছেন। মনে হচ্ছে, এই ভিডিওটি দেখা উচিত হয়নি। সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ কেউ লিখেছেন, তারা ভিডিওটি দেখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দেখতে পারেননি। কারণ এটা দেখা সম্ভব নয়।
সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, ওই দিনই বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে ‘আসা যাওয়া-৫’ নামে একটি লঞ্চে ছোট ট্রলারের মাধ্যমে যাত্রী তোলার কাজ চলছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে ‘জাকির সম্রাট-৩’ নামে একটি লঞ্চ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পেছন থেকে আসা যাওয়া-৫ লঞ্চটিকে জোরালো ধাক্কা দেয়। দুই লঞ্চের মাঝখানে পড়ে ট্রলারে থাকা যাত্রীরা পিষ্ট হন। এতে ঘটনাস্থলেই দুজনের প্রাণ যায়। দুটি লঞ্চের মাঝখানে পিষ্ট হওয়ার ওই ভয়াবহ দৃশ্য সিনেমার দৃশ্যকেও হার মানায়। দুর্বলচিত্তের মানুষের পক্ষে এই দৃশ্য দেখা সম্ভব নয়।
এর তিন দিন পরে কুমিল্লায় যাত্রীবাহী বাসে মেইল ট্রেনের ধাক্কায় ১২ জন নিহত হন। গত ২১ মার্চ দিবাগত রাত ৩টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং এলাকায় মামুন পরিবহন নামে একটি যাত্রীবাহী বাসকে ধাক্কা দেয় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার দিকে যাওয়া মেইল ট্রেন। ট্রেনের ধাক্কায় বাসটি অন্তত আধা কিলোমিটার দূরে ছিটকে যায়।
ঈদযাত্রার এই মৃত্যুগুলো এখন কেবলই পরিসংখ্যান। কিন্তু যার স্বজন মারা যায়, তার কাছে একটি মৃত্যুও বিশাল যন্ত্রণার। তার কাছে এই মৃত্যু কোনও পরিসংখ্যানের বিষয় নয়। কিন্তু তারপরও একটু পরিসংখ্যানের দিকে নজর দেওয়া যাক।
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) জানিয়েছে, ঈদের সাত দিনের (১৭-২৩ মার্চ) ছুটিতে সারা দেশে ৯২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১০০ জন নিহত এবং ২১৭ জন আহত হয়েছেন। যদিও বেসরকারি সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রাথমিক হিসাবে, একই সময়ে ২৬৮টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ২০৪ জন এবং আহত হয়েছেন ছয় শতাধিক মানুষ।
দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পরিসংখ্যানে সরকারি ও বেসরকারি তথ্যের মধ্যে এই বড় ফারাক আরেকটি বড় সমস্যা। বরাবরই সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে বেসরকারি পরিসংখ্যানে হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি থাকে। ফলে প্রশ্ন ওঠে, কার তথ্যটি সঠিক? সরকার তথ্য গোপন করে নাকি বেসরকারি সংগঠনগুলো অতিরঞ্জিত তথ্য দেয়? নাকি তথ্য সন্নিবেশের প্রক্রিয়াগত পার্থক্যের কারণে হতাহতের সংখ্যায় এই ব্যবধান তৈরি হয়? সেটি অন্য তর্ক। কিন্তু যে তর্কটি বহু বছর ধরেও মীমাংসা করা গেলো না, সেটি হলো, ঈদযাত্রায় স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি মানুষ বড় শহরগুলো ছেড়ে জেলা-উপজেলা শহর বা গ্রামে যাবে, এটি জানার পরও সরকার এবং বেসরকারি গণপরিহনগুলো কেন নাগরিকদের জন্য নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাত্রা নিশ্চিত করতে পারে না? এটা সংশ্লিষ্টদের সক্ষমতার অভাব নাকি উদাসিনতা? নাকি রাষ্ট্রের সামগ্রিক দুর্নীতিগ্রস্ত সিস্টেমের কারণে ঈদযাত্রাগুলো অস্বস্তির ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে? নাকি একসঙ্গে অনেক মানুষ যাতায়াত করে বলে বাস্তবিক কারণেই কোনও কিছু সামলানো সম্ভব হয় না?
বিশ্বের যে কোনও দেশের রাজধানীর সঙ্গে তুলনা করলে ঢাকা হয়তো শীর্ষে, বা এক নম্বরেই থাকবে যেখানে প্রতি ঈদে প্রায় ১ কোটি মানুষ শহরটি ছেড়ে যায় এবং ঈদ শেষে আবার এই শহরে ফিরে আসে। পৃথিবীর অসংখ্য দেশ আছে, যাদের পুরো জনসংখ্যাও ১ কোটি নয়। অর্থাৎ একটি দেশের পুরো জনসংখ্যার সমপরিমাণ একটি জনগোষ্ঠী যখন একসঙ্গে একটি শহর ছেড়ে যায় এবং একসঙ্গে আবার তারা ফিরে আসে, তখন সেখানে নানা ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রের যে ধরনের ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার কথা ছিল, তা কি গত অর্ধ শতাব্দীতেও নিশ্চিত করা গেছে?
ঈদের সময় যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ থাকে বলে লোকাল রুটের বাসও দূরপাল্লার বাস হয়ে যায়। সেসব বাসে গাদাগাদি করে মানুষেরা শত শত মাইল পাড়ি দেয়। প্রথমত ওইসব বাস মহাসড়কে চলারই উপেযাগী নয়, উপরন্তু তারা মহাসড়কে উঠে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়।
দ্রুত গন্তব্যস্থলে গিয়ে অতিরিক্ত ট্রিপ দেওয়ার আশায় চালকরা সারা রাত গাড়ি চালিয়ে সকালে আবারও দূরযাত্রায় রওনা হন। কোনও কোনও চালককে হয়তো একটানা ৪৮ ঘণ্টাই সড়ক-মহাসড়কে থাকতে হয়। এর মধ্য দিয়ে তার শারীরিক ও মানসিক যে চাপ তৈরি হয় এবং তার ফলে যে দুর্ঘটনায় অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি হয়, তার দায় কেবল ওই চালকের নাকি পুরো সিস্টেমের?
ঈদের সময় একসঙ্গে প্রায় ১ কোটি মানুষকে তিন-চার দিনের ব্যবধানে সারা দেশে পৌঁছে দিতে রাষ্ট্র কি এমন কোনও পদ্ধতি আবিষ্কার করতে পেরেছে, যেখানে স্বাভাবিক সময়ের মতোই তারা আরামে, স্বাচ্ছন্দ্যে ও নিরাপদে ঢাকা ছাড়বে এবং উৎসব শেষে একইভাবে নিরাপদে ঢাকায় পৌঁছাবে?
যে দেশ বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে পদ্মা সেতুর মতো অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারে; অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা নিয়েও যে দেশে এক্সপ্রেসওয়ে এবং মেট্রোলের মতো গণপরিবহন চালু করা গেছে, সেই দেশের মানুষ লঞ্চে উঠতে গিয়ে দুটি লঞ্চের মাঝখানে পিষ্ট হয়ে নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করবে; সেই দেশে রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় বাস দুমড়েমুচড়ে যাবে এবং অনেক মানুষের প্রাণ যাবে– এটি কোনোভাবে কাঙ্ক্ষিত নয়।
ঈদযাত্রার সময় এমনিতেই যেখানে নৌপথে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে সদরঘাট ঝঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, সেখানে ট্রলারে এসে চলন্ত লঞ্চে ওঠার যারা সাহস করেন, তাদের সচেতনতা আর দূরদর্শিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন। সরকার এই সময়ে কেন এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ প্রতিহত করতে সার্বক্ষণিকভাবে মোবাইল টিম সক্রিয় রাখবে না?
আমাদের দেশের রেল ক্রসিংগুলো যেহেতু অরক্ষিত বা সুরক্ষিত নয়, সুতরাং সেই ক্রসিংয়ে এসে চলন্ত বাসগুলোকে থামতে হয় বা গতি ধীর করতে হয়, এটি খুবই সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের প্রশ্ন। অর্থাৎ ক্রসিংয়ে এসে বাস থামবে এবং রেললাইনের দুই দিকে চালক ও হেলপার ভালো করে খেয়াল করে দেখবেন যে ট্রেন আসছে কি না, তারপর তিনি ক্রসিংটা পার হবেন। এটুকু সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান ছাড়াই লোকজন বাসের চালক হয়ে যাচ্ছেন? রেল ক্রসিং পার হওয়ার সময় যানবাহনগুলোকে কী ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, এটুকু যেকোনও সাধারণ মানুষেরও জানার কথা। কিন্তু বাসের চালকরা এটা কেন জানেন না বা মানেন না? রাষ্ট্র এর দায় এড়াতে পারে?
ঈদযাত্রায় প্রাণহানির বাইরেও বাস, ট্রেন ও লঞ্চের টিকিট পাওয়া; কালোবাজারে অতিরিক্ত দাম দিয়ে টিকিট কেনা; অতিরিক্ত দাম দিয়েও টিকিট না পাওয়া; রাজধানীর ভেতরে ভয়াবহ জ্যামের কারণে ৪ ঘণ্টার পথ ১০ ঘণ্টায় যাওয়ার মতো ঘটনাগুলোও ঈদের মতো উৎসবকে আতঙ্কে পরিণত করে। মানুষ পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগির জন্য বাড়ি যেতে চায়, কিন্তু তার বাড়িতে যাওয়া এবং ফিরে আসার প্রতিটি পদক্ষেপই হয়রানিমূলক, অস্বস্তির, অনিরাপদ।
সড়ক-মহাসড়ক, রেল ও নৌপথের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার দায়িত্বে যারা থাকেন, তাদের দক্ষতা ও আন্তরিকতা নিয়ে যেসব প্রশ্ন জনমনে আছে, সেগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বরং সব অভিযোগ, সংশয় ও প্রশ্ন বিবেচনায় রেখেই মানুষের ঈদযাত্রা কীভাবে নিরাপদ, স্বচ্ছন্দ্য, হয়রানিমুক্ত এবং আনন্দের করে তোলা যায়, সে বিষয়ে একটা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। আজকে শুরু করলেও যাতে পাঁচ বছর পরে অন্তত মানুষ তার সুফল পায়। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় ঘটনার তাৎক্ষণিকতায়। অ্যাডহক ভিত্তিতে। ফলে যেকোনও ঘটনার পরে তাৎক্ষণিক কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও তাতে দীর্ঘমেয়াদে কোনও সুফল মেলে না। ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে এবং সেটি হতে হবে বাস্তবসম্মত। ইউরোপ-আমেরিকার বাস্তবতা মাথায় রেখে নয়। বরং বাংলাদেশের বাস্তবতা, ছোট আয়তনের দেশে প্রায় ২০ কোটি মানুষের বসবাস এবং দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা মাথায় রেখে টেকসই পরিকল্পনা নিতে হবে। এখানে কোনও বিদেশি কনসালট্যান্টের প্রয়োজন নেই। সাধারণ মানুষের মতামত নিয়েই অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক।