বাংলা নববর্ষ বরণে প্রস্তুত ঢাবির চারুকলা

চৈত্রের বিদায়ী হাওয়ায় বইছে নতুন বছরের আগমনী সুর। পুরোনো বছরের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে নতুন আশা নিয়ে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ বরণে প্রস্তুত দেশ। আর এই প্রস্তুতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদ, যেখানে দিনরাত পরিশ্রম করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

প্রতিবছরের মতো এবারও পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। আর শোভাযাত্রার প্রস্তুতিতে চারুকলা অনুষদ এখন যেন সৃজনশীলতার এক উচ্ছ্বাসময় কর্মশালায় পরিণত হয়েছে। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি হচ্ছে বিশাল কাঠামো, আঁকা হচ্ছে নকশা, রঙে রঙে দেওয়া হচ্ছে শেষ স্পর্শ।

এবারের শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ’। গত ৩১ মার্চ ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রতিপাদ্য, প্রতীক ও কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হয়। আয়োজকদের মতে, এই প্রতিপাদ্য সমাজে ঐক্য, সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুনরুজ্জীবনের বার্তা বহন করে।

ঢাবির চারুকলায় পহেলা বৈশাখের প্রস্তুতি (ছবি: আহাদুল করিম খান)

এদিকে, গতবছর ঐতিহ্যবাহী “মঙ্গল শোভাযাত্রা” নাম পরিবর্তন করে “আনন্দ শোভাযাত্রা” করা হলেও এ বছর নাম এখনও চূড়ান্ত হয়নি। বাংলা নববর্ষ উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ড. আজহারুল ইসলাম শেখ জানান, এ বিষয়ে এখনো কোনও আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে বৈঠকের পর নাম চূড়ান্ত করা হবে।

এবারের শোভাযাত্রায় পাঁচটি প্রধান মোটিফ থাকবে— লাল ঝুঁটির মোরগ, দোতারা, ঘোড়া, পাখি ও শান্তির প্রতীক পায়রা। প্রতিটি প্রতীকের রয়েছে আলাদা তাৎপর্য। মোরগ নতুন সূচনার প্রতীক, পায়রা শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা দেয়, দোতারা বাউল সংস্কৃতির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে। আর ঘোড়া ও পাখি জীবনের গতি, স্বাধীনতা ও ছন্দকে তুলে ধরে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, চারুকলা প্রাঙ্গণে এখন বিরামহীন কর্মযজ্ঞ চলছে। শিক্ষার্থীরা বাঁশ-কাঠ কাটছেন, নকশা তৈরি করছেন, মুখোশ ও নানা শিল্পকর্ম বানাচ্ছেন। এসব শিল্পকর্ম বিক্রি করেও তহবিল সংগ্রহ করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে তারা দিনরাত পরিশ্রম করছেন।

ঢাবির চারুকলায় পহেলা বৈশাখের প্রস্তুতি (ছবি: আহাদুল করিম খান)

এসবা কাজে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী সিমরান নওয়াজ বলেন, “পহেলা বৈশাখ আমাদের জন্য শুধু উৎসব নয়, এটি আমাদের পরিচয় ও সংস্কৃতির অংশ। প্রতি বছরই আমরা পরিশ্রম করি, তবে এবার অনুভূতিটা আলাদা। আমরা এই আয়োজনের মাধ্যমে ঐক্য, সম্প্রীতি ও গণতন্ত্রের শক্ত বার্তা দিতে চাই।”

এবারের আয়োজনের মূল গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধে। সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আয়োজকরা।

ঢাবির চারুকলায় পহেলা বৈশাখের প্রস্তুতি (ছবি: আহাদুল করিম খান)

উল্লেখ্য, পহেলা বৈশাখের এই শোভাযাত্রা এখন কেবল উৎসব নয়, এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক। ইউনেসকো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায় আন্তর্জাতিক পরিসরেও এর গুরুত্ব বেড়েছে।

নববর্ষকে ঘিরে দেশজুড়ে আয়োজন করা হবে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। পরিবেশিত হবে পান্তা-ইলিশ ও পিঠাসহ ঐতিহ্যবাহী খাবার। জারি-সারি, ভাটিয়ালি ও বাউল গানের সুরে মুখর থাকবে গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই ছড়িয়ে পড়বে উৎসবের আনন্দ।