কিশোর গ্যাং লিডার ‘এলেক্স ইমন’ খুনের নেপথ্যে

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে গত রবিবার (১২ এপ্রিল) দিনের বেলায় প্রকাশ্যে ইমন হোসেন ওরফে ‘এলেক্স ইমন’কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ইমন কিশোর গ্যাং ‘এলেক্স গ্রুপ’-এর প্রধান ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেই সূত্রে হত্যার নেপথ্যের ঘটনা উদঘাটন করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

পুলিশ প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে, ছিনতাই হওয়া স্মার্টফোন নিয়ে অন্য একটি গ্রুপের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ছিল ইমনের। খুনের আগে রবিবার সকালে দুই দফায় তাদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ঘটে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন ইউনিট হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেফতারে কাজ করছে। এ ঘটনায় ইমনের মা ফেরদৌসী বেগম বাদী হয়ে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেছেন। মামলায় ২১ জনকে আসামি করা হয়েছে।

সোমবার (১৪ এপ্রিল) সন্ধ্যা পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডে জড়িত চারজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে ঘটনরা দিন রবিবার ঘটনাস্থল থেকে মো. সাইফ (২৩), তুহিন (২০) ও মো. রাব্বী কাজী (২৫) আটক করা হয়। মামলা হওয়ার পর তাদের গ্রেফতার দেখানো হয়। আর সোমবার বিকালে মো. সুমন (২৫) নামে আরেক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে আটক তিনজনের কাছ থেকে তিনটি চাপাতি, একটি কাটার, স্টিলের একটি পাত জব্দ করা হয়েছে। গ্রেফতার চারজনই আরমান-শাহরুখ গ্রুপের সদস্য।

সংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, খুনের শিকার ইমন হোসেন ওরফে এলেক্স ইমন দীর্ঘদিন ধরে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের ১ নম্বর গেট-সংলগ্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ করতো। ওই এলাকার ভ্রাম্যমাণ দোকান, অটোরিকশার গ্যারেজ, নার্সারি থেকে চাঁদা তুলতো। পাশাপাশি মাদক ব্যবসা, চুরি ও ছিনতাইয়ের সঙ্গেও জড়িত ছিল।

অপরদিকে, রায়েরবাজার ২ নম্বর গলি থেকে কাঁচাবাজার পর্যন্ত এলাকায় নিয়ন্ত্রণ করে আসছে আরমান-শাহরুখ নামের আরেকটি কিশোর গ্রুপের সদস্যরা। দুই গ্রুপের সদস্যরাই আবার মোহাম্মদপুর এলাকার শীর্ষ দুই সন্ত্রাসীর সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। পাশাপাশি এলাকা হওয়ায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আগে থেকেই এ দুই গ্রুপের মধ্যে বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জেরেই এই খুনের ঘটনা ঘটে।

ডিএমপির গোয়েন্দা সূত্র বলছে, রবিবার সকালে কামরাঙ্গীরচর এলাকায় ইমন ও আরমান-শাহরুখ গ্রুপের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, মারামারির ঘটনা ঘটে। ছিনতাই হওয়া একটি মুঠোফোনের ভাগাভাগি নিয়ে এ মারামারি হয়। ধাওয়া খেয়ে ইমনসহ তার লোকজন রায়েরবাজার ২ নম্বর গলি এলাকায় এলে তাদের মধ্যে আরেক দফা কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বিকাল চারটার দিকে আরমান ও শাহরুখ গ্রুপের সদস্যরা ইমনদের ধাওয়া দিলে তারা রায়েরবাজার ঢালের ১ নম্বর গলির দিকে পালানোর চেষ্টা করে। সেখানেই ইমনকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়।

পরে আহত ইমনকে উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পরপরই সিসিটিভি ক্যামেরার একটি ফুটেজ সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।

ফুটেজে দেখা গেছে, চাপাতি হাতে ইমনকে ধাওয়া করছে প্রতিপক্ষ গ্রুপের ১০ থেকে ১৫ জন। একপর্যায়ে একটি বাসার সামনে রাস্তার ওপরে পড়ে যায় ইমন। এরপর চারদিক ঘিরে ধরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে তাকে কোপানো হয়। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ইমনের বাঁ পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর ইমনকে রাস্তায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা। এ সময় তিনজনকে আটক করা হয়।

পুলিশ বলছে, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে এ হত্যার সঙ্গে জড়িত ১০ থেকে ১২ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

পুলিশ বলছে, দীর্ঘদিন ধরে রায়েরবাজারের বুদ্ধিজীবী কবরস্থান সংলগ্ন এলাকায় অপরাধ কার্যক্রম চালালেও ইমন এ এলাকায় থাকতো না। অপরাধ করে সে ওই এলাকার বাইরে চলে যেতো। রবিবার সকালে সাভার থেকে রায়েরবাজারে আসে ইমন। এলাকায় আধিপত্য জানান দিতেই আরমান ও শাহরুখ গ্রুপের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ায় সে। জানা গেছে, প্রতিপক্ষ গ্রুপের নেতা আরমান ও শাহরুখও রায়েরবাজারের বাইরে থাকে।

পুলিশ বলছে, নিহত ইমন হোসেনের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ থানায় হত্যা, মাদক, চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ ১৮টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর থানায় তার বিরুদ্ধে দুটি হত্যা মামলা রয়েছে। ৫ আগস্টের পর একটি মামলায় সে গ্রেফতারও হয়েছিল। কিছুদিন কারাগারে থাকার পর জামিনে ছাড়া পেয়েছিল। অপরদিকে আরমান ও শাহরুখের নামেও এসব থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।

ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের ডিসি ইবনে মিজান বলেন, ‘‘ইমন হোসেন মোহাম্মদপুরের বাইরে থাকতো। মাঝেমধ্যে এলাকায় আসতো এবং অপরাধ করে গা ঢাকা দিতো। পুলিশ অনেক দিন ধরেই তাকে খুঁজছিল। রবিবার সকালে এলাকায় আসলে মোহাম্মদপুরের বাইরে এক দফা মারামারিতে জড়ায়। ওই ঘটনার জেরে একই দিন বিকালে প্রতিপক্ষ তাকে হত্যা করে।’’