দ্রুতগতির হলেও দেশে স্টারলিংকের বিস্তারে বড় বাধা খরচ

বাংলাদেশে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট যুগের সূচনা বিশ্বমানের পারফরম্যান্স দিয়ে হলেও উচ্চ খরচ ও সীমিত চাহিদার কারণে এর বিস্তার ধীরগতির। বৈশ্বিক ইন্টারনেট পারফরম্যান্স বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ওকলা’র সর্বশেষ প্রতিবেদনে এমনটাই উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় দ্রুত অগ্রগতি হলেও বাংলাদেশে স্টারলিংকের বিস্তার মূলত সাশ্রয়ক্ষমতা ও নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক চাহিদার ওপর নির্ধারিত হচ্ছে।

ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্টারলিংক বাংলাদেশে অপারেটিং লাইসেন্স পায় ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল, একই বছরের ২০ মে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। চালুর মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই রিয়েল-টাইম ইন্টারনেট ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ সূচক ‘ল্যাটেন্সি’তে বাংলাদেশ এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যতম সেরা অবস্থানে উঠে আসে।

ওকলা’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে দেশে মধ্যম ডাউনলোড গতি ছিল ৮৮ দশমিক ৯৫ এমবিপিএস এবং ল্যাটেন্সি ৩৫ মিলিসেকেন্ড। এই হার নিউজিল্যান্ডের সমান এবং অস্ট্রেলিয়ার (৩৬ মিলিসেকেন্ড) চেয়েও সামান্য ভালো—যেখানে দুই দেশেই ২০২১ সাল থেকে স্টারলিংক সেবা চালু রয়েছে।

ল্যাটেন্সি হলো ডিভাইস থেকে সার্ভারে ডেটা যাওয়া-আসার সময়। এটি যত কম হয়, ভিডিও কল, গেমিং ও ক্লাউডভিত্তিক সেবা তত মসৃণভাবে ব্যবহার করা যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী শুরুতেই অবকাঠামো গড়ে তোলার কারণে বাংলাদেশ এই সাফল্য পেয়েছে। ওকলা বলছে, স্থানীয় ‘পয়েন্ট অব প্রেসেন্স’ স্থাপনের ফলে সেবার মান উন্নত হয়েছে। এ ধরনের অবকাঠামো স্যাটেলাইটকে স্থলভিত্তিক ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করে।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) শর্ত অনুযায়ী, স্টারলিংক গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাইটেক সিটি, রাজশাহী ও যশোরে এই অবকাঠামো স্থাপন করেছে।

যেসব দেশে এ ধরনের অবকাঠামো নেই, সেখানে ল্যাটেন্সি তুলনামূলক বেশি। যেমন, শ্রীলঙ্কায় ডাউনলোড গতি বেশি হলেও ল্যাটেন্সি ১০৩ মিলিসেকেন্ড। মালদ্বীপে ১১৮ মিলিসেকেন্ড এবং পূর্ব তিমুরে ১৫৭ মিলিসেকেন্ড ল্যাটেন্সি রেকর্ড হয়েছে।

তবে প্রযুক্তিগত সাফল্য সত্ত্বেও বাংলাদেশে স্টারলিংকের বিস্তারের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চ খরচ। বর্তমানে দেশে স্টারলিংকের দুটি প্যাকেজ রয়েছে—রেসিডেনসিয়াল (মাসে ৬ হাজার টাকা) এবং রেসিডেনসিয়াল লাইট (মাসে ৪ হাজার ২০০ টাকা)। এর বাইরে সংযোগ স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কিনতেও অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়।

এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে সেবার মূল্য কাছাকাছি হলেও বাংলাদেশের আয় কাঠামোর তুলনায় এটি অনেক বেশি ব্যয়বহুল। দেশের মাথাপিছু জিডিপি ৪ হাজার ডলারের নিচে থাকায় প্রায় ৫০ ডলারের মাসিক খরচ সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য বড় চাপ তৈরি করছে।

বিটিআরসি’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে স্টারলিংকের গ্রাহক সংখ্যা ৩ হাজার ৪৬৯। দেশের মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর তুলনায় এই সংখ্যা খুবই কম।

শহরাঞ্চলে কম খরচে ফাইবার ব্রডব্যান্ড সহজলভ্য থাকায় সাধারণ বাজারে স্টারলিংকের প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে তিনটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্টারলিংকের সেবা দেওয়া হচ্ছে— রবি আক্সিয়াটা, ফ্যাসিলিটি আইডিসি এবং বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি।

বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রত্যাশার তুলনায় চাহিদা কম। প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, বিভিন্ন অংশীদারের মাধ্যমে প্রায় ৪০০ সংযোগ বিক্রি হয়েছে। সাধারণ ব্যবহারকারীর নাগালের বাইরে থাকায় আগ্রহও প্রত্যাশার তুলনায় কম।

তবে ভবিষ্যতে নতুন অংশীদার যুক্ত হলে সেবার বিস্তার বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

সাধারণ গ্রাহক খাতে গতি ধীর থাকায় এখন নির্দিষ্ট খাতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে পার্বত্য ও দুর্গম চরাঞ্চল, সমুদ্র ও মৎস্য খাত, দূরপাল্লার পরিবহন এবং দুর্গম এলাকার শিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ।

বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি ইতোমধ্যে পার্বত্য তিন জেলায় ১২টি স্কুলে সংযোগ দিয়েছে। আরও ১৪৯টির বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

ব্যবসায়িক খাতেও স্টারলিংক মূল সংযোগের পরিবর্তে ব্যাকআপ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফাইবার প্রধান এবং স্যাটেলাইট বিকল্প সংযোগ হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে পারে।

ওকলার প্রতিবেদনে বাংলাদেশের নীতিগত পদক্ষেপকেও ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট বন্ধ থাকার অভিজ্ঞতার পর বিকল্প সংযোগের চাহিদা বাড়ে। এর প্রেক্ষিতে বিটিআরসি দ্রুত নন-জিওস্টেশনারি অরবিট লাইসেন্সিং কাঠামো অনুমোদন দেয়।

ভবিষ্যতে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবেশী দেশে ব্যান্ডউইথ রফতানির প্রস্তাবও দিয়েছে স্টারলিংক, যা বর্তমানে পর্যালোচনায় রয়েছে। এটি অনুমোদন পেলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক ডেটা ট্রানজিট হাব হিসেবে গড়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ডেটা গভর্ন্যান্স, নেটওয়ার্ক নজরদারি ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

এদিকে, বাংলাদেশের বাজারে নতুন প্রতিযোগী হিসেবে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে অ্যামাজন এবং কিয়ানফান কনস্টেলেশন। বিশ্লেষকদের মতে, এতে ভবিষ্যতে সেবার মূল্য ও প্রাপ্যতায় পরিবর্তন আসতে পারে।

সব মিলিয়ে, স্টারলিংক বাংলাদেশের জন্য একদিকে সম্ভাবনা তৈরি করলেও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে খরচ। বিশ্লেষকদের মতে, মূল্য না কমলে এটি সাধারণ ব্যবহারকারীর পরিবর্তে সীমিত খাতেই ব্যবহৃত হবে।