বাড়ছে নিঃসঙ্গ মৃত্যু: কোথায় হারাচ্ছে পারিবারিক দায়বোধ? 

রাজধানীর পল্লবী ও মুগদা এলাকায় মাত্র চার দিনের ব্যবধানে তিনজন মানুষের পচনধরা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে দুজন নারী এবং একজন পুরুষ। কেউ বিছানায়, কেউ ঘরের মেঝেতে, আবার কেউ ঝুলন্ত অবস্থায় পড়ে ছিলেন দিনের পর দিন। মৃত্যুর পরও তাদের খোঁজ নিতে কেউ আসেননি।

ঘটনাগুলো শুধু কয়েকটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা নয় বরং নগরজীবনের ক্রমবর্ধমান একাকিত্ব, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের একটি নির্মম প্রতিচ্ছবি বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানী ও মানবাধিকারকর্মীরা।

তাদের মতে, আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, আত্মকেন্দ্রিকতা এবং পারিবারিক বন্ধনের দুর্বল হয়ে পড়া মানুষের জীবনে এমন এক নিঃসঙ্গতার জন্ম দিচ্ছে, যেখানে মৃত্যুর পরও কেউ খোঁজ নেয় না।

একা জীবনের নিঃশব্দ সমাপ্তি

গত ২ জুন রাতে রাজধানীর উত্তর মুগদার আহমদবাগ এলাকার একটি বাসা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক তানভীর হোসেইন শুভর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

পুলিশ জানায়, বাসার দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। খবর পেয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে ঝুলন্ত অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ততক্ষণে মরদেহে পচন ধরেছিল।

তানভীর হোসেইনের পারিবারিক বাসা ছিল রাজধানীর সেগুনবাগিচায়। তবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে মুগদার ওই ভাড়া বাসায় একাই বসবাস করতেন। প্রায় ১৪ বছর আগে স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর থেকে তিনি নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছিলেন। পুলিশের ধারণা, দীর্ঘদিনের মানসিক অবসাদ ও একাকিত্ব তাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

এর আগে ৩১ মে রাতে রাজধানীর পল্লবীর একটি বহুতল ভবনের চতুর্থ তলার একটি কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয় নূরজাহান বেগমের গলিত মরদেহ।

সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে এই ঘটনাটি। কারণ তার চার সন্তানই সমাজে প্রতিষ্ঠিত। বড় ছেলে একজন যুগ্ম সচিব, মেজ ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক, ছোট ছেলে কানাডাপ্রবাসী এবং মেয়ে একটি স্কুলের শিক্ষক। কিন্তু সেই মায়ের মৃত্যুর পর কয়েকদিন কেটে গেলেও কেউ তার খোঁজ নেননি।

পুলিশ জানায়, তিনি মেয়ের বাসার একটি কক্ষে একাই থাকতেন। মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি সামনে আসে।

অন্যদিকে ৩ জুন রাতে পল্লবীর আরেকটি বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় সেলিনা আফরোজ নামের এক নারীর পচনধরা মরদেহ।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তার স্বামী ও তিন সন্তান কানাডায় বসবাস করেন। প্রায় ১২ বছর আগে তিনি দেশে ফিরে এসে পল্লবীর ওই বাসায় একা বসবাস শুরু করেন। এরপর থেকে দীর্ঘদিন তিনি একাই জীবনযাপন করছিলেন।

‘মূল্যবোধের অবক্ষয় শুধু প্রান্তিক মানুষের মধ্যে নয়’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, এসব ঘটনা সমাজের গভীর সংকটের ইঙ্গিত বহন করে।

তার ভাষায়, “সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো— যে প্রবীণ নারী মারা গেলেন, তার সন্তানরা শুধু আর্থিকভাবে নয়, পেশাগতভাবেও প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু মৃত্যুর পর কয়েকদিন কেটে গেলেও কেউ তার খোঁজ নিলো না। এটি শুধু একটি পরিবারের ব্যর্থতা নয়, বরং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের একটি ভয়াবহ উদাহরণ।”

তিনি বলেন, “অনেক সময় ধারণা করা হয় মূল্যবোধের সংকট কেবল সমাজের প্রান্তিক বা সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মধ্যে বেশি দেখা যায়। বাস্তবতা হলো, সমাজের সব স্তরেই এই অবক্ষয় ছড়িয়ে পড়ছে।”

তার মতে, পরিবার হচ্ছে মানুষের জীবনের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়। একজন মানুষ পরিবারে জন্ম নেয়, সেখানে বেড়ে ওঠে এবং জীবনের শেষ সময়টুকুতেও পরিবারের সান্নিধ্য প্রত্যাশা করে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে।

ড. তৌহিদুল হক বলেন, “বাবা-মায়ের ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে ২০১৩ সালে আইন প্রণয়ন করতে হয়েছে। অথচ এটি এমন একটি দায়িত্ব, যা স্বাভাবিকভাবেই সন্তানের নৈতিক কর্তব্য হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা।”

তিনি বলেন, “কর্মসংস্থানের বিস্তার, ভৌগোলিক দূরত্ব এবং মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনের কারণে পরিবারভিত্তিক সহমর্মিতা কমছে। ধীরে ধীরে সমাজ একটি ‘এজেন্সি-নির্ভর’ ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেখানে শিশুদের জন্য ডে-কেয়ার এবং প্রবীণদের জন্য বৃদ্ধাশ্রম ক্রমেই বাস্তব প্রয়োজন হয়ে উঠছে।”

তার মতে, পরিবারভিত্তিক নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলা না গেলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও গভীর হবে।

‘মিডিয়ায় যা আসে, বাস্তবতা তার চেয়েও ভয়াবহ’

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলছেন, সংবাদমাধ্যমে যেসব ঘটনা প্রকাশ পায়, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ এমন নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করছেন।

তার মতে, গণমাধ্যমে হয়তো ১০ থেকে ২০ শতাংশ ঘটনা সামনে আসে। বাকিগুলো নীরবেই থেকে যায়।

তিনি বলেন, “মানুষের কর্মব্যস্ততা বেড়েছে, কিন্তু সেই সঙ্গে পারিবারিক বন্ধনও দুর্বল হয়েছে। একসময় যৌথ পরিবার ছিল সমাজের সাধারণ চিত্র। এখন তার জায়গা নিয়েছে একক পরিবার। ফলে আত্মীয়তার সম্পর্ক এবং পারস্পরিক খোঁজখবর নেওয়ার সংস্কৃতি আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।”

ইজাজুল ইসলামের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনও এই বিচ্ছিন্নতাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। মানুষ পরিবারকে সময় দেওয়ার বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বেশি সময় ব্যয় করছে। একই সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থায় মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চার ঘাটতিও রয়েছে।

তিনি মনে করেন, সামাজিক ও পারিবারিক অবক্ষয় রোধে শুধু পরিবার নয়, রাষ্ট্র ও স্থানীয় প্রশাসনকেও আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে

‘ক্যারিয়ার ও সাফল্যের দৌড়ে হারিয়ে যাচ্ছে দায়বোধ’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবালের মতে, বর্তমান সমাজে অনেক মানুষ ক্যারিয়ার, পদোন্নতি ও ব্যক্তিগত সাফল্যের পেছনে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন যে পারিবারিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে।

তিনি বলেন, “একজন মানুষ আজ যেখানে পৌঁছেছেন, সেখানে পৌঁছানোর পেছনে তার মা-বাবার অবদান সবচেয়ে বেশি। কিন্তু সেই উপলব্ধি অনেক ক্ষেত্রেই হারিয়ে যাচ্ছে। করপোরেট সংস্কৃতি, প্রতিযোগিতামূলক জীবনযাপন এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতা মানুষকে ক্রমশ আত্মকেন্দ্রিক করে তুলছে।”

তার মতে, সমাজে এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে ২০১৩ সালের পিতামাতার ভরণপোষণ আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

যে প্রশ্ন রেখে গেলো তিনটি মৃত্যু

মুগদার তানভীর হোসেইন শুভ, পল্লবীর নূরজাহান বেগম এবং সেলিনা আফরোজ— তিনজনের জীবনযাত্রা ছিল ভিন্ন, বয়স ছিল ভিন্ন, পারিবারিক প্রেক্ষাপটও ছিল আলাদা। কিন্তু তাদের মৃত্যুর মধ্যে একটি ভয়াবহ মিল রয়েছে— তারা ছিলেন একা। মৃত্যুর পরও দিনের পর দিন কেউ তাদের খোঁজ নেয়নি।

নগরজীবনের ব্যস্ততা, ভৌগোলিক দূরত্ব কিংবা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার নানা ব্যাখ্যা থাকতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই ঘটনাগুলো একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনে দাঁড় করায়— আমরা কি ক্রমশ এমন এক সমাজে পরিণত হচ্ছি, যেখানে মানুষ বেঁচে থাকলেও একা, আর মৃত্যুর পরও একা?

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এটি কেবল তিনটি মৃত্যুর গল্প নয়— পারিবারিক বন্ধন, মানবিক দায়বোধ এবং সামাজিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে।