দিল্লিতে বিএসএফ-বিজিবি শীর্ষ বৈঠক ‘ব্যর্থ’ হলো যে কারণে

বেশ কিছুদিন ধরে ভারত থেকে বাংলাদেশে ‘পুশইন’ বা জোর করে মানুষ ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। এই পরিস্থিতিতে দিল্লিতে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) মহাপরিচালক পর্যায়ের চার দিনব্যাপী বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও আলোচিত এই ইস্যুতে কোনও সমঝোতা হয়নি। বরং বৈঠকে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য দেখা গেছে। এমনকি বৈঠক শেষে প্রচলিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনও করা যায়নি।

যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করতেও অপেক্ষা করতে হয়েছে পরদিন সকাল পর্যন্ত। আর সেই বিবৃতিতেও ‘পুশইন’ বা ‘পুশব্যাক’ প্রসঙ্গের কোনও উল্লেখ রাখা হয়নি

সূত্র বলছে, বৈঠকে এ ইস্যুতে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ ছিল স্পষ্ট। বিএসএফের দাবি, যাদের সীমান্তে পাওয়া যাচ্ছে তাদের অনেকেই নিজেদের বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন এবং তারা অবৈধভাবে ভারতে বসবাস করছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে ধরপাকড় শুরু হওয়ার পর তারা ফিরে যেতে চাইছেন। ফলে বাংলাদেশের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে ঢাকার আপত্তি কেন—সে প্রশ্ন তোলে ভারতীয় বাহিনী।

বিএসএফের যুক্তি ছিল, বাংলাদেশ নাগরিকদের গ্রহণে সহযোগিতা না করায় তাদের ‘পুশব্যাক’ করতে বাধ্য হতে হচ্ছে। অর্থাৎ এ প্রক্রিয়ার দায় তারা বাংলাদেশের ওপরই চাপানোর চেষ্টা করে।

এর জবাবে বিজিবি কঠোর অবস্থান নেয়। তাদের বক্তব্য, কোনও ব্যক্তিকে অবৈধ বিদেশি হিসেবে শনাক্ত করা হলে তাকে ফেরত পাঠানোর জন্য নির্ধারিত ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’ (এসওপি) রয়েছে। সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে গোপনে ও জোরপূর্বক সীমান্ত দিয়ে মানুষ ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আন্তর্জাতিক রীতি ও দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পরিপন্থি।বিজিবির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, যাদের সীমান্তে পাঠানো হচ্ছে তারা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক—এমন নিশ্চয়তা ভারত দিচ্ছে না। তাদের পরিচয় বা নাগরিকত্ব সংক্রান্ত তথ্যও ভাগাভাগি করা হচ্ছে না। ফলে যাচাই-বাছাই ছাড়া কাউকে গ্রহণ করা সম্ভব নয়।

বৈঠকে অতীতে ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে ‘পুশইন’ করার ঘটনাও তুলে ধরে বিজিবি। বিশেষ করে সুনালি খাতুন ও সাকিনা বেগমের মতো কয়েকজন ভারতীয় নাগরিককে ভুলভাবে বাংলাদেশে পাঠানোর ঘটনা ভারতকে পরে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছিল বলেও উল্লেখ করা হয়।

বিজিবি যে এসওপির কথা বলেছে, সেটি বহুদিন ধরে অনুসৃত একটি প্রক্রিয়া। এর আওতায় ভারতে কোনও ব্যক্তি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে আটক হলে এবং তিনি নিজেকে বাংলাদেশের নাগরিক দাবি করলে তার নাম-ঠিকানা ও অন্যান্য তথ্য বাংলাদেশের কাছে পাঠানো হয়। পরে বাংলাদেশ যাচাই করে নাগরিকত্ব নিশ্চিত করলে নির্ধারিত সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে তাকে হস্তান্তর করা হয়।

তবে বিএসএফের অভিযোগ, বাংলাদেশ এ ধরনের তথ্য যাচাই ও জবাব দিতে দীর্ঘ সময় নেয়। কখনও কখনও কোনও জবাবই দেয় না। সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়ালও দাবি করেছেন, প্রায় দুই হাজার ব্যক্তির তথ্য বাংলাদেশের কাছে পাঠানো হলেও এখনও সাড়া পাওয়া যায়নি।

বিএসএফের ভাষ্য, মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর কাউকে জেল বা হোল্ডিং সেন্টারে রেখে দেওয়া সম্ভব নয়

এসব পাল্টাপাল্টি বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, দিল্লির বৈঠকে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে কোনও সমঝোতা তৈরি হয়নি। এর আগে ২০২৫ সালে দুই বাহিনীর বৈঠকে সীমান্তে কাঁটাতার নির্মাণ ইস্যুতেও অচলাবস্থা ছিল। এবারও ‘পুশইন’ ইস্যুতে একই চিত্র দেখা গেলো।

তবে দিল্লিভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুকল্যাণ গোস্বামীর মতে, এ সংকটের সমাধান সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বৈঠক থেকে আশা করাই ভুল।

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী আসলে নিজ নিজ সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে। ফলে রাজনৈতিক পর্যায়ে সমাধান না এলে সীমান্তে এই অচলাবস্থা কাটবে না।