রক্ত থেকেই তৈরি হবে ডিম্বাণু? গবেষণায় নতুন ইঙ্গিত

এক ফোঁটা রক্ত। সেখান থেকেই যদি একদিন তৈরি করা যায় মানবদেহের ডিম্বাণু?

কয়েক বছর আগেও এমন ধারণা অনেকটা বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো শোনাতো। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, সেই অসম্ভবকে সম্ভব করার পথে ধীরে ধীরে এগোচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। যদিও প্রযুক্তিটি এখনও পরীক্ষাগারেই সীমাবদ্ধ, তবু গবেষকদের আশা, একদিন এটি বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণাগারে এমন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ চলছে, যেখানে রক্ত বা ত্বকের সাধারণ কোষকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় স্টেম সেলে রূপান্তর করে ধাপে ধাপে ডিম্বাণু তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। এটি সফল হলে সন্তান ধারণে সমস্যায় থাকা অনেক মানুষের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।

কীভাবে তৈরি হতে পারে ডিম্বাণু?

মানবদেহের রক্তে থাকা কিছু সাধারণ কোষকে বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে আবার এমন অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া যায়, যেখান থেকে তারা শরীরের বিভিন্ন ধরনের কোষে পরিণত হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করে। এসব কোষকে বলা হয় ইনডিউসড প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেল।

এরপর গবেষকেরা ধাপে ধাপে সেই স্টেম সেলকে এমন কোষে রূপান্তরের চেষ্টা করেন, যেগুলো স্বাভাবিকভাবে ডিম্বাণু তৈরির প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়।

অর্থাৎ, রক্তের কোষ সরাসরি ডিম্বাণুতে পরিণত হয় না। মাঝখানে স্টেম সেলে রূপান্তরসহ একাধিক জৈবিক ধাপ রয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন সেই পুরো প্রক্রিয়াটিকেই গবেষণাগারে সফলভাবে সম্পন্ন করার চেষ্টা করছেন।

কতদূর এগিয়েছে গবেষণা?

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে ইঁদুরের ওপর গবেষণায়। কয়েক বছর আগে গবেষকেরা পরীক্ষাগারে তৈরি ডিম্বাণু ব্যবহার করে সুস্থ ইঁদুরের জন্ম দিতে সক্ষম হন। সেই সাফল্যের পর থেকেই মানুষের ক্ষেত্রে একই প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা আরও জোরদার হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিজ্ঞানীরা মানুষের শরীরের সাধারণ কোষ থেকে ডিম্বাণু তৈরির প্রাথমিক ধাপগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছেন। কয়েকটি গবেষণা দল রক্ত ও ত্বকের কোষকে স্টেম সেলে রূপান্তর করে ডিম্বাণু তৈরির প্রক্রিয়া অনুকরণে সফল হয়েছে।

তবে মানুষের ক্ষেত্রে এখনও পূর্ণাঙ্গ, পরিণত এবং নিরাপদভাবে ব্যবহারযোগ্য ডিম্বাণু তৈরি করা সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ, এই প্রযুক্তি এখনই চিকিৎসায় ব্যবহার করার মতো পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই গবেষণা?

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিটি একদিন সফল হলে বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

যেসব নারী বয়স, ক্যানসারের চিকিৎসা বা অন্য কোনও কারণে ডিম্বাণু হারিয়েছেন, ভবিষ্যতে তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সন্তান ধারণে সমস্যায় থাকা অনেক মানুষের চিকিৎসায়ও এটি নতুন পথ দেখাতে পারে।

এখনও কেন অপেক্ষা?

গবেষকেরা বলছেন, পরীক্ষাগারে ডিম্বাণু-সদৃশ কোষ তৈরি করা আর সেই ডিম্বাণু থেকে নিরাপদভাবে সুস্থ শিশু জন্ম দেওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে এখনও বড় ব্যবধান রয়েছে।

ডিম্বাণুর জিনগত স্থিতিশীলতা, ভ্রূণের স্বাভাবিক বিকাশ, দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং নৈতিক প্রশ্ন—সব কিছু নিয়েই আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। এসব বিষয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রযুক্তিটি চিকিৎসায় ব্যবহার করা হবে না।

ভবিষ্যতের এক সম্ভাবনা

একসময় টেস্টটিউব বেবিও অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। আজ সেটিই বিশ্বের বহু পরিবারের জন্য বাস্তবতা।

রক্তের কোষ থেকে ডিম্বাণু তৈরির গবেষণাও হয়তো এখন সেই পথেরই একেবারে শুরুর ধাপে রয়েছে।

সামনে এখনও বহু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই এবং নৈতিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। তবে গবেষকেরা আশাবাদী, সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে একদিন হয়তো একটি সাধারণ রক্তের নমুনাই সন্তান ধারণে অক্ষম বহু মানুষের জন্য নতুন আশার আলো হয়ে উঠতে পারে।