পানি নামলেই কৃষকের হাতে ধানের চারা দেবে সরকার: কৃষিমন্ত্রী

বন্যাকবলিত এলাকায় আমনের বীজতলা নষ্ট হয়ে যাওয়াকে কৃষি খাতের প্রধান সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। পানি নেমে যাওয়ার পর কৃষকেরা যাতে দ্রুত ধান রোপণ করতে পারেন, সে জন্য বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাগুলোর জমিতে জরুরি ভিত্তিতে বীজতলা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বন্যা পরিস্থিতিতে কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতের ক্ষয়ক্ষতি এবং সরকারের প্রস্তুতি সম্পর্কে সাংবাদিকদের অবহিত করতে গিয়ে কৃষিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, বন্যাকবলিত অধিকাংশ এলাকায় এখনও ব্যাপকভাবে ধান রোপণের মৌসুম শুরু হয়নি। অল্প কিছু জমিতে ধান রোপণ করা হয়েছিল। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বীজতলায়। ধান রোপণের জন্য বপন করা বীজ থেকে বিপুল পরিমাণ চারা গজিয়েছিল। বন্যার পানিতে ডুবে এসব কচি চারা প্রায় সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, সাধারণত ১০ থেকে ১৫ দিন বয়সে বীজতলা থেকে ধানের চারা তুলে জমিতে রোপণ করা হয়। এ সময় চারাগুলো খুবই কচি থাকে। একদিন পানির নিচে থাকলেও সেগুলো নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কয়েক দিনের বন্যায় আক্রান্ত এলাকাগুলোতে ধানের চারার বড় সংকট তৈরি হয়েছে।

১৫ আগস্ট পর্যন্ত রোপণযোগ্য জাতের চারা উৎপাদন

পানি নেমে যাওয়ার পর কৃষকের জমি রোপণের উপযোগী হলেও চারা না পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে উল্লেখ করে মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, আগামী দুই দিনের মধ্যে বন্যাকবলিত অঞ্চলে কৃষি বিভাগের বিভিন্ন সংস্থার জমিতে বীজতলা তৈরির প্রস্তুতি নেওয়া হবে। মঙ্গলবারই সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে জমি প্রস্তুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, আমাদের এমন কিছু ধানের জাত রয়েছে, যা ১৫ আগস্ট পর্যন্ত রোপণ করা যাবে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় এসব জাতের চারা উৎপাদন করা হবে। পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী চারা বিতরণ করা হবে।

যেসব কৃষক ইতোমধ্যে ধান রোপণ করেছিলেন, তাদের জমির ধান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি প্রয়োগ করা সারও পানিতে ভেসে গেছে বা কার্যকারিতা হারিয়েছে বলে জানান কৃষিমন্ত্রী। ফলে নতুন করে চাষ করতে তাদের আবার বীজ, চারা ও সার প্রয়োজন হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা কাজ করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি ইউনিয়নের প্রতিটি ব্লকে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট এলাকার কৃষকের জমির পরিমাণ ও ফসলের বিষয়ে তাঁদের কাছে বিস্তারিত তথ্য থাকে। তাঁদের সুপারিশের ভিত্তিতেই কৃষকদের মধ্যে বীজ, চারা ও অন্যান্য সহায়তা বিতরণ করা হবে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে পৃথক তথ্যকেন্দ্র খোলা হয়েছে উল্লেখ করে কৃষিমন্ত্রী বলেন, মাঠপর্যায় থেকে নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য নেওয়া হচ্ছে। কোথায় কী ধরনের ক্ষতি হয়েছে এবং কখন কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

গোখাদ্য সংকট, খুরা রোগের টিকা দেওয়ার নির্দেশ

বন্যায় গবাদিপশুর খাদ্যেরও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে বলে জানান কৃষিমন্ত্রী। তিনি বলেন, অনেক এলাকায় সংরক্ষিত খড় ভিজে নষ্ট হয়েছে অথবা পানিতে ভেসে গেছে। মাঠের ঘাস ও পশুখাদ্যের অন্যান্য উৎসও পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়েছে। এ কারণে গরু ও ছাগলের জন্য দ্রুত শুকনা গোখাদ্য সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, আক্রান্ত এলাকায় ঘাস ও খড় নেই। দ্রুততম সময়ের মধ্যে খড়, ভুসি ও অন্যান্য তৈরি শুকনা খাবার পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

বন্যা ও বর্ষার পর গবাদিপশুর বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ে উল্লেখ করে কৃষিমন্ত্রী বলেন, বিশেষ করে খুরা রোগের প্রকোপ দেখা দিতে পারে। আগামী এক থেকে দুই দিনের মধ্যে বন্যাকবলিত এলাকার প্রতিটি গরু ও ছাগলকে খুরা রোগের টিকা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবেন।

ভেসে যাওয়া মাছের খামারের তালিকা হচ্ছে

বন্যায় মৎস্য খাতেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানান কৃষিমন্ত্রী। আকস্মিকভাবে পানি বেড়ে যাওয়ায় অনেক মাছচাষি প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাননি। বিভিন্ন এলাকায় পুকুর ও ঘেরের পাড় ডুবে বা ভেঙে যাওয়ায় চাষ করা মাছ পানিতে ভেসে গেছে।

তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মাছচাষিদের নতুন করে তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। কে কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তা মাঠপর্যায় থেকে যাচাই করা হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, খামারি ও মৎস্যজীবীদের সহযোগিতা করতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, সরকারের প্রস্তুতি ও সহায়তার তথ্য ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছালে তারা সাহস পাবেন। কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সংশ্লিষ্ট সব দফতর সমন্বিতভাবে কাজ করছে।