জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে লাইফ সাপোর্ট মেশিনের ‘টুট... টুট...’ শব্দ আজও কানে বাজে বাপ্পির মায়ের।
এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই শব্দ যেন তার স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি। মাঝেমধ্যেই মনে হয়, তিনি আবার দাঁড়িয়ে আছেন আইসিইউর সামনে, যেখানে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিল তার বড় ছেলে—মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী বাপ্পি।
বাপ্পির মা বিথী বলেন, ‘আমার বাপ্পি যখন লাইফ সাপোর্টে ছিল, তখন "টুট... টুট..." করে শব্দ হচ্ছিল। আমি যখনই ওর সামনে গেছি, সেই শব্দ শুনেছি। এক বছর হয়ে গেছে, কিন্তু আজও সেই শব্দ আমার কানে বাজে। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি আবার সেই আইসিইউর সামনে দাঁড়িয়ে আছি। তখন আমার পাগল পাগল লাগে। আমার কলিজার এখন সবকিছুই স্মৃতি।’
কিছুক্ষণ নীরব থেকে তিনি ফিরে যান ২১ জুলাইয়ের সেই সকালে।
সেদিনও অন্য দিনের মতো ভোরে ঘুম থেকে উঠে দুই ছেলে—তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী বাপ্পি ও নার্সারির শিক্ষার্থী বিজয়কে স্কুলের জন্য প্রস্তুত করেন। নাস্তা করিয়ে প্রথমে বাপ্পিকে স্কুলে পৌঁছে দেন। পরে সকাল পৌনে ১১টার দিকে ছোট ছেলে বিজয়কে নিয়ে আবার স্কুলে যান। প্রতিদিনের মতো সেদিনও বাপ্পির জন্য টিফিন নিয়ে গিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন বিজয়কে স্কুলে দিয়ে আমি বাপ্পিকে নিজের হাতে টিফিন খাইয়ে আসতাম। কিন্তু সেদিন ওর ক্লাস তখনও শেষ হয়নি। তাই টিফিনটা এক আয়ার হাতে দিয়ে চলে আসি। জানতাম না, এটাই হবে আমার বাবার জন্য নিয়ে যাওয়া শেষ টিফিন।’
সেই সকালের আরেকটি স্মৃতিও আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
‘সকালে ওকে রুটি, ডিম আর আম দিয়েছিলাম। হরলিক্স বানিয়ে দেওয়ার কথা বলতেই ও বলল, "মা, তুমি না চাপড়ি বানিয়ে দিবা।" আমি সঙ্গে সঙ্গে মুরগির মাংস দিয়ে চাপড়ি বানিয়ে দিলাম। আমার বাবাটা খুব সুন্দর করে খেল। এরপর স্কুলে নিয়ে গেলাম। সেই টিফিন আমার বাবা খেতে পেরেছিল কি না, সেটা শুধু আল্লাহই জানেন।’
ছোট ছেলে বিজয়কে নিয়ে বাসায় ফেরার পরই একটি ফোন আসে।
‘ভাবি, আপনি কোথায়? মাইলস্টোনে বিমান পড়েছে। তাড়াতাড়ি স্কুলে আসেন।’
ফোন পেয়েই ছুটে যান স্কুলে। সেখানে শুরু হয় এক মায়ের মরিয়া খোঁজ। করিডোর, শ্রেণিকক্ষ—সব জায়গায় ছেলেকে খুঁজেছেন। বাপ্পির শ্রেণিকক্ষের সামনেও দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু কোথাও তার দেখা মেলেনি।
তিনি বলেন, ‘আমার সামনে দিয়ে দগ্ধ শিশুদের বের করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। সেই দৃশ্য দেখে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। মানুষজন পানি দিয়ে আমাকে সুস্থ করে। এরপর আবার ছেলেকে খুঁজতে শুরু করি। আমার শুধু একটা বিশ্বাস ছিল—আমি আমার বাবাকে ঠিকই সুস্থ অবস্থায় ফিরে পাব।’
এদিকে বাপ্পির বাবা আশরাফ স্কুলের বাইরে ছেলেকে খুঁজছিলেন। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন হাসপাতালে ফোন করেছেন, পরিচিতদের কাছে খোঁজ নিয়েছেন। কিন্তু কোথাও বাপ্পির সন্ধান মিলছিল না।
অবশেষে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট থেকে ফোন আসে। দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর এক নার্স জানান, একজন ভেতরে যেতে পারবেন। উপস্থিত সবার অনুরোধে আইসিইউতে প্রবেশ করেন বাপ্পির মা।
তিনি বলেন, ‘বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না এটা আমার ছেলে। কিন্তু আমি তো তার মা। আমি তাকে লালন-পালন করেছি, নিজের হাতে খাইয়েছি, গোসল করিয়েছি। আমি জানি আমার সন্তানের শরীরের প্রতিটি অংশ। দেখেই বুঝেছি, এটা আমার বাবাই।’
ছেলেকে দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি তিনি।
‘আমার ছেলে এত সুন্দর ছিল। ওর মুখ, হাত আর শ্বাসনালি পুড়ে গিয়েছিল। মাথাও এমনভাবে পুড়ে গিয়েছিল, মনে হচ্ছিল মগজও পুড়ে গেছে। কিছুদিন আগে আমি ওর চুল ছোট করে দিয়েছিলাম। এখন মনে হয়, যদি চুলগুলো আরেকটু বড় থাকত, হয়তো মাথাটা এতটা পুড়ত না। আমি কি জানতাম আমার বাবার এমন পরিণতি হবে? জানলে কোনো দিন ওর চুল কাটতাম না’, বলেন তিনি।
পরদিন সকাল সাড়ে ৬টার দিকে হাসপাতাল থেকে পরিবারের সদস্যদের ডাকা হয়।
বাপ্পির মা বলেন, ‘আমি বললাম, আমি বাপ্পির মা। তখন তারা বলল, বাপ্পির বাবা কোথায়? আমি চিৎকার করে বললাম, আমি মা থাকতে বাবাকে কেন ডাকছেন? তখনই মনে হলো, খুব খারাপ কিছু হয়তো অপেক্ষা করছে। তবু আমি দোয়া-কালাম পড়ছিলাম।’
বাপ্পির বাবা ভেতরে গেলে চিকিৎসকেরা প্রথমে জানতে চান, তার কয় সন্তান।
তিনি বলেন, ‘আমি বললাম, আমার দুই ছেলে। একজন বাপ্পি, আরেকজন বিজয়। তখন তারা বললেন, "পৃথিবীতে কেউ সারা জীবন বেঁচে থাকে না—না আমরা, না আপনি।" কথাটা শুনেই আমি মেঝেতে বসে পড়ি। তখনই বুঝে যাই, আমার ছেলে আর নেই। পরে জানতে পারি, ভোর সাড়ে ৫টার দিকেই চিকিৎসকেরা বুঝেছিলেন, বাপ্পিকে আর বাঁচানো যাবে না।’
ছেলের মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে বারবার ভেঙে পড়ছিলেন বাপ্পির মা।
তিনি বলেন, ‘আমার দুই ছেলেই মাইলস্টোনে পড়ত। বাপ্পি মারা যাওয়ার পর বিজয়কে অন্য স্কুলে ভর্তি করেছি। আমার আর মাইলস্টোনে যাওয়ার সাহস হয়নি। মাইলস্টোনের সামনে দিয়ে গেলেই আমার পা চলে না। আমি স্তব্ধ হয়ে যাই। সন্তান হারানোর যে কী যন্ত্রণা, সেটা যার সন্তান হারিয়েছে, সেই-ই শুধু বুঝবে। বাপ্পি আমার প্রথম সন্তান। কোটি টাকা দিয়েও সন্তানের মূল্য হয় না।’
তার অভিযোগ, এক বছর পেরিয়ে গেলেও তারা ন্যায়বিচার পাননি।
তিনি বলেন, ‘আমাদের সিসিটিভি ফুটেজ দেখানো হয়নি। তদন্তের রিপোর্টও দেখানো হয়নি। আমরা এখনো বিচার পাইনি। শুরুতে অনেক বড় বড় নেতা আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। মির্জা ফখরুলও এসেছিলেন। নির্বাচনের পর আর কেউ খোঁজ নেয়নি। বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি—আমরা বিচার চাই।’
দুর্ঘটনার দিনের কথা মনে পড়লে এখনও শিউরে ওঠেন তিনি।
‘মাইলস্টোনের সামনে গিয়ে যে দৃশ্য দেখেছিলাম, মনে হয়েছিল ছোট ছোট শিশুদের শরীর আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে। কী ভয়াবহ সময় পার করেছি, ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। সবচেয়ে বড় আফসোস, আমরা এখনো বিচার পেলাম না।’
এক বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু বাপ্পির মা-বাবার কাছে সময় যেন থেমে আছে ২১ জুলাইয়ের সেই দিনেই। নিজের হাতে স্কুলে পাঠানো ছেলেটি আর কোনো দিন ঘরে ফেরেনি। আইসিইউর সেই শব্দ, শেষ সকালের স্মৃতি আর না-পাওয়া বিচারের অপেক্ষা নিয়েই কাটছে তাদের প্রতিটি দিন।