মালদ্বীপের অনেক শিক্ষার্থী বাংলাদেশে চিকিৎসা বিষয়ে লেখাপড়া করছেন। ময়মনসিংহ, সিলেট এবং চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে তারা অধ্যয়ন করছেন বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত মালদ্বীপের হাইকমিশনার শিউনীন রশিদ। তিনি বলেন, ‘‘মালদ্বীপের সেরা চিকিৎসক বাংলাদেশে তৈরি হয়।’’
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউন এবং জাতীয় দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউন কার্যালয়ে পরিদর্শনে এসে ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ ও বাংলা ট্রিবিউনের নির্বাহী সম্পাদক উদিসা ইসলাম ও সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন তিনি।
শিউনীন রশিদ বলেন, ‘‘মালদ্বীপ শ্রমিক অভিবাসনের বাইরেও বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারত্ব সম্প্রসারণ করতে চায়। মালদ্বীপের অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশ থেকে আরও অভিবাসী কর্মী নিয়োগ করার সুযোগ আছে।’’
ঢাকা ট্রিবিউন ও বাংলা ট্রিবিউনের সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘‘দুই দেশের মধ্যে ইতোমধ্যে মানুষে মানুষে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং ব্যবসা, যোগাযোগ, শিক্ষা ও জলবায়ু কূটনীতির মাধ্যমে সহযোগিতা আরও গভীর করার সুযোগ আছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চ পর্যায়ের বিনিময় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন গতি সঞ্চার করেছে।’’
প্রসঙ্গত, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট আহমেদ মুইজ্জু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এ বছরের শুরুতে ঢাকা সফর করেন এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান আগামী সপ্তাহে মালদ্বীপের স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে যোগ দেবেন।
হাইকমিশনার আশা প্রকাশ করেন, উচ্চ পর্যায়ের সফর, অব্যাহত বিনিময়, বাণিজ্য, পর্যটন, বিনিয়োগ, কানেক্টিভিটি এবং জলবায়ু কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা আরও জোরদার করবে।
তিনি বলেন, ‘‘প্রায় এক লাখ বাংলাদেশি বর্তমানে মালদ্বীপে বসবাস এবং কাজ করেন—যা দ্বীপ রাষ্ট্রটির জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং তাদের দেশের বৃহত্তম প্রবাসী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে একটি।’’
‘‘মালদ্বীপ সরকার অনথিভুক্ত অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়মিত করতে এবং বিদেশি-কর্মীদের আরও সঠিক ডাটাবেজ তৈরি করতে দেশব্যাপী নিবন্ধন অভিযান চালাচ্ছে।’’
বাংলাদেশি শ্রমিকরা ঐতিহ্যগতভাবে নির্মাণ ও আতিথেয়তা খাতে নিয়োজিত থাকলেও হাইকমিশনার বলেন, ‘‘মালদ্বীপের অবকাঠামো ও পর্যটন উন্নয়ন অব্যাহত থাকায় নার্স, হিসাবরক্ষক এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞসহ দক্ষ পেশাদার কর্মীর চাহিদা বাড়ছে।’’
দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান পর্যটনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশ মালদ্বীপের জন্য ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ উৎস বাজারে পরিণত হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে আকাশপথে সরাসরি যোগাযোগ চালু হওয়ার পর থেকে উভয় দেশেই পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।’’
অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করতে মালদ্বীপ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ওপর বিধিনিষেধ শিথিল, পর্যটন, আতিথেয়তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অবকাঠামোতে সুযোগ উন্মুক্ত করে দেশটির বিনিয়োগ কাঠামো সংশোধন করেছে বলেও জানান তিনি।
হাইকমিশনার বলেন, ‘‘বর্তমানে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আকাশপথের ওপর নির্ভর করতে হয়। বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মধ্যে সরাসরি শিপিং লিংক নিয়ে উভয় দেশই আলোচনা করছে, যা লজিস্টিক খরচ কমাতে এবং বাণিজ্যের উন্নতি করতে পারে।’’
হাইকমিশনার আরও বলেন, ‘‘জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দুটি দেশ বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ শক্তিশালী বৈশ্বিক জলবায়ু কর্মকাণ্ড এবং জলবায়ু অর্থায়ন বৃদ্ধির জন্য আন্তর্জাতিক ফোরামে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘সমুদ্রের ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ইতোমধ্যে মাছকে গভীর জলে ঠেলে দিয়ে টুনা মৎস্যকে প্রভাবিত করছে, যা জেলেদের জন্য চ্যালেঞ্জ বাড়িয়ে তুলছে।’’
মালদ্বীপ নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করছে, সৌরশক্তিকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি শক্তি সমাধান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেহেতু দেশটির দ্বীপগুলো ভারত মহাসাগর জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এবং গভীর সমুদ্রের চ্যানেল দ্বারা পৃথক করা হয়েছে, বেশিরভাগ জনবহুল দ্বীপগুলো স্বাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে পরিচালনা করে—যা দেশব্যাপী বিদ্যুৎ সংযোগকে প্রযুক্তিগতভাবে চ্যালেঞ্জিং করে তোলে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অভ্যন্তরীণ সংস্কারের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘‘দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে মালদ্বীপ ওয়ার্ক ও বিজনেস ভিসা আবেদনসহ অনেক সরকারি সেবা ডিজিটালাইজড করেছে।’’
তামাক পণ্যের বিষয়ে মালদ্বীপ সরকারের কঠোর পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন তিনি। বলেন, ‘‘২০০৭ সালের ১ জানুয়ারির পর যাদের জন্ম তাদের কাছে সিগারেট কিংবা তামাক পণ্য বিক্রি করা নিষিদ্ধ।’’
হাইকমিশনার জানান, দুই দেশের মধ্যে অগ্রাধিকারভিত্তিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। পাশাপাশি সাজাপ্রাপ্ত বন্দিবিনিময় চুক্তি নিয়ে কাজ প্রায় শেষের দিকে।
তিনি আরও বলেন, ‘‘মালদ্বীপ বাংলাদেশের পর্যটন খাতের উন্নয়নে কারিগরি ও বিশেষজ্ঞ সহায়তা দিতে আগ্রহী।’’
প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানিয়ে ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমদ বলেন, ‘‘সাংবাদিকতা আজ জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃত। পাঠকদের দক্ষিণ এশিয়া এবং বৃহত্তর বিশ্বের উন্নয়নের প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহ রয়েছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘ঢাকা ট্রিবিউন ও বাংলা ট্রিবিউন পাঠকদের অভ্যাসের পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক কভারেজ সম্প্রসারণ করেছে। পর্যটন, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং আঞ্চলিক বোঝাপড়ার বিষয়টি প্রচারে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের গণমাধ্যমের মধ্যে বৃহত্তর সহযোগিতার আশা প্রকাশ করেছে।’’
রিয়াজ আহমেদ আরও বলেন, ‘‘বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন, ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা এবং শক্তিশালী আঞ্চলিক কণ্ঠস্বরকে ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।’’
বাংলা ট্রিবিউনের নির্বাহী সম্পাদক উদিসা ইসলাম বলেন, ‘‘দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি দুই দেশের গণমাধ্যম নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা সম্প্রসারিত করতে পারে।’’
পরিদর্শনের অংশ হিসেবে হাইকমিশনার ঢাকা ট্রিবিউন ও বাংলা ট্রিবিউনের নিউজ রুম ঘুরে দেখেন। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির সমন্বিত প্রিন্ট ও ডিজিটাল নিউজ কার্যক্রমের বিষয়ে রাষ্ট্রদূত অবহিত করেন ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক এবং বাংলা ট্রিবিউনের নির্বাহী সম্পাদক। পত্রিকা দুটির কনটেন্ট তৈরিতে সাংবাদিক, সম্পাদক ও মাল্টিমিডিয়া টিম কীভাবে একযোগে কাজ করে, তা ব্যাখ্যা করেন তারা।
এ সময় মালদ্বীপ হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব আহমেদ মাইশান, হাইকমিশনারের ব্যক্তিগত সহকারী ইকবাল জাহান নীলা এবং ঢাকা ট্রিবিউন ও বাংলা ট্রিবিউনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আরও পড়ুন:
বাংলা ট্রিবিউন ও ঢাকা ট্রিবিউন অফিস পরিদর্শনে মালদ্বীপের হাইকমিশনার