রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব গণপরিবহনে আজ শনিবার (১ আগস্ট) থেকে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) ডিভাইস বাধ্যতামূলক হয়েছে। সড়ক পরিবহনে শৃঙ্খলা আনা, যাত্রী নিরাপত্তা জোরদার করা এবং দুর্ঘটনা তদন্ত আরও কার্যকর করতে সরকারের এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে জিপিএস প্রযুক্তি নিয়ে এখনও অনেকের মধ্যে কৌতূহল রয়েছে। জিপিএস আসলে কী, এটি কীভাবে কাজ করে এবং গণপরিবহনে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ—এসব প্রশ্নের উত্তর জানাটাও জরুরি।
জিপিএস কী?
জিপিএস বা গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম হলো স্যাটেলাইটনির্ভর একটি নেভিগেশন প্রযুক্তি। পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা একাধিক স্যাটেলাইটের পাঠানো সংকেত ব্যবহার করে এটি কোনও ব্যক্তি, যানবাহন বা বস্তুর সুনির্দিষ্ট অবস্থান নির্ধারণ করতে পারে।
প্রযুক্তিটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি হলেও বর্তমানে এটি বিশ্বের প্রায় সব দেশেই ব্যবহৃত হচ্ছে। স্মার্টফোনে লোকেশন দেখা, গুগল ম্যাপ ব্যবহার, রাইড শেয়ারিং সেবা কিংবা বিমান ও জাহাজ পরিচালনা—সব ক্ষেত্রেই জিপিএস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কীভাবে কাজ করে?
পৃথিবীর চারদিকে ঘুরতে থাকা ৩০টিরও বেশি কার্যকর জিপিএস স্যাটেলাইট নিয়মিত সংকেত পাঠায়। বাসে স্থাপন করা জিপিএস রিসিভার একই সময়ে একাধিক স্যাটেলাইটের সেই সংকেত গ্রহণ করে।
সংকেতগুলো ডিভাইসে পৌঁছাতে কত সময় লাগছে, তা বিশ্লেষণ করে রিসিভার নিজের অবস্থান, গতি এবং চলার দিক নির্ধারণ করে। পরে মোবাইল নেটওয়ার্ক বা অন্য যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে সেই তথ্য কেন্দ্রীয় সার্ভারে পাঠানো যায়। ফলে রিয়েল টাইমে একটি বাস কোথায় রয়েছে, কত গতিতে চলছে এবং কোন রুট অনুসরণ করছে—তা সহজেই পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়।
গণপরিবহনে কেন দরকার?
বিশেষজ্ঞদের মতে, গণপরিবহনে জিপিএস ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো যানবাহনের চলাচল সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা যায়।
এর মাধ্যমে নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম করা হচ্ছে কি না, চালক নির্ধারিত রুট অনুসরণ করছেন কিনা কিংবা কোনও বাস দীর্ঘ সময় অস্বাভাবিকভাবে কোথাও অবস্থান করছে কি না—এসব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা সম্ভব।
দুর্ঘটনা ঘটলে বাসের গতি, অবস্থান ও চলাচলের তথ্য তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল প্রমাণ হিসেবেও কাজে লাগতে পারে। পাশাপাশি বহর ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি অপচয় কমানো এবং যানবাহনের কার্যক্রম আরও দক্ষভাবে পরিচালনায়ও জিপিএস কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
যাত্রীরা কী সুবিধা পাবেন?
গণপরিবহনে জিপিএস বাধ্যতামূলক হওয়ায় যাত্রীদের নিরাপত্তা বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভবিষ্যতে বাসের রিয়েল টাইম অবস্থান জানার সুযোগ তৈরি হলে যাত্রীদের অপ্রয়োজনীয় অপেক্ষাও কমতে পারে।
এছাড়া কোনও দুর্ঘটনা, অনিয়ম বা অভিযোগের ক্ষেত্রে বাসের গতিপথ ও গতিবেগের তথ্য যাচাই করা সহজ হবে। এতে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর প্রবণতা কমার পাশাপাশি জবাবদিহিও বাড়বে।
শুধু জিপিএস লাগালেই কি যথেষ্ট?
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বাসে জিপিএস ডিভাইস বসিয়ে দিলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। ডিভাইসগুলো সার্বক্ষণিক সচল রাখা, তথ্য সংরক্ষণ, কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া নিশ্চিত করতে হবে।
তাদের মতে, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, দুর্ঘটনা কমানো এবং যাত্রী নিরাপত্তা বাড়াতে জিপিএস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ আগস্ট থেকে দেশের সব গণপরিবহনে জিপিএস ডিভাইস বাধ্যতামূলক হয়েছে। এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।
বিশেষজ্ঞদের আশা, কার্যকর তদারকি ও নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ দেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনে দিতে পারে।