জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় গ্রাম ছাড়ছে মানুষ, কতটা প্রস্তুত শহর?

খুলনা শহরে এসে রিকশা চালাবেন—এমন কোনও পরিকল্পনা ছিল না আবদুল রহিমের। খুলনার একটি উপকূলীয় গ্রামের বাসিন্দা তিনি। কৃষিকাজ করেই চলত সংসার। কিন্তু একের পর এক জলবায়ুজনিত দুর্যোগ আর কৃষিতে আয় কমে যাওয়ায় ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে তার জীবিকা। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই গ্রাম ছেড়ে খুলনা শহরে চলে আসেন। এখন রিকশা চালিয়েই পরিবার চালান।

বরগুনার নওরীন আক্তারের গল্পও আলাদা নয়। তিনি জানান, লবণাক্ততা বাড়া এবং ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠা জীবনযাত্রার কারণে ঢাকায় চলে আসা ছাড়া তার সামনে আর কোনও পথ খোলা ছিল না। এখন তিনি গৃহকর্মীর কাজ করেন।

আবদুল রহিম আর নওরীনের গল্প আসলে বাংলাদেশেরই গল্প। জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু পরিবেশের সংকট নয়; এটি মানুষের জীবিকা বদলে দিচ্ছে, গ্রাম থেকে শহরে মানুষের স্রোত বাড়াচ্ছে এবং শহরগুলোর ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন শুধু কত মানুষ জলবায়ুর কারণে ঘরছাড়া হচ্ছে, সেই হিসাব করলেই চলবে না। বড় প্রশ্ন হলো—এই মানুষদের গ্রহণ করার মতো প্রস্তুতি কি বাংলাদেশের শহরগুলোর আছে?

বিশ্বব্যাংকের গ্রাউন্ডসওয়েল প্রতিবেদনের পূর্বাভাস বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৯৯ লাখ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের ভেতরেই স্থানান্তরিত হতে পারে। এদিক থেকে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসীর দেশগুলোর একটি।

অপরদিকে, বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) ২০২৫ সালের যৌথ মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত হয়ে বসবাস করছেন।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সংখ্যা দিয়ে এই সংকট বোঝা যাবে না।

কারণ, মানুষ সাধারণত একটিমাত্র কারণে ঘর ছাড়ে না। জলবায়ুর প্রভাবের পাশাপাশি কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পারিবারিক সম্পর্ক—সব মিলিয়েই মানুষ নতুন জায়গায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাই কাউকে শুধু ‘জলবায়ু অভিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করাও সহজ নয়।

এ কারণেই আন্তর্জাতিকভাবে এখনো ‘জলবায়ু অভিবাসী’ শব্দটির কোনো সর্বজনস্বীকৃত সংজ্ঞা তৈরি হয়নি।

প্রথমে উপজেলা, পরে বড় শহর

জলবায়ুর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বেশিরভাগ মানুষ প্রথমে পাশের উপজেলা বা জেলা শহরে আশ্রয় নেন। পরে তাদের অনেকেই ঢাকাসহ খুলনা, চট্টগ্রামের মতো বড় শহরে চলে আসেন।

কিন্তু শহরে এলেই যে নিরাপদ জীবন মেলে, তা নয়।

অনেক পরিবার বস্তি বা অনানুষ্ঠানিক বসতিতে থাকতে বাধ্য হয়। সেখানে পর্যাপ্ত বাসস্থান, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা শিক্ষার সুযোগ সীমিত। আবার অনেকে অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ পান, যেখানে আয় অনিশ্চিত এবং সামাজিক নিরাপত্তা প্রায় নেই।

আবদুল রহিম শহরে এসে রোজগারের সুযোগ পেলেও হারিয়েছেন নিজের পুরোনো জীবন।

নওরীন আক্তারের আয় বেড়েছে, কিন্তু নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা এখনো অধরাই।

তাদের অভিজ্ঞতা বলে দেয়, জলবায়ুজনিত অভিবাসন শুধু গ্রামের সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের শহরগুলোর ভবিষ্যৎও বদলে দিচ্ছে।

‘অভিবাসী নয়, শহরকে প্রস্তুত করতে হবে’

সুইসকন্ট্যাক্ট বাংলাদেশের টিম লিডার, নৃবিজ্ঞানী ও সুশাসন বিশেষজ্ঞ মো. আবুল বাসারের মতে, এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত শহরগুলোকে প্রস্তুত করা।

তার ভাষায়, জলবায়ুজনিত স্থানান্তরকে শুধু মানবিক সংকট হিসেবে দেখলে হবে না। এটি নগর ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় অর্থনীতি এবং জনসেবা নিশ্চিত করারও বিষয়।

তিনি বলেন, কোনও শহরে যদি সাশ্রয়ী আবাসন, কর্মসংস্থান, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে কাউকে ‘জলবায়ু অভিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার তেমন অর্থ থাকে না।

তিনি বলেন, “মূল বিষয় হলো কে জলবায়ুর কারণে এসেছে, সেটা নয়; বরং আমাদের শহরগুলো ক্রমবর্ধমান মানুষের চাপ সামাল দেওয়ার মতো প্রস্তুত কিনা।”

নীতিমালা আছে, বাস্তবায়ন দুর্বল

অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ২০২১ সালে জাতীয় কৌশল গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি জলবায়ু অভিযোজন, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচিও চলছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ করে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে এসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন এখনো দুর্বল।

বেশিরভাগ পৌরসভার অর্থ ও জনবল সীমিত। এরই মধ্যে অবকাঠামো ও জনসেবার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া দ্বিতীয় সারির শহরগুলো ভবিষ্যতের এই জনস্রোত সামাল দিতে হিমশিম খেতে পারে।

মানুষকে নয়, শহরকেও প্রস্তুত করতে হবে

আগামী কয়েক দশকে জলবায়ুজনিত অভিবাসন বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন-চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, শুধু কত মানুষ স্থানান্তরিত হচ্ছে, সেই হিসাব রাখলেই হবে না। নগর পরিকল্পনা, আবাসন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন—সব ক্ষেত্রেই বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে পুরোনো বাসিন্দা এবং নতুন আসা মানুষ—উভয়েই নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন গড়ে তুলতে পারেন।

আবদুল রহিম ও নওরীন আক্তারের গল্প মনে করিয়ে দেয়, জলবায়ুজনিত অভিবাসন আর শুধু উপকূলের মানুষের সমস্যা নয়; এটি এখন বাংলাদেশের শহরগুলোর বাস্তবতা।

তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আর কত মানুষ জলবায়ুর কারণে ঘর ছাড়ছে—সেটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো, যারা ইতোমধ্যে শহরে চলে আসছেন, তাদের জন্য আমাদের শহরগুলো কতটা প্রস্তুত?