মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে না দিয়ে দেশের সব বৈধ ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছে জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিস (বায়রা)।
বুধবার (১৯ আগস্ট) রাজধানীর বিজয়নগরের ফার্স হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন ও মতবিনিময় সভায় লিখিত বক্তব্যে এ দাবি জানান বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, “আমরা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ রাখার পক্ষে নই; বরং দ্রুত শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার পক্ষে। তবে কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে নয়, সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির সমান অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাজারটি চালু করতে হবে।”
ফখরুল ইসলাম জানান, ২০১৬ সালে ১০টি এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালু হয়ে ২০১৮ সালে বন্ধ হয়। ২০২২ সালে ২৫টি এজেন্সির মাধ্যমে পুনরায় চালু হয়ে পরে এজেন্সির সংখ্যা ১০১টিতে উন্নীত হয়। অনিয়ম ও উচ্চ অভিবাসন ব্যয়ের অভিযোগের মধ্যে ২০২৪ সালে আবারও বাজারটি বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি বলেন, “অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একই ধরনের অস্বচ্ছ, একচেটিয়া ও সীমিত এজেন্সিনির্ভর ব্যবস্থা আবার চালু করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।”
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে এজেন্সি বাছাই নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ফখরুল ইসলাম।
তার দাবি, ১০টি মানদণ্ডের মধ্যে সাতটি শর্ত পূরণকারী ২৬০টি এবং ছয়টি শর্ত পূরণকারী ১৬৩টিসহ মোট ৪২৩টি এজেন্সির তালিকা পাঠানো হয়েছে। শর্ত শিথিল করা হলে সব বৈধ এজেন্সিকে পুনরায় আবেদনের সুযোগ না দেওয়ায় প্রায় দুই হাজার এজেন্সি বঞ্চিত হয়েছে।
এদিকে, মাত্র ২৫টি এজেন্সিকে কেন্দ্র করে নতুন সিন্ডিকেট তৈরির চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য ৫০ লাখ রিঙ্গিত (প্রায় ১৭ কোটি টাকা) এবং কর্মীপ্রতি ৫ হাজার রিঙ্গিত নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে বায়রার পক্ষ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সব বৈধ ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সিকে সমান সুযোগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়। ২৫, ৫০ বা ১০০টি এজেন্সির হাতে শ্রমবাজার সীমাবদ্ধ না রেখে এজেন্সি বাছাইয়ে স্বচ্ছ ও সবার জন্য সমান নীতিমালা করার আহ্বান জানানো হয়।
এ ছাড়া বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধন করে বাংলাদেশ থেকে কোন এজেন্সি কর্মী পাঠাবে, তা বাংলাদেশ সরকার বা নিয়োগকর্তার মাধ্যমে নির্ধারণের দাবি জানানো হয়। মালয়েশিয়া সীমিতসংখ্যক এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নিতে চাইলে সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের মাধ্যমে ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ চালুর প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
একইসঙ্গে কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় কমাতে স্বচ্ছ ডাটাব্যাংক, কিস্তিতে ব্যয় পরিশোধের ব্যবস্থা ও শক্তিশালী সরকারি নজরদারি চালুর দাবিও জানানো হয়। আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি বাংলাদেশির বৈদেশিক কর্মসংস্থানের লক্ষ্য অর্জনে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা না দিয়ে সব বৈধ, অভিজ্ঞ ও সক্ষম রিক্রুটিং এজেন্সিকে কাজে লাগানোর দাবি জানান তারা।
প্রয়োজনে বোয়েসেলের ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’-এর মাধ্যমে সব বৈধ এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানান বায়রার সদস্যরা।
এ সময় বায়রার সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “দীর্ঘদিন পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুললেও পুরোনো সিন্ডিকেট নতুন রূপে ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে। বায়রার ২ হাজার ৬০০ সদস্যের মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশকে ব্যবসার সুযোগ দিয়ে বাকিদের বঞ্চিত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
তিনি বলেন, “আগেরবার সিন্ডিকেটের রেট প্রায় ৫ কোটি টাকা থাকলেও এবার তা বেড়ে সাড়ে ১৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের ওপর পড়বে।”
রিয়াজুল ইসলাম আরও বলেন, “সিন্ডিকেটের কারণে একজন শ্রমিককে বিদেশ যেতে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হতে পারে, যা শ্রমিক শোষণের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
প্রধানমন্ত্রী এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সিন্ডিকেট বন্ধ করে সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য শ্রমবাজার উন্মুক্ত রাখার আহ্বান জানিয়ে রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “আবার সিন্ডিকেট হলে আমরা এর বিরুদ্ধে শহীদ মিনারে আমরণ অনশনসহ আন্দোলনে যেতে প্রস্তুত।”