গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলে স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি: হিউম্যান রাইটস ফোরাম

গুম প্রতিরোধ, গুমের শিকার ব্যক্তিদের সন্ধান, ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের অধিকার এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার লক্ষ্যে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি) মনে করে, গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় সত্য উদঘাটন ও কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করতে হলে প্রস্তাবিত আইনে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

এইচআরএফবি থেকে সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।

এইচআরএফবি মনে করে, গুমকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি, ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের অধিকার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে তদন্তব্যবস্থা স্বাধীন না হলে আইনে যত কঠোর শাস্তি বা প্রতিকারের বিধানই থাকুক, তা কার্যকর করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।

বিলটির ধারা ১৪(৩) এ কোনও শৃঙ্খলা-বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হলে সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে তদন্ত থেকে বিরত রাখার বিধানটি ইতিবাচক। তবে একই ধারায় অভিযুক্ত বাহিনী ছাড়া অন্য কোনও শৃঙ্খলা-বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের কাছে তদন্তভার অর্পণের সুযোগ রাখা হয়েছে। এইচআরএফবি মনে করে, এক বাহিনীর পরিবর্তে অন্য বাহিনী দিয়ে তদন্ত করলেই প্রকৃত স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত হয় না।

গুমের অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষকে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা বাহিনী থেকে শুধু নয়, প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব থেকেও স্বাধীন হতে হবে। কারণ গুমের ঘটনায় আটক বা হেফাজতের নথি, ডিউটি রোস্টার, যানবাহনের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, কল রেকর্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত পরীক্ষা করার পাশাপাশি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ বা সম্পৃক্ততার বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসতে পারে। তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন না হলে তদন্ত প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

বাংলাদেশে নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩-এর অভিজ্ঞতাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে নির্যাতন বা হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগের তদন্তের প্রাথমিক দায়িত্ব পুলিশের ওপর থাকায় তদন্তের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। যে বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই বাহিনীর বা একই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অধীন কর্মকর্তার মাধ্যমে তদন্ত হলে স্বার্থের সংঘাত এবং তদন্ত প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে আইন থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা কার্যকর প্রতিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন।

এইচআরএফবি মনে করে, এই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি এড়াতে গুমের অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন ও বিশেষায়িত তদন্ত কর্তৃপক্ষ গঠন করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে পুলিশ বা অন্যান্য বাহিনীর কারিগরি সহায়তা নেওয়া যেতে পারে; তবে তদন্তের নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত ও চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ স্বাধীন কর্তৃপক্ষের হাতে থাকতে হবে।

এইচআরএফবি জাতীয় সংসদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে, বিলটি পাসের আগে ধারা ১৪ সহ তদন্তসংক্রান্ত বিধান পুনর্বিবেচনা করে প্রকৃত স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তব্যবস্থা আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। অতীতে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলোকেও এই স্বাধীন তদন্তব্যবস্থার আওতায় এনে সত্য উদঘাটন, দায় নির্ধারণ, বিচার এবং ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এইচআরএফবি মনে করে, অভিযুক্ত বাহিনীর পরিবর্তে অন্য বাহিনী দিয়ে তদন্ত নয়, গুমের সত্য উদঘাটনের জন্য প্রয়োজন এমন একটি তদন্তব্যবস্থা, যা অভিযুক্ত ব্যক্তি, বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন।