কী এই র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার, রুনা খানের আগে আর কোন বাংলাদেশি পেয়েছেন

‘এশিয়ার নোবেল’ হিসেবে পরিচিত র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার এশিয়ার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারগুলোর একটি। জাতি, ধর্ম ও লিঙ্গ নির্বিশেষে এশিয়ায় যারা নিঃস্বার্থভাবে সমাজ, মানবতা ও উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন, তাদের স্বীকৃতি দিতে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।

ফিলিপাইনের সপ্তম প্রেসিডেন্ট র‍্যামন ম্যাগসাইসাইয়ের নামে এ পুরস্কারের নামকরণ করা হয়েছে। সততা, সাহসী জনসেবা ও গণতান্ত্রিক আদর্শের প্রতীক হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। ১৯৫৭ সালে নিউইয়র্কে রকফেলার ব্রাদার্স ফান্ডের ট্রাস্টিরা ফিলিপাইন সরকারের সম্মতিতে এ পুরস্কার প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম পুরস্কার দেওয়া হয় ১৯৫৮ সালে। ম্যানিলাভিত্তিক র‍্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন (আরএমএএফ) এ পুরস্কার পরিচালনা করে।

নিজ নিজ ক্ষেত্রে এশিয়ার ব্যক্তি ও সংগঠনকে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়ার কারণে র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কারকে ‘এশিয়ার নোবেল’ বলা হয়। অনেক বিজয়ী পরে বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়েছেন।

শুরুতে পাঁচটি ক্যাটাগরিতে এ পুরস্কার দেওয়া হতো—সরকারি সেবা, জনসেবা, সামাজিক বা কমিউনিটি নেতৃত্ব, সাংবাদিকতা-সাহিত্য ও সৃজনশীল যোগাযোগ কলা এবং শান্তি ও আন্তর্জাতিক সমন্বয়। ২০০০ সালে ৪০ বছরের কম বয়সী তরুণদের জন্য ‘উদীয়মান নেতৃত্ব’ বা ‘ইমার্জেন্ট লিডারশিপ’ নামে নতুন একটি ক্যাটাগরি যোগ হয়। নিজ নিজ কমিউনিটিতে বড় পরিবর্তন আনা তরুণদের এই ক্যাটাগরিতে পুরস্কৃত করা হতো। ২০০৯ সাল থেকে কোনো ক্যাটাগরি ছাড়াই সার্বিক অবদানের জন্য এ পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ থেকে এখন পর্যন্ত ১৪ জন এই পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে প্রথমজন তাহরুন নেসা আবদুল্লাহ। ১৯৭৮ সালে গ্রামীণ নারীদের উন্নয়নে কাজের জন্য সামাজিক নেতৃত্বে তিনি এ সম্মাননা পান। এর দুই বছর পর, ১৯৮০ সালে ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হাসান আবেদ সামাজিক নেতৃত্বে র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পান।

১৯৮৪ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ ইউনূস সামাজিক নেতৃত্বে এ পুরস্কার পান। পরের বছর, ১৯৮৫ সালে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরীও সামাজিক নেতৃত্বে পুরস্কৃত হন।

১৯৮৭ সালে দীর্ঘদিন বাংলাদেশে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে আমেরিকান ধর্মযাজক ও বিজ্ঞানী রিচার্ড উইলিয়াম টিম শান্তি ও আন্তর্জাতিক সমন্বয় ক্যাটাগরিতে র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পান। এরপর ১৯৮৮ সালে সামাজিক নেতৃত্বে পুরস্কার পান মোহাম্মদ ইয়াছিন। ১৯৯৯ সালে নারী অধিকার ও উন্নয়নকর্মী এঞ্জেলা গোমেজ সামাজিক নেতৃত্বে এ সম্মাননা পান।

২০০৪ সালে সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও সৃজনশীল যোগাযোগ কলায় পুরস্কার পান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। পরের বছর, ২০০৫ সালে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান সাংবাদিকতায় এ পুরস্কার পান।

২০১০ সালে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের প্রযুক্তি উদ্ভাবক এ এইচ এম নোমান খান সামাজিক নেতৃত্বে র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পান। ২০১২ সালে পরিবেশ আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সরকারি সেবায় এ সম্মাননা অর্জন করেন।

এরপর ২০২১ সালে আইসিডিডিআর,বির বিজ্ঞানী ফিরদৌসী কাদরী টিকা গবেষণায় র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পান। ২০২৩ সালে জাগো ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা করভি রাখসান্দ উদীয়মান নেতৃত্ব ক্যাটাগরিতে এ পুরস্কার পান।

সর্বশেষ বাংলাদেশের তালিকায় যুক্ত হয়েছেন ফ্রেন্ডশিপের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক রুনা খান। সোমবার (৩১ আগস্ট) ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় র‍্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন ২০২৬ সালের পুরস্কারজয়ীদের নাম ঘোষণা করে। প্রান্তিক ও জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে অবদানের জন্য তিনি এ পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের ১৪তম র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কারজয়ী হলেন।

রুনা খান ২০০২ সালে ফ্রেন্ডশিপ প্রতিষ্ঠা করেন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সমন্বিত, সামগ্রিক ও স্থানীয় বাস্তবতাভিত্তিক উন্নয়ন সমাধান গড়ে তোলায় নেতৃত্ব, সাহস ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির স্বীকৃতি হিসেবে তিনি এ সম্মাননা পেয়েছেন।

৩১ আগস্ট র‍্যামন ম্যাগসাইসাইয়ের জন্মদিন। সোমবার তার ১১৯তম জন্মবার্ষিকী। প্রতিবছর তার জন্মদিনে ম্যানিলা থেকে এ পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। আগামী ১৫ নভেম্বর ম্যানিলায় পুরস্কারজয়ীদের হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হবে।

র‍্যামন ম্যাগসাইসাই ফিলিপাইনের সপ্তম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ১৯৫৭ সালের ১৭ মার্চ এক মর্মান্তিক উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান। একই বছর র‍্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৮ সাল থেকে এ পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়েছে।

র‍্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশনের ভাষ্য, ২০২৬ সালের পুরস্কারজয়ীদের এমন কাজের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে, যা র‍্যামন ম্যাগসাইসাইয়ের নেতৃত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চিরস্থায়ী মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটায়। এসব মূল্যবোধের মধ্যে রয়েছে অন্যের সেবায় নিয়োজিত থাকা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা এবং মানুষকে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করা।