বৈঠকের সিদ্ধান্ত মানা হচ্ছে না, বেশি দামেই বিক্রি হচ্ছে রুটি

বেকারি পণ্যের দাম আপাতত না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হলেও রাজধানীর বাজারে তার প্রতিফলন নেই। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকের দুদিন পরই কোথাও বাড়তি দামে পাউরুটি, বনরুটি ও বাটারবন বিক্রি হচ্ছে, কোথাও এসব পণ্যের সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আবার কোনো কোনো বেকারি একই দাম রেখে পণ্যের ওজন কমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। কোনো কোনো চায়ের দোকানে কয়েক দিন ধরে বনরুটি ও বাটারবন সরবরাহ বন্ধ। আবার কোথাও ১০ টাকার বনরুটি ১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেকারি ব্যবসায়ীদের কেউ বলছেন, তারা দাম বাড়াননি; তবে স্থানীয় পর্যায়ে কেউ কেউ বাড়িয়ে থাকতে পারেন। একই সঙ্গে আগামী রবিবারের বৈঠকে পণ্যের আকার বা ওজন কমানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে বলেও জানিয়েছেন বেকারি মালিক সমিতির সভাপতি।

গত মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বেকারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানিয়েছিলেন, বিস্কুট ও ব্রেডের মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত রাখার বিষয়ে ব্যবসায়ী নেতারা সম্মত হয়েছেন। কিন্তু এর পরই বাজারে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র।

কোথাও দাম বেড়েছে, কোথাও সরবরাহ বন্ধ

মিরপুর এলাকার একটি চায়ের টং দোকানের বিক্রেতা জোৎস্না বলেন, “তিন দিন ধরে বনরুটি, বাটারবন এসব দেয় না। কিন্তু রাতে শুধু কেক দিয়ে যায়। এটাই আপাতত বিক্রি করছি। বেকারির লোকেরা বলছে রুটির দাম বাড়াবে। যে বাটারবন ২০ টাকা বিক্রি করতাম, সেটা করতে চাচ্ছে ২৫ টাকা। এরকম করে সব রুটির দামই নাকি ৫ টাকা করে বাড়াতে চায়।”

মিরপুর-১ নম্বর এলাকার চায়ের দোকানের বিক্রেতা রাহেলা বেগম বলেন, ‘আমার এখানে কয়েক দিন ধরে মাল দেওয়া বন্ধ আছে। এলাকার যেসব বেকারি আছে, তারা এমন করছে। দাম বাড়ায়ও আবার মালও দেয়নি। হয়তো দাম বাড়বে।’

মিরপুর-২ নম্বর এলাকার চায়ের দোকানদার মোহাম্মদ মাসুম বলেন, ‘আমার দোকানে যে বেকারি রুটি, কেক দিয়ে যায় তারা সবকিছুর দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। যে বনরুটি ১০ টাকা বিক্রি করতাম সেগুলো এখন বিক্রি করছি ১৫ টাকা। একইরকম যেই কেক ১০ টাকা বিক্রি করতাম সেগুলোও ১৫ টাকা করে ফেলেছে। তো আমরা সেই দামেই বিক্রি করছি গত তিনদিন ধরেই।’

তবে বেকারি মালিক সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন শুক্রবার রাতে বলেন, ‘আমরা কোনো বেকারি পণ্যের দাম বাড়াইনি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা আমাদের সদস্যদের নির্দেশনা দিয়েছি।’

বিভিন্ন দোকানে বাড়তি দাম নেওয়ার বিষয়টি জানালে তিনি বলেন, ‘বড় প্রতিষ্ঠানের শোরুমগুলোতে দাম বাড়ানো হতে পারে। শোরুমগুলোর সঙ্গে আমাদের কোনো যোগযোগ নেই। আমাদের সমিতির সদস্যদের পণ্য বিক্রি হয় ছোট চায়ের দোকানে। তবে স্থানীয় বেকারিদের কেউ কেউ দাম বাড়িয়ে থাকতে পারে। তারা বাড়ালে আমাদের কি করণীয় বলেন? সরকারের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান চাইলে ব্যবস্থা নিতে পারে।’

সমিতির পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের সদস্যদের মধ্যে কেউ দাম বাড়ালে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখবো।’

আগামী রবিবার আরেকটি বৈঠক আছে জানিয়ে তিনি বলেন, সেখানে বেকারি পণ্যের দাম অনুযায়ী সাইজ ছোট-বড় করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে।

৪০০ গ্রামের পাউরুটি হতে পারে ৩২০-৩৫০ গ্রাম

মিরপুর-২ নম্বরের বনলতা লাইভ বেকারির শাখা ব্যবস্থাপক মকিদুল ইসলাম শিশির বলেন, তাদের কোম্পানি এখনও দাম বাড়ানো বা ওজন কমানোর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। তবে বাজার পরিস্থিতিতে দুই ধরনের সমন্বয়ের আলোচনা চলছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের কোম্পানি এখনও কোনও কিছু জানায়নি। ওজন কম দিতেও বলেনি, দাম বাড়াতেও বলেনি। তবে দাম বাড়ার সম্ভাবনা অবশ্যই আছে। আমরাও নেটে, ফেসবুকে বিভিন্ন জায়গায় দেখছি। আবার হয়তো দাম না বাড়িয়ে ৪০০ গ্রামের ব্রেড ৩২০ থেকে ৩৫০ গ্রাম করা হবে। আর যদি দাম বাড়ানো হয়, তাহলে ৪০০ গ্রামই থাকবে। এরকম একটা বিষয় আলোচনা হচ্ছে। তবে আমাদের কোম্পানি এখনও কোনও কিছু বলেনি।’

কবে দাম বাড়তে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেটা আমি বলতে পারবো না। আমাদের আউটলেট তো অনেকগুলো। কোম্পানি জানালে সব আউটলেটের ম্যানেজারদের হয়তো ডেকে বিষয়টি জানাবে। তবে এখন কোম্পানির লাভ কম হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখনও আমরা দাম বাড়াইনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু সব জায়গায় দাম বাড়ছে, বেকারি মালিক সমিতি থেকে যদি দাম বাড়ানো হয়, তাহলে অবশ্যই বাড়বে। কিন্তু এর মধ্যে কী হয়েছে বা না হয়েছে, সেগুলো আমরা বলতে পারবো না। গত শনিবার থেকে দাম বাড়ার কথা ছিল। কিন্তু এখনও বেকারি সমিতির কোনও রেসপন্স পাইনি।’

বাড়তি খরচে চাপ

গত ১৩ সেপ্টেম্বর বেকারি মালিক সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন জানিয়েছিলেন, ময়দা, ডালডা, তেল ও প্যাকেজিং সামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় লোকসান সামাল দিতে পণ্যের দাম ও ওজন সমন্বয় করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা তো দাম বৃদ্ধি করতে চাই না। কিন্তু ময়দা, ডালডা, তেল এবং আমাদের প্যাকেজিং সামগ্রীর স্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমরা লোকসানের জায়গায় ছিলাম। যার কারণে এবার আমরা ২০ শতাংশ সমন্বয় করি। সারা দেশ থেকে আমাদের একই সঙ্গে সবকিছু সমন্বয় হচ্ছে।’

তার দেওয়া হিসাবে, ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকার ময়দা এখন ৩ হাজার ২০০ টাকা হয়েছে। ২৫ হাজার টাকার তেলের ড্রাম বেড়ে হয়েছে ৩৩ হাজার টাকা। প্যাকেজিং সামগ্রীর দাম ৮০-৮৫ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৪০ টাকা।

মিরপুর-২ নম্বরের মোল্লা জেনারেল স্টোরের বিক্রেতা মুজিবুর রহমানও ১৩ সেপ্টেম্বর জানিয়েছিলেন, এক কেজি ময়দা ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৯০ টাকা হয়েছে। দুই কেজি আটা ১৩০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা হয়েছে। খোলা চিনি ১২০ টাকা এবং প্যাকেট চিনি ১১০ টাকা।

গ্যাস ও বিদ্যুতের বাড়তি খরচের কথাও জানিয়েছেন মকিদুল ইসলাম শিশির। তিনি বলেন, ‘গ্যাস আগে ৪ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে কিনতাম, এখন ৫ হাজার ২০০ টাকা করে কিনতে হয়। আর কারেন্ট না থাকলে প্রতিদিন জেনারেটরে অনেক তেল খরচ হয়। আমাদের তো এখানে লাইভ বেকারি। আমাদের ওভেন চলে, মিক্সার মেশিন চলে। দাম বাড়ার পেছনে বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিষয়টিই জড়িত। বিশেষ করে বিদ্যুৎটা বেশি জড়িত। দেখা যাচ্ছে, দুই ঘণ্টা কারেন্ট চলে গেলে আমার জেনারেটরে ছয়-সাত লিটার তেল শেষ। প্রতি লিটার তেলের দাম ১৫০ টাকা। সকালেও কারেন্ট যায়, বিকালেও যায়, আবার রাতেও যায়। প্রতিদিন যদি তেল বা ফুয়েলেই ২ হাজার টাকা করে দিতে হয়, তাহলে আমার পোষাবে না।’

চাপ পড়বে শ্রমজীবী মানুষের ওপর

বেকারি পণ্যের দাম ও ওজন সমন্বয়ের প্রভাব শ্রমজীবী মানুষের ওপর পড়বে—এ কথাও ১৩ সেপ্টেম্বর জানিয়েছিলেন জালাল উদ্দিন।

তিনি বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছি, সাধারণ মানুষের ওপর, বিশেষ করে গরিব মানুষের ওপর চাপ পড়ছে। এরপরও আমাদের কোনও পথ নেই। কারণ আমাদের ম্যাক্সিমাম কাস্টমার হলো শ্রমজীবী মানুষ—যারা দিনমজুর, রিকশা চালায়, হকারি করে। তাদের ওপরও একটা চাপ পড়বে। তারপরও আমরা ওইভাবে মূল্যটা সমন্বয় করতে পারিনি, যেহেতু কাঁচামালের দাম বাড়তি।’

মিরপুরের ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক মো. সাইমনও বলছেন, বাড়তি দাম তার মতো শ্রমজীবী মানুষের জন্য নতুন চাপ তৈরি করবে।

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাজারে তো কোনও কিছুর দাম কম বলে কিছু নেই আমাদের জন্য। আমাদের জন্য সবকিছুর দামই বেশি। সকালবেলা ভাত খেয়ে বের হই। ১১-১২টার দিকে ক্ষুধা লাগলে চা-রুটি খাই। এখন সেই রুটিও ঠিকমতো সব দোকানে পাই না। আবার বলছে দামও নাকি বাড়বে। এরকম হলে আমরা আসলে কী করবো? সবকিছুর দাম বাড়ে, আমাদের খরচ বাড়ে। খালি আমাদের ইনকাম বাড়ে না।’

বেকারি ব্যবসায় বড় ব্যবসায়ীদের প্রভাব নিয়েও অভিযোগ করেন জালাল উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘ছোট পুঁজির ব্যবসায়ীরা বড় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছেন না। আমরা তো খুব স্বল্প পুঁজির ব্যবসায়ী। আমাদের পুঁজি হয়তো ২৫-৩০ লাখ বা কারও ৫ লাখ টাকা। কিন্তু এই ছোট পুঁজির ব্যবসায়ীদের যেভাবে বড় ব্যবসায়ীরা গ্রাস করছে। যারা হেলিকপ্টার বানাবে, যারা প্লেন বানাবে, যারা ট্যাংক বানাবে, তারা বানাবে, তারা বানায় লাড্ডু, ঝালমুড়ি, চানাচুর। তারা যদি এগুলো করতে থাকে, তাহলে আমাদের মতো স্বল্প পুঁজির ব্যবসায়ীরা ধ্বংস হয়ে যাবে।’

সরকারের কাছে কে কী বানাতে পারবে, তার একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরির দাবি জানান তিনি। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে জালাল উদ্দিন বলেন, ‘বর্তমানে দেশে গ্যাসের সংকট এবং বিদ্যুতের যে অবস্থা, এটা হলো মরার ওপর খাঁড়ার ঘা। বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে আমাদের প্রোডাকশন বন্ধ হয়ে যায়। বিদ্যুৎ চলে যায়, গ্যাস থাকে না। আবার ধরেন, সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হয়, সিলিন্ডারের দামও অনেক বেশি। কোনও অবস্থায় এখন আমাদের অবস্থা হচ্ছে; মাথা ঢাকতে গিয়ে পা বের হয়ে যেতে হচ্ছে, পা ঢাকতে গিয়ে মাথা বের হয়ে যাচ্ছে। আমাদের অবস্থা খুব শোচনীয়।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে আপাতত দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হলেও রাজধানীর বাজারে এরই মধ্যে তার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। কোথাও দাম বেড়েছে, কোথাও রুটির সরবরাহ কমেছে, আবার কোথাও একই দাম রেখে ওজন কমানোর প্রস্তুতি চলছে। এখন রবিবারের বৈঠকে ব্যবসায়ীরা কী সিদ্ধান্ত নেন, সেটিই দেখার বিষয়।