‘সিঙ্গেল লাইনের’ ফাঁদে রেল

সিঙ্গেল ট্র্যাকের কারণে রেলপথে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে যাত্রীদের বেশি সময় লাগছে। একটি ট্রেন চলাচলের সময় বিপরীত দিকের ট্রেনকে স্টেশন বা লুপে অপেক্ষা করতে হয়। ফলে ট্রেনের যাত্রায় বাড়তি সময় যুক্ত হচ্ছে, ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা। এ পরিস্থিতি কমাতে ডাবল লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও রেলওয়ে বলছে, এ ক্ষেত্রে বাজেটই সবচেয়ে বড় বিষয়।

রেলওয়ের তথ্যমতে, দেশের ২ হাজার ৮৮৪ দশমিক ৬৭ রুট কিলোমিটার রেলপথের মধ্যে ডাবল ট্র্যাক রয়েছে মাত্র ২১৫ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার। বাকি ২ হাজার ৬৬৯ দশমিক ২১ কিলোমিটারই সিঙ্গেল লাইন। অর্থাৎ, বাংলাদেশ রেলওয়ের অধীনে মাত্র ৮ শতাংশ রুটে ডাবল ট্র্যাক রয়েছে বা রুটের কোনও অংশ ডাবল ট্র্যাক।

রেলের কর্মকর্তারা বলছেন, সিঙ্গেল লাইনে একই সময়ে বিপরীত দিকের দুটি ট্রেন চলাচল করতে পারে না। একটি ট্রেনকে চলাচলের সুযোগ দিতে অন্য ট্রেনকে স্টেশন বা লুপে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। ফলে ট্রেনের যাত্রার সময় বেড়ে যায়। সিঙ্গেল লাইনের কারণে বিভিন্ন সময় ট্রেনকে ১০ থেকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ট্রেনের গড় গতি ঘণ্টায় ৩২ কিলোমিটার। মালবাহী ট্রেনের গড় গতি ঘণ্টায় প্রায় ২৩ কিলোমিটার। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-রাজশাহীসহ বিভিন্ন রুটে সিঙ্গেল লাইনের কারণে ট্রেন দেরিতে গন্তব্যে পৌঁছায়। বিশেষ করে ইন্টারসিটি ট্রেনকে ছোট স্টেশনে দাঁড় করিয়ে বিপরীত দিকের ট্রেন চলাচলের সুযোগ দেওয়া হয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাজিম উদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকেই ট্রেনে যাতায়াত করেন। তিনি জানান, যমুনায় রেল সেতু হওয়ায় সেতু এলাকায় ট্রেনের গতি বেড়েছে। কিন্তু দুই প্রান্তেই সিঙ্গেল লাইন রয়েছে। এ কারণে ক্রসিং থাকে। অর্থাৎ, একটি ট্রেন অন্য একটি ট্রেনের জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় অপেক্ষা করে। এই ক্রসিংয়ের কারণে বাড়তি সময় প্রয়োজন হয়। লাইনগুলো সব জায়গায় ডাবল লাইনের হলে এই সমস্যা হতো না। তখন ট্রেনের গতি আরও বাড়ত।

বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পূর্বাঞ্চলে ১ হাজার ৩৯০ দশমিক ৭৮ কিলোমিটার রেলপথের মধ্যে ডাবল ট্র্যাক রয়েছে ১১৯ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার। এই অঞ্চলে সিঙ্গেল লাইন ১ হাজার ২৭১ দশমিক ৩৩ কিলোমিটার।

পশ্চিমাঞ্চলে মোট রেলপথ ১ হাজার ৪৯৩ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার। এর মধ্যে ডাবল ট্র্যাক ৯৬ দশমিক ০১ কিলোমিটার এবং সিঙ্গেল লাইন ১ হাজার ৩৯৭ দশমিক ৮৮ কিলোমিটার।

বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক (পশ্চিম) এ এমএম শাহনেওয়াজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা যাত্রী ভোগান্তি কমাতে ডাবল লাইন করার পরিকল্পনা করছি। এই ক্ষেত্রে বাজেট একটি বড় বিষয়। আমাদের কাজ চলমান, অনেক এলাকায় সম্প্রতি ডাবল লাইন করা হয়েছে। বাজেট অ্যালোকেশন হলে আমাদের কাজ এগিয়ে যায়।’

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ১২৪ দশমিক ৮০ কিলোমিটার ডাবল ট্র্যাক নির্মাণাধীন। এছাড়া টঙ্গী-আখাউড়া-লাকসাম-চট্টগ্রাম এবং টঙ্গী-আখাউড়া-কুলাউড়া-শাহবাজপুর রুটে ডুয়াল গেজ ও ডাবল ট্র্যাক করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের মাস্টার প্ল্যানেও সিঙ্গেল লাইনকে ডাবল ট্র্যাকে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের দেওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, ডাবল ট্র্যাক সাধারণত সিঙ্গেল ট্র্যাকের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি সক্ষমতা রাখে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটেও রেলপথের সিঙ্গেল লাইন কমিয়ে ডাবল লাইন ও ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। এ অর্থবছরে রেলপথ খাতে ৯ হাজার ৯৪০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন, ঢাকা-টঙ্গী সেকশনে তৃতীয় ও চতুর্থ ডুয়েলগেজ লাইন এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর সেকশনে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

আগের পরিকল্পনার মধ্যে থাকা ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের ১২৪ দশমিক ৮০ কিলোমিটার ডাবল ট্র্যাক নির্মাণও চলমান রয়েছে। এছাড়া টঙ্গী-আখাউড়া-লাকসাম-চট্টগ্রাম এবং টঙ্গী-আখাউড়া-কুলাউড়া-শাহবাজপুর রুটে ডুয়াল গেজ ও ডাবল ট্র্যাক করার পরিকল্পনাও রয়েছে।