দেশের পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীদের নিয়ে আলোচনা হলেও সমতলের আদিবাসীরা এখনও অনেকটাই আড়ালে। জমি দখল, মজুরি বৈষম্য, নারী নির্যাতন ও উচ্ছেদের মতো ঘটনায় তারা নিয়মিত ভুক্তভোগী হলেও, ন্যায়বিচার পাওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাদের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত; এমন চিত্র উঠে এসেছে মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণে। উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুর এবং উত্তর-পশ্চিমের সাঁওতাল, মুন্ডা, ওঁরাও, মাহাতো জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, থানায় কীভাবে অভিযোগ করতে হয়, আইনি সহায়তা কোথায় পাওয়া যায় বা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে কীভাবে আবেদন করতে হয়; এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই অধিকাংশের।
নওগাঁর নিয়ামতপুরের এক সাঁওতাল কৃষকের ভাষ্য, ‘মারামারি হইলে আমরা মাতব্বরের কাছে যাই। থানা-পুলিশ অনেক দূরের ব্যাপার মনে হয়। কাগজপত্র কী লাগে, কই যাইতে হয়, জানি না’।
আদিবাসীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে বাধা কোথায়
নিজের ভিটা থেকে উচ্ছেদ হলে কিংবা সহিংসতার শিকার হলে একজন আদিবাসী কোথায় যাবেন? অভিযোগ করতে হলে যেতে হয় থানায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু ভয় এবং বঞ্চনার শিকার হতে হবে, এমন চিন্তা থেকে থানায় যেতে অনীহা আদিবাসীদের মধ্যে। কেউ কেউ মনে করেন, তাদের অভিযোগ সঠিকভাবে না শুনেই একটা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হবে।
বিভিন্ন সংস্থা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীদের ঘটনাগুলো লিপিবদ্ধ হয়ে পরিসংখ্যান থাকলেও সমতলের আদিবাসীদের নিয়ে কোথাও কোনও তথ্য নেই আলাদাভাবে।
২০১৬ সালে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্মে তিন সাঁওতাল হত্যার ঘটনায় আজও বিচার হয়নি। কাপেং ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বিচারহীনতা অপরাধীদের উৎসাহিত করছে।
এই বছরের এপ্রিল মাসেও বাগদাফার্ম এলাকায় জমি ফেরত ও তিন সাঁওতাল হত্যার বিচারের দাবিতে আয়োজিত সমাবেশেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ফিলিমন বাস্কে জানান, ২০১৬ সালের হত্যাকাণ্ডের বিচার ও পৈতৃক জমি ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
অভিযোগ করার আগেই বাধা
অতীতের পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা গেছে, এ ধরনের অপরাধ বহু বছর ধরে সংঘটিত হলেও নানা প্রতিবন্ধকতায় বিচার পাওয়ার হার শূন্যের ঘরে। দেশের কয়েকটি আদিবাসী পাড়ায় অবস্থানরত মানুষের সঙ্গে কথা বলে এর বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতার কথা জানা গেছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ অভিযোগ জানানোর আগেই পরিবারের বাধা, স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার কারণে নিপীড়নের মুখোমুখি হলেও অনেক কথা তারা বলতে পারে না। এবং আদিবাসীবান্ধব পুলিশ ব্যবস্থা না থাকা।
সমতলের একটি আদিবাসী পাড়ায় ২০ থেকে ৩০টি পরিবার থাকে। চারপাশে থাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর গ্রাম। কোনো নারী বাইরের কারও দ্বারা নির্যাতনের শিকার হলে প্রথম বাধা আসে নিজেদের সমাজ থেকেই।
নওগাঁর এক আদিবাসী নারী জানান, কোনও ঘটনা ঘটলে প্রথম আঘাত আসে সমাজের ওপর। অভিযোগ জানাতে গেলে পুরো পাড়ায় হামলা হতে পারে। জমি থেকে উচ্ছেদ হতে পারেন তারা। ইটভাটায় কাজ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই মাতব্বর বা পরিবার বলে, ‘মুখ বন্ধ রাখো, গ্রাম বাঁচবে।’
অনেক ঘটনা ফৌজদারি অপরাধ হলেও তা থানা পুলিশ পর্যন্ত গড়ায় না। গ্রামের সালিশে মিটিয়ে ফেলা হয়। সেখানে ভুক্তভোগী নারী হলেও তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ওই নারীর মতে, এটি দীর্ঘদিনের স্থায়ী বন্দোবস্ত।
আদিবাসী কমিউনিটির সেচ্ছাসেবক পপি রানী ভুমিজ সিং বলেন, নির্যাতনের ঘটনায় বিচার তেমন পাওয়া যায় না।
থানায় যেতে অনীহা
থানায় যেতে উৎসাহী না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে ওই নারী বলেন, ‘আমরা সবাই তো বাংলা ঠিকমতো বলতে পারি না। থানায় ভাষা বুঝতে পারবে এমন লোক নেই।’ এজন্য গ্রামের একজন পুরুষকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘থানার প্রতি আমাদের একটা ভয় কাজ করে।’
মেডিক্যাল পরীক্ষাও বড় বাধা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের আদিবাসী নারীদের নিজ গ্রাম থেকে জেলা সদর হাসপাতালে যেতে তিন থেকে চার ঘণ্টা লাগে। অনেকের সঙ্গে যাওয়ার টাকা থাকে না। সঙ্গে যাওয়ার পুরুষ অভিভাবকও থাকে না। হাসপাতালে গিয়ে কার সঙ্গে কথা বলতে হবে, কোথায় পরীক্ষা করতে হবে, সে সম্পর্কেও অনেকের স্পষ্ট ধারণা থাকে না।
থানার বিষয়ে আদিবাসীদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের এআইজি এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কেউ যদি অভিযোগ বা মামলা দায়ের করতে চান, সেজন্য কিছু ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তারা যখন থানায় অভিযোগ নিয়ে আসেন তখন তাদের ভাষা যদি দাফতরিক ভাষা থেকে ভিন্ন হয়, তাহলে স্থানীয় দোভাষীর মাধ্যমে অভিযোগ লিপিবদ্ধ বা মামলা রুজু করা হয়। মামলা রুজুর আগে সেই দোভাষীর সাহায্যে অভিযোগকারীকে পুরোটা পড়ে শোনানো হয়, তারপর মামলা রুজু হয়।
আদালতে মামলা চালানো কঠিন
একটি নারী নির্যাতনের মামলা চলতে গড়ে তিন থেকে পাঁচ বছর লাগে। একজন দিনমজুর আদিবাসী নারীর পক্ষে প্রতি মাসে দুই থেকে তিনবার আদালতে হাজিরা দেওয়া কঠিন। এর সঙ্গে থাকে আইনজীবীর ফি ও যাতায়াতের খরচ।
সরকারি লিগ্যাল এইড আছে। কিন্তু জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে আদিবাসী নারীদের জন্য আলাদা সহায়তা ডেস্ক নেই। আদালতে সাক্ষ্য দিতে গেলেও সমস্যার শেষ হয় না। কাঠগড়ায় তাকে বাংলায় এবং আইনি ভাষায় জেরা করা হয়। অনুবাদক থাকে না। মামলা করার পর নিরাপত্তাহীনতাতেও ভোগেন ভুক্তভোগীরা। নিরাপত্তা না পেয়ে তাদের নিজ ঠিকানা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়।
ন্যায়বিচার প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট প্রমিলা টুডো বলেন, দেশে শুধু আদিবাসীরাই ন্যায়বিচার পাচ্ছে না এমন নয়, সামগ্রিকভাবেই ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে ঘাটতি রয়েছে। তবে অনগ্রসর জনগোষ্ঠী হিসেবে আদিবাসীদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও বেশি।
তিনি বলেন, ‘এখানে ভাষাগত সমস্যা আছে। জমি সংক্রান্ত বিষয়ে যে ডকুমেন্ট উপস্থাপন করতে হয়, সেগুলো দিতে সমস্যা হয়। অনেক সময় ডকুমেন্ট সঠিকভাবে করা থাকে না। আইনের নিজস্ব নিয়ম আছে তথ্য নেওয়ার। সেইভাবে না থাকলে বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।’
তিনি আরও বলেন, সঠিক বিচার থাকলেও অনেক সময় প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা ব্যক্তির প্রভাবে সেই বিচার প্রক্রিয়া নষ্ট হয়ে যায়। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে যেমন নাগরিককে সহায়তা করতে হবে, তেমনি নাগরিককেও সঠিক তথ্য দিয়ে রাষ্ট্রের কাছ থেকে ন্যায়বিচার আদায় করে নিতে হবে।
বিদ্যমান ব্যবস্থাতেই সমাধান সম্ভব
গবেষক এবং পরিবেশ ও আদিবাসী অধিকার আন্দোলনকর্মী পাভেল পার্থ বলেন, সরকার উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে গরিব ও ভূমিহীন মানুষের আইন ও বিচার পাওয়ার অধিকারের জন্য কর্মকর্তা নিয়োগ করেছে। বিনামূল্যে বিচার পাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু আদিবাসীরা এই ব্যবস্থায় খুব একটা যেতে পারেন না। বড় বিষয় হলো, অনেক আদিবাসী এ সম্পর্কে জানেনই না।
তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের বার্ষিক বাজেট সভা, তথ্য অবহিতকরণ সভা কিংবা উপজেলা ও জেলার তথ্য অবহিতকরণ প্রক্রিয়ায় আদিবাসীরা অনুপস্থিত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে অদৃশ্য। তাই নতুন কোনো কাঠামো বা নতুন কমিশন তৈরি করলেই তা কার্যকর হবে না।
পাভেল পার্থ বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালত আছে। ইউনিয়ন পরিষদে ১৩টি স্থায়ী কমিটিও আছে। এসব কমিটির কার্যক্রম দেখলে কোথাও আদিবাসীদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয় না। উপজেলা ও জেলাতেও একই পরিস্থিতি রয়েছে।
তার মতে, বিদ্যমান কাঠামোর মধ্য দিয়েই এসব প্রতিষ্ঠানকে সক্ষম ও দায়িত্বশীল করা সম্ভব। আদিবাসীদের ওপর নিপীড়ন, নির্যাতন ও ভূমি দখলের তথ্য তাদের জানতে হবে। আদিবাসীদের সমাজ কাঠামো ও প্রথাগত নিয়ম সম্পর্কেও তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তারা সচেতন ও সংবেদনশীল হলে বিদ্যমান সংবিধান, আইনি কাঠামো ও সংশ্লিষ্ট নীতিমালার মধ্য দিয়েই একজন বাঙালির মতো আদিবাসীরও ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব।
তিনি বলেন, কিন্তু সেটি ঘটছে না। আদিবাসীদের ক্ষেত্রে যে কাজ ও নিয়ম প্রযোজ্য, রাষ্ট্রের অনেক আইন ও নীতিতে তার স্বীকৃতি নেই। রাষ্ট্রকে বিষয়টি স্বীকৃতি দিতে হবে। স্বীকৃতি দিলে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতেও তা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
পাভেল পার্থ বলেন, আদিবাসীদের বিচারহীনতার পেছনে বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো, আইন ও নীতি প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের দায়িত্বহীনতা রয়েছে। সেখানে অসংবেদনশীল প্রক্রিয়াও আছে। রাষ্ট্রীয় কাঠামো আদিবাসী বিষয়ে সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনা সম্ভব।
এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া উল্লেখ করে তিনি বলেন, আদিবাসীদের জাতিগত স্বীকৃতি, সামাজিক মালিকানা ও প্রথাগত অধিকারের বিষয়গুলো রাষ্ট্রকে আইনগত স্বীকৃতি দিতে হবে। এতে আদিবাসী প্রশ্নে রাষ্ট্রের কাঠামোর অসংবেদনশীল আচরণ বদলানো সম্ভব।
সংবিধান বিশেষ বিধানের সুযোগ রেখেছে
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অমিত দাস গুপ্ত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আদিবাসীদের ক্ষেত্রে মূল জনগোষ্ঠী থেকে তাদের কিছুটা আলাদা হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। প্রথা ও সংস্কৃতিগত ভিন্নতার কারণে অনেক সমস্যা তৈরি হয়। এর সঙ্গে ভাষাগত, ভূখণ্ডজনিত ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যও রয়েছে। ফলে মূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সমতার জায়গায় এসে প্রতিযোগিতা করা তাদের জন্য কঠিন। তবে সংবিধান তাদের জন্য বিশেষ বিধান করতে কোনো বাধা রাখেনি। রাষ্ট্র চাইলে তা করতে পারে।
অমিত দাস গুপ্ত বলেন, সংবিধানে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। ২৩ক অনুচ্ছেদে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কথা বলতে গিয়ে বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী, গোত্র ও সম্প্রদায়ের কথা বলা হয়েছে। সাংস্কৃতিক দিক থেকে জাতিসত্তার সংজ্ঞায় তাই ‘আদিবাসী’ শব্দটি আসেনি।
তিনি বলেন, সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের চোখে সমতার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান। ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ বা জন্মস্থানভেদে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য না করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়নে রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করা হয়নি।
২৯ অনুচ্ছেদে সরকারি কর্মে নিয়োগের ক্ষেত্রেও একই বিধান রয়েছে। এসব অনুচ্ছেদ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যাদের আদিবাসী হিসেবে চিনি বা জানি, তাদের জন্য রাষ্ট্র আইনি সুরক্ষা দিতে পারে। সমতার বিধান রাষ্ট্রকে আদিবাসীদের জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়নে বাধা দেয় না।
অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করা, নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইনের আওতায় আনা বিচারহীনতা দূর করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়। কোনো জনগোষ্ঠীর মানুষ যেন এই ধারণা নিয়ে বসবাস না করেন যে তার অভিযোগ গুরুত্ব পাবে না বা মামলা করেও শেষ পর্যন্ত কোনো প্রতিকার পাওয়া যাবে না।