একটা সময় সমতলের সাঁওতাল, ওরাঁও, মুন্ডা, মাহাতো, হাজং, গারো, খাসি ও রাজবংশীসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি শুধু ‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায়’ হিসেবে ছিল না। তাদের ছিল নিজস্ব গ্রাম, ভূমি-ব্যবস্থা, কৃষি, বনজ সম্পদের ব্যবহার, সামাজিক নেতৃত্ব, আচার-অনুষ্ঠান ও স্থানীয় অর্থনীতি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমতলের অনেক অঞ্চলে তাদের দৃশ্যমান উপস্থিতি ও ক্ষমতা কমেছে। বাংলা ভাষাভাষী সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর বিস্তার, নতুন বসতি, কৃষির সম্প্রসারণ, বাজার ও যোগাযোগব্যবস্থার বিকাশের সঙ্গে আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো ক্রমে বৃহত্তর বাঙালি সমাজের সঙ্গে মিশে যায়।
একসময় যে গ্রাম বা অঞ্চলে আদিবাসী সমাজ স্থানীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ বা দৃশ্যমান সামাজিক শক্তি ছিল, সেখানে তারা পরে সংখ্যালঘু হয়ে পড়ে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সাঁওতাল, ওরাঁও, মাহাতো ও মুন্ডা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সমতলের আদিবাসীদের এই অদৃশ্যমানতা মূলত ‘মানুষ কমে যাওয়ার’ গল্প নয়, এটি দৃশ্যমান ক্ষমতা কমে যাওয়ার গল্প।
তারা এখনও আছে; সাঁওতাল পাড়া, মুন্ডা বসতি, ওরাঁও গ্রাম ও গারো অধ্যুষিত অঞ্চলে। আছে তাদের ভাষা, উৎসব, গান, ধর্মীয় আচার ও স্মৃতি। কিন্তু ভূমির ওপর নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, ইতিহাসের বয়ান এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জায়গায় তাদের অবস্থান সংকুচিত হয়েছে। তাই বিষয়টিকে শুধু ‘আদিবাসীরা কেন পিছিয়ে?’—এই প্রশ্নে না দেখে, যে সামাজিক, ভূমি ও রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ায় একসময় দৃশ্যমান একটি জনগোষ্ঠী ক্রমে প্রান্তিক ও অদৃশ্য হয়ে পড়েছে, সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশে বৈষম্য নিয়ে অনেক কথা হয়। কিন্তু সমতলের আদিবাসীদের বৈষম্য নিয়ে কথা হয় কম। কারণ এই বৈষম্য অনেক ক্ষেত্রেই চোখে দেখা যায় না, এটি প্রতিদিনের অভ্যাসের সঙ্গে মিশে আছে। রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহের ১৫টি আদিবাসী পাড়ায় কথা বলে পাঁচ ধরনের বৈষম্যের চিত্র পাওয়া গেছে।
ভূমি ও অর্থনৈতিক বৈষম্য: ‘তোমার জমি, কিন্তু দলিল আমার’
এটি সবচেয়ে পুরনো এবং গভীর বৈষম্যগুলোর একটি। সমতলের আদিবাসীরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম যে জমি চাষ করেছেন, তার অনেকেরই দলিল নেই। ব্রিটিশ আমলের সিএস রেকর্ডে তাদের নাম ওঠেনি। কারণ তখন জরিপকারীরা তাদের ভাষা বুঝতেন না, আর তারাও জরিপ কী জিনিস তা বুঝতেন না। এই সুযোগে একজন সাঁওতাল পরিবার ৩০ বছর ধরে যে জমি চাষ করছে, হঠাৎ একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি দলিল দেখিয়ে দাবি করেন, ‘এটা আমার কেনা জমি।’
আদিবাসী পরিবারটির কাছে দলিল নেই, আছে শুধু গ্রামের মানুষের সাক্ষ্য। কিন্তু আদালতে সাক্ষ্যের চেয়ে দলিলের মূল্য বেশি।ফলে তারা একসময় বর্গাচাষি, পরে দিনমজুর হয়ে যায়। নওগাঁর নিয়ামতপুরে এখনও একই কাজের জন্য একজন বাঙালি শ্রমিক ৫০০ টাকা পেলেও একজন আদিবাসী নারী শ্রমিক পান ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। কারণ হিসেবে বলা হয়, ‘তোমরা তো এমনিতেই কাজ পাও না।’
সমতলের আদিবাসী সংস্কৃতির ভিত্তি ছিল দুটি; বন ও জমি। গত ৩০ বছরে দুটোই হাতছাড়া হয়েছে। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৪ সালের ভূমি সংস্কার অধ্যাদেশ এবং বন বিভাগের সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের পর সমতলে আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী জমি ব্যক্তি মালিকানায় চলে যায়। সাঁওতালরা আগে যে শালবনে খাস জমিতে চাষ করত, সেই বন এখন লিজ দেওয়া হয়। জমির দলিল নেই, কারণ তাদের জমি ছিল মৌখিক, সামাজিক মালিকানায়। জমি হারিয়ে তারা হয়ে গেছে দিনমজুর। নওগাঁর পত্নীতলা বা দিনাজপুরের বিরলে গেলে দেখা যায়, একসময়ের কৃষক সাঁওতাল পরিবার এখন ইটভাটায় কাজ করে। যখন অর্থনীতি ভাঙে, তখন সংস্কৃতি টেকে না।
নাটোরের বাগতিপাড়ার লগেন সরেন বলেন, ‘আগের যে আইন বা প্রথা ছিল, ওই প্রথা অনুসারে আমাদের জন্য তো কোনও আইন বা আদিবাসীদের মূল্যায়ন কোনও সরকারই করেনি। সমতলের আদিবাসীদের জমির মালিকানা প্রচলিত ভূমি রেজিস্ট্রেশন নীতিমালার আওতায় নির্ধারণ করা হয়। আমাদের জন্য দলিল, পর্চা, নাম জারি সবই প্রযোজ্য। এমনিতেই আমরা সংখ্যালঘু। ভূমির অধিকার থেকে সমতলের আদিবাসীরা আসলে বঞ্চিত হচ্ছে। কেবল নারীর ক্ষেত্রে জিনিসটা সীমাবদ্ধ না, ভূমি অধিকারের ক্ষেত্রে আসলে সমতলের আদিবাসী সবাই বঞ্চিত হচ্ছে।’
গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, আমরা যখন আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলের কথা বলি, তখন শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামকে বুঝি। এটা ভুল। দুই-একটা জেলা বাদে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় আদিবাসী আছে। বৃহত্তর রংপুর, রাজশাহী, সিলেট, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পটুয়াখালীসহ সর্বত্র। এই প্রতিটি অঞ্চলে চিত্র একই। আদিবাসী যে এলাকায় আছে, সেই এলাকার সরকারি ভূমি অফিসগুলোই তাদের ভূমি সুরক্ষায় সবচেয়ে বেশি উদাসীন। তাদের ভূমির রেকর্ড ঠিক থাকে না। আর অধিকাংশ আদিবাসী পরিবারের নিজস্ব দলিলপত্রও খুব ভালোভাবে সংরক্ষিত থাকে না। এই দুর্বলতাকে পুঁজি করে কী হয়? জাল দলিল তৈরি হয়, জবর দখল হয়। আপনারা বিশাল বিশাল বেদখলের যে ঘটনাগুলো শোনেন, তার পেছনে এই একটাই কারণ। ভূমি অফিসকে আরো অনেক বেশি সতর্ক এবং সংবেদনশীল হওয়া জরুরি ছিল।
তিনি বলেন, অথচ আইন কিন্তু আছে। আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ আছে, যেটা ২০০৪ সালে আপডেট হয়েছে। আমরা যেটাকে বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন বলি। এই আইনের ৯৭ ধারায় বাংলাদেশের আদিবাসীদের নামের তালিকা আছে। সেখানে স্পষ্ট বলা আছে, আদিবাসীর জমি বিক্রি, বণ্টন বা বিনিময় করতে হলে আদিবাসীর কাছেই করতে হবে এবং জেলা প্রশাসকের লিখিত অনুমতি লাগবে। কিন্তু বাস্তবে কী হয়? এই অনুমতি নেওয়া হয় না। আইনটি সরাসরি লঙ্ঘন করা হয়।
তার মতে, এখানেই শেষ নয়। আরেকটি বড় সমস্যা হলো আমাদের রাষ্ট্র শুধু ব্যক্তিগত মালিকানা বোঝে, কিন্তু আদিবাসীদের ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রথাগত আইন দিয়ে চলে। তাদের জমি শুধু ব্যক্তির নয়, সমাজের। যেমন গারো বা মান্দি সম্প্রদায়ে ‘আখিং’ বলে একটি বিষয় আছে। আখিং মানে একটি মাহারি বা বংশের জমি। যেমন ‘ব্রং মাহারির’ জমি। সেটা সারা দেশে যেখানেই থাকুক, সেটা ব্রংদেরই জমি। আবার তাদের নিজস্ব শাসন কাঠামো আছে। যেমন সাঁওতালদের আছে মানঝি পরিষদ। গ্রামের প্রধান হলেন মানঝি। এই পরিষদই ভূমি ব্যবস্থাপনা করে। পার্বত্য চট্টগ্রামে এই প্রথাগত কাঠামোর স্বীকৃতি আছে, সেখানে সার্কেল চিফ এবং পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের আইনে ভূমি পরিচালিত হয়। কিন্তু সমতলে এর কোনো স্বীকৃতি নেই। ফলে প্রচলিত ভূমি অফিস দিয়ে এই সামাজিক ভূমি ব্যবস্থাপনা বোঝা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, প্রথমত, সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে, যারা এই জটিলতা বুঝবে। দ্বিতীয়ত, ভূমি কমিশন না হলেও, আমাদের সরকারি ভূমি অফিসগুলোকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আমাদের ভূমি কর্মকর্তাদের আদিবাসীদের প্রথাগত আইন সম্পর্কে জানতে হবে এবং রাষ্ট্রকে এই প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আইনগত স্বীকৃতি দিতে হবে।
শিক্ষায় বৈষম্য
বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা সবার জন্য বাধ্যতামূলক। কিন্তু সমতলের আদিবাসী শিশুর জন্য স্কুলে যাওয়া অনেক ক্ষেত্রে নিজের পরিচয় লুকানোর অভিজ্ঞতা। সম্প্রতি মোহনপুরে সাঁওতাল শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি না করার অভিযোগ সামনে এলে তদন্তে নামে প্রশাসন। রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের কয়েকটি শিশুকে ভর্তি না করার অভিযোগ ওঠে।
অভিভাবকদের দাবি, ভর্তি না নেওয়ার জন্য নানা অজুহাত দেওয়া হয়। তবে তারা মনে করেন, শুধু আদিবাসী হওয়ার কারণেই তাদের সন্তানদের ভর্তি নিতে গড়িমসি করেছে কর্তৃপক্ষ। পরে ইউএনওর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি বদলায়। স্কুলে ঢুকলেও ভাষার প্রশ্নটি থেকে যায়। সরকার পাঁচটি আদিবাসী ভাষায় বই ছাপিয়েছে, কিন্তু তার একটিও সমতলের ভাষা নয়। সাঁওতালি, কুড়ুখ, মুন্ডারি ও কোচ ভাষায় কোনও বই নেই। ফলে একটি সাঁওতাল শিশু প্রথম দিন স্কুলে গিয়ে দেখে, তার মায়ের ভাষার কোনও অক্ষর নেই। তার দেবতার নাম নেই, এমনকি তার গ্রামের নামের বানানও ভুল।
স্কুলে ভর্তির সময় অনেক শিক্ষক তাদের নামও বদলে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ‘বাস্কে মুর্মু’ হয়ে যায় ‘বাবুল হোসেন’ বা ‘বাস্কে’। কারণ হিসেবে বলা হয়, কম্পিউটারে আদিবাসী নাম লিখতে সমস্যা হয়। ফলে শিশুটি ছোটবেলা থেকেই শেখে, তার আসল নাম ‘লজ্জার’। এই ধরনের হস্তক্ষেপের কারণে সমতলে আদিবাসী শিশুদের প্রাথমিকের পর ঝরে পড়ার হার জাতীয় গড়ের প্রায় দ্বিগুণ বলে ধারণা করা হয়।
সমতলের আদিবাসী ভাষাগুলো এখন সবচেয়ে বিপন্ন। বাংলাদেশে আদিবাসীদের ভাষা বিলুপ্ত হচ্ছে খুব নীরবে, কিন্তু খুব দ্রুত। ইউনেস্কোর হিসাবে বিশ্বে প্রতি ২ সপ্তাহে ১টি ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে, আর বাংলাদেশের ৪১টির বেশি আদিবাসী ভাষার মধ্যে অন্তত ১৪টি এখন মহাবিপন্ন। ২০১০ সালের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনে ভাষা রক্ষার কথা বলা আছে, কিন্তু মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা আজও কার্যকর হয়নি। ২০১৭ সাল থেকে সরকার ৫টি আদিবাসী ভাষায় প্রাক-প্রাথমিকে বই দিয়েছে - চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও চাক। এর মধ্যে সমতলের একটিও নেই। অর্থাৎ, সমতলের কোনো শিশু তার মাতৃভাষায় প্রথম শ্রেণিও পড়তে পারে না।
একজন ওঁরাও শিশু যখন স্কুলে যায়, প্রথম দিনই তাকে শিখতে হয় তার ভাষা "ভুল"। তার নাম, তার গ্রামের নাম, তার দেবতার নাম - কোনোটাই বইতে নেই। তখন পরিবারই সিদ্ধান্ত নেয় - "বাংলা শেখ, না হলে চাকরি পাবি না।" ভাষা হারানোর শুরুটা এখানেই।
সাদরি বা সাঁওতালি ভাষা এখনো টিকে আছে, কিন্তু লিখিত রূপ নেই, শিশুরা স্কুলে বাংলা পড়ে। বাড়িতে সাঁওতালি বললেও লিখতে পারে না। কুড়ুখ (ওঁরাও) ইউনেস্কোর তালিকায় বিপন্ন। বাংলাদেশে ১০ হাজারেরও কম মানুষ এখন এই ভাষায় সাবলীল। মুন্ডারি, কোদা, মাহাতো কুর্মালি এই ভাষাগুলোতে এখন শুধু বয়স্করা কথা বলেন। নাতি-নাতনিরা বোঝে, কিন্তু উত্তর দেয় বাংলায়।
নাটোরের সিংড়া উপজেলার আদিবাসী শিক্ষার্থী লাবনী এক্কা বলেন, আদিবাসী শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে থাকার পেছনে শুধু আর্থিক সমস্যাকে দায়ী করা ঠিক হবে না। আর্থিক সমস্যা কম-বেশি সবারই আছে। আসল সমস্যা হলো পারিবারিক সচেতনতা ও চেষ্টার অভাব। অনেক পিতা-মাতা নিজেরা শিক্ষিত না হওয়ায় সন্তানকে ছোটবেলা থেকে পড়ালেখার প্রতি সঠিকভাবে উৎসাহিত করতে পারেন না। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে বাধা আরও বেশি। আমাদের এলাকায় কলেজগুলো বাড়ি থেকে ৭ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে। একজন আদিবাসী মেয়ে যখন একা কলেজে যাতায়াত করে, তখন তাকে পাড়া-প্রতিবেশীর নানা ধরনের নেতিবাচক সমালোচনার শিকার হতে হয়। এই সামাজিক চাপে অনেক মেয়েই উচ্চশিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে।
তিনি বলেন, তবে আশার কথা হলো, এখন অনেক বাবা-মা সচেতন হচ্ছেন। তারা বুঝতে পারছেন সন্তানের ভবিষ্যৎ নষ্ট করা যাবে না। আগে আশঙ্কা ছিল শিক্ষার কারণে নিজস্ব ভাষা হারিয়ে যাবে, কিন্তু এখন আমরা বুঝছি শিক্ষিত হলেই বরং নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধরে রাখা ও লিপিবদ্ধ করা সম্ভব। বর্তমানে একটি নতুন সংকট দেখা দিচ্ছে - মেয়েরা এগিয়ে গেলেও ছেলেরা পিছিয়ে যাচ্ছে। অল্প বয়সে বন্ধুদের প্রভাবে নেশাগ্রস্ত হওয়া এবং দ্রুত টাকা উপার্জনের লোভে তারা পড়ালেখা ছেড়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় ২০১১ সালে সংবিধানে ২৩-এর ‘ক’ ধারা যুক্ত করা হয়। আপনি সংবিধানে দেখবেন ২৩-এর ‘ক’, সেখানে বলা হয়েছে, তবে ‘আদিবাসী’, শব্দটি তারা বলেনি, কিন্তু এটা বোঝা যায় যে তাদেরই বলা হয়েছে। তারা বলেছে, ‘রাষ্ট্র উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।’
তিনি বলেন, বলা হয়েছে আদিবাসীদের শব্দ, যদিও উপজাতি এবং নৃগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, তাদের অনন্য বৈশিষ্ট্যের সংস্কৃতি বিকাশ, আঞ্চলিক সংস্কৃতি বিকাশ এবং উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা করিবেন। কিন্তু আমরা চাচ্ছি আদিবাসীদের আত্মপরিচয় ও অধিকার। তাদের ভাষা আছে, বাংলার বাইরেও মাতৃভাষা আছে। তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি আছে, জীবনধারা আছে। তাদের ভূমির অধিকার ও ভূমি মালিকানার সংস্কৃতি ভিন্ন। আমরা অনেক সময় বলি, ভূমির ওপর আমাদের যৌথ মালিকানা আছে, কালেক্টিভ রাইটস আছে। কিন্তু কালেক্টিভ রাইটস সংবিধানে স্বীকৃত নয়। এই বিষয়গুলোর স্বীকৃতি আমরা চেয়েছি। স্বীকৃতি পৃথিবীর অনেক দেশের সংবিধানে আছে। সংবিধানে স্বীকৃতি থাকলে আপনি সংবিধানকে ধরে আইন প্রণয়ন করতে পারবেন, জাতীয় একটি আদিবাসী নীতি করতে পারবেন। তাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও স্বাস্থ্যের উন্নয়নের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য
এই বৈষম্য সবচেয়ে সূক্ষ্ম। এটি ঘটে হাটে-বাজারে, মানুষের চোখের ভাষায় এবং ধর্মীয় স্বীকৃতির ক্ষেত্রে। অনেক এলাকায় এখনও আদিবাসীদের দোকানে ঢুকতে দেওয়া হয় না, অথবা তাদের ছোঁয়া লাগলে পণ্য অপবিত্র হয় বলে মনে করা হয়। চায়ের দোকানে তাদের জন্য আলাদা কাপ রাখা হয়। অনেক জায়গায় এটিকে ‘আদিবাসী কাপ’বলা হয়। জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন বা চাকরির ফরমে ধর্মের ঘরে চারটি অপশন থাকে—ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান। সমতলের অধিকাংশ আদিবাসীর ধর্ম সারনা, সাংসারেক বা প্রকৃতি ধর্ম। এই ধর্ম লেখার কোনও জায়গা নেই। ফলে তাদের বাধ্য হয়ে ‘হিন্দু’ বা ‘খ্রিস্টান’ লিখতে হয়। অর্থাৎ কাগজে-কলমে তাদের নিজের ধর্মের অস্তিত্বই নেই।
আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সাংবিধানিক স্বীকৃতিকে ‘অতি জরুরি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন অ্যাডভোকেট প্রমিলা টুডো। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি না থাকায় প্রতিনিয়ত পরিচয় সংকট ও নানা ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে এই জনগোষ্ঠীকে।
তিনি বলেন, ‘সংবিধান বা রাষ্ট্র যদি আমাকে পরিচয় না দেয়, তখন আমি সব ক্ষেত্রেই নিজের পরিচয় দিতে দ্বিধায় ভুগব। আমার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আমি একজন আইনজীবী হওয়ার পরেও যখন বলি অ্যাডভোকেট প্রমিলা, তখন ক্লায়েন্ট আমার নামটা নিয়েই প্রশ্ন তোলে। রাষ্ট্রের মাধ্যমে যদি আমাদের পরিচয়টা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রচার করা হতো, তাহলে এই প্রশ্নের মুখে পড়তে হতো না।’
সংবিধানে ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’ বলা হলেও ‘আদিবাসী’ শব্দটি নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে করে বাঙালি জাতির মধ্যে আদিবাসীদের যে আলাদা সংস্কৃতি, ভাষা, সামাজিক কাঠামো আছে সেটা প্রকাশ পায় না। অনেকেই ভুল বোঝেন যে আদিবাসী স্বীকৃতি মানে রাষ্ট্রের কোনো অংশ দখল করা। আসলে বিষয়টি তা নয়, বরং নিজস্ব সংস্কৃতি ও পরিচয় নিয়ে দেশের নাগরিক হিসেবে মর্যাদার সাথে বাঁচা।
প্রতিষ্ঠানে বৈষম্য: কোটা আছে, কিন্তু সুবিধা নেই
সরকারি চাকরিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ কোটা রয়েছে। কিন্তু সমতলের আদিবাসীরা সেই কোটার সুবিধা প্রায় পান না। কোটা পেতে হলে জেলা প্রশাসকের সার্টিফিকেট লাগে। সেই সার্টিফিকেট পেতে হলে প্রমাণ করতে হয় যে আপনি আদিবাসী। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্রে যদি ধর্ম ‘হিন্দু’ লেখা থাকে, তাহলে সেই পরিচয় প্রমাণ করা কঠিন হয়ে যায়। কোটার তালিকায় সমতলের অনেক জাতির নামও নেই। ফলে কোটা কাগজে থাকলেও চাকরি পান না তারা।
ন্যায়বিচারে বৈষম্য: ‘তোমাদের জন্য আইন আলাদা না’
সংশ্লিষ্টদের মতে, যখন কোনও আদিবাসী নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে থানায় যান, তখন প্রথম প্রশ্ন করা হয়, ‘তোমরা তো এমনিতেই এমন করো।’ এই ধরনের মন্তব্য মামলার এজাহারকে দুর্বল করে দেয়। আদালতে তাদের ভাষার কোনও দোভাষী নেই। অথচ বাংলাদেশ একটি বহু জাতি, বহু ভাষা ও বহু সংস্কৃতির দেশ। বাংলাদেশে বাঙালি ভিন্ন অর্ধশতাধিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয়লাভের অধিকারী।’ সংবিধানের ২৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।’
২৮(৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।’ শেষোক্ত দফায় বর্ণিত ‘নাগরিকদের যে কোনও অনগ্রসর অংশের’ মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আদিবাসী বা সরকারি ভাষায় উপজাতি জনগোষ্ঠীগুলোকেও সরকারিভাবে নির্দেশ করা হয়।
এ ছাড়া সংবিধানের ২৯(২) অনুচ্ছেদের (ক) উপদফায় বলা হয়েছে, ‘নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশ যাহাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করিতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে তাহাদের অনুকূলে বিশেষ বিধান প্রণয়ন করা হইতে রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।’
আদিবাসীদের নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের মতে, এই অধিকারগুলোর দাবি নিয়ে অনেকে কথা বলেন ঠিকই। কিন্তু ক্ষমতার কাছে তাদের স্বর হারিয়ে যেতে যেতে ক্ষীণ হয়েছে। ভূমি হারানোর মধ্য দিয়ে কৃষিভিত্তিক জীবন দুর্বল হয়েছে এবং দারিদ্র্য বাসা বেঁধেছে। জীবিকার সন্ধানে অন্য এলাকায় যেতে হয়েছে। ধীরে ধীরে দুর্বল হয়েছে নিজস্ব পাড়া ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান। কমেছে ভাষা ও সংস্কৃতির ব্যবহার। একসময় তারা বৃহত্তর সমাজে মিশে গেছে। আর সেই প্রক্রিয়াই তাদের অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ আদিবাসী ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেত্রী রেবেকা সরেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আদিবাসীদের ভূমির বড় একটি অংশ আজ তাদের হাতছাড়া। নানা কৌশলে তাদের কাছ থেকে জমি নেওয়া হয়েছে। অনেকের কাছে জমির বৈধ দলিল থাকার পরও তারা নিজেদের জমিতে যেতে বা ভোগদখল করতে পারছেন না। ফলে হাজার হাজার একর জমি চলে গেছে অন্যদের দখলে। অর্থনৈতিক বৈষম্যের দিকটিও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দিনমজুরি করে যে আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন; তার ওপর কাজের সুযোগও কমে গেছে। সরকারি সহায়তা ও অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রেও বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, তবে এসব সমস্যার পাশাপাশি নিজেদের মধ্যেও কিছু বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। শিক্ষা, অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান, সময়ের সঠিক ব্যবহার এবং মাদকাসক্তি থেকে দূরে থাকা—এসব ক্ষেত্রে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সহজ-সরল ও উদার মানসিকতার সুযোগ যেন কেউ নিতে না পারে, সে জন্য তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগেই ভূমি, অর্থনীতি ও সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে তাদের এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।সম্পর্কে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগেই ভূমি, অর্থনীতি ও সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে তাদের এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অমিত দাস গুপ্ত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আদিবাসীদের ক্ষেত্রে মূল জনগোষ্ঠী থেকে তাদের কিছুটা আলাদা হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। প্রথা ও সংস্কৃতিগত ভিন্নতার কারণে অনেক সমস্যা তৈরি হয়। এর সঙ্গে ভাষাগত, ভূখণ্ডজনিত ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যও রয়েছে। ফলে মূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সমতার জায়গায় এসে প্রতিযোগিতা করা তাদের জন্য কঠিন। তবে সংবিধান তাদের জন্য বিশেষ বিধান করতে কোনো বাধা রাখেনি। রাষ্ট্র চাইলে তা করতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অমিত দাস গুপ্ত বলেন, সংবিধানে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। ২৩ক অনুচ্ছেদে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কথা বলতে গিয়ে বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী, গোত্র ও সম্প্রদায়ের কথা বলা হয়েছে। সাংস্কৃতিক দিক থেকে জাতিসত্তার সংজ্ঞায় তাই ‘আদিবাসী’ শব্দটি আসেনি।
তার মতে, অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করা, নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইনের আওতায় আনা বিচারহীনতা দূর করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়। কোনো জনগোষ্ঠীর মানুষ যেন এই ধারণা নিয়ে বসবাস না করেন যে তার অভিযোগ গুরুত্ব পাবে না বা মামলা করেও শেষ পর্যন্ত কোনো প্রতিকার পাওয়া যাবে না।
ন্যায়বিচার প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট প্রমিলা টুডো বলেন, দেশে শুধু আদিবাসীরাই ন্যায়বিচার পাচ্ছে না এমন নয়, সামগ্রিকভাবেই ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে ঘাটতি রয়েছে। তবে অনগ্রসর জনগোষ্ঠী হিসেবে আদিবাসীদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও বেশি।
তিনি বলেন, ‘এখানে ভাষাগত সমস্যা আছে। জমি সংক্রান্ত বিষয়ে যে ডকুমেন্ট উপস্থাপন করতে হয়, সেগুলো দিতে সমস্যা হয়। অনেক সময় ডকুমেন্ট সঠিকভাবে করা থাকে না। আইনের নিজস্ব নিয়ম আছে তথ্য নেওয়ার। সেইভাবে না থাকলে বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।’
তিনি আরও বলেন, সঠিক বিচার থাকলেও অনেক সময় প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা ব্যক্তির প্রভাবে সেই বিচার প্রক্রিয়া নষ্ট হয়ে যায়। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে যেমন নাগরিককে সহায়তা করতে হবে, তেমনি নাগরিককেও সঠিক তথ্য দিয়ে রাষ্ট্রের কাছ থেকে ন্যায়বিচার আদায় করে নিতে হবে।