মাদকাসক্তি থেকে সেরে ওঠা মানে শুধু মাদক গ্রহণ বন্ধ করা নয়; বরং এটি একটি চলমান পরিবর্তনের প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি মাদক ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাব কাটিয়ে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, সুস্থতা ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করেন, আত্মনির্ভরশীল জীবনযাপন করেন এবং নিজের সম্ভাবনাকে বিকশিত করার দিকে এগিয়ে যান।
বক্তারা বলেন, মাদক নির্ভরশীলতা থেকে একবারে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া সবসময় সম্ভব নয়। তাই রিকভারি একটি চলমান চর্চা, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের পথে এগিয়ে যেতে পারেন।
রিকভারি ডে উপলক্ষে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর শ্যামলীতে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের সভাকক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন ও ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব সাবসটেন্স ইউজ প্রফেশনালসের (আইসাপ) বাংলাদেশ চ্যাপ্টার যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।
সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী ‘রিকভারি মাস’ হিসেবে পালিত হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য—‘রিকভারি ইজ রিয়েল: রিস্টোরিং এভরি অ্যাসপেক্ট অব লাইফ’, অর্থাৎ ‘সেরে ওঠা বাস্তব: জীবনের প্রতিটি দিক পুনরুদ্ধার’।
অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও আইসাপ বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এম. এ. মোহিত কামাল।
তিনি বলেন, টেকসই রিকভারির জন্য চিকিৎসার পাশাপাশি পারিবারিক সহায়তা, চিকিৎসা-পরবর্তী সেবা, সহপাঠী বা একই অভিজ্ঞতার মানুষের সহায়তা, পুনরায় মাদক গ্রহণ প্রতিরোধ, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। চিকিৎসা শেষে পুরোনো পরিবেশ, বেকারত্ব, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও সামাজিক কলঙ্কের মধ্যে ফিরে গেলে পুনরায় মাদক ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
মাদক নির্ভরশীল ব্যক্তিকে ‘নেশাখোর’ বা অন্য কোনও অপমানজনক পরিচয়ে না ডেকে অসুস্থ ব্যক্তি হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একজন মানুষের বর্তমান সমস্যাই তার সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। কলঙ্ক নয়, সহমর্মিতাই রিকভারির পথকে সহজ করে।’
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের পরিচালক এবং আইসাপ বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল মাসুদ মূল প্রবন্ধে বলেন, সাম্প্রতিক জাতীয় গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনও না কোনও মাদক ব্যবহার করছেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এর মধ্যে ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সে এবং ৫৯ শতাংশ ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করেন। প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তাদের কাছে মাদক সহজলভ্য।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা বা পুনর্বাসন চান এবং ৬২ শতাংশ কাউন্সেলিং সেবা চান। অথচ মাত্র ১৩ শতাংশ চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের সুযোগ পেয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ব্যবধান দেশে মাদক চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবার ঘাটতি স্পষ্ট করে। বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসার অপ্রতুলতা এবং মাদক চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সম্পর্কে ভুল ধারণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টরের সিনিয়র সাইকোলজিস্ট রাখি গাঙ্গুলীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন দৈনিক ইত্তেফাকের সিনিয়র রিপোর্টার জামিউল আহ্সান শিপু, বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র ‘আশ্রয়’-এর পরিচালক মো. শামীম খান, সেফ হোম মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের পরিচালক লুৎফর রহমান মানিক এবং ‘উৎস’ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক মো. শাহাবুদ্দিন চৌধুরী সুমন।
বক্তারা বলেন, মানুষ মাদক নির্ভরশীলতা থেকে সেরে উঠতে চায়। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের সুযোগ সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না। মাদক সমস্যাকে শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে না দেখে জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
এ সময় নীতিনির্ধারকদের প্রতি জেলা পর্যায়ে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং সেবা যুক্ত করা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার, প্রশিক্ষিত জনবল বৃদ্ধি এবং নারী ও কিশোর-কিশোরীদের জন্য বিশেষায়িত সেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন দীর্ঘদিন ধরে মাদক প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছে। আইসাপ বাংলাদেশ চ্যাপ্টারও মাদক ব্যবহার প্রতিরোধ ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে পেশাজীবীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রমাণভিত্তিক চর্চার উন্নয়নে কাজ করছে।
রিকভারি মাস উপলক্ষে সংশ্লিষ্টদের বার্তা, ‘কলঙ্কের বদলে সহমর্মিতা, বিচারের বদলে সহায়তা এবং বর্জনের বদলে অন্তর্ভুক্তি—সেরে ওঠার পথকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। সেরে ওঠা সম্ভব, নতুন জীবনও সম্ভব।’