ফুটপাত ও সড়ক অবৈধ দখলমুক্ত করতে কয়েক মাস ধরে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে আসছে কর্তৃপক্ষ। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই কোথাও না কোথাও ছোট-বড় পরিসরে চলছে এসব অভিযান। তবে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) মিরপুর-১০ নম্বর সেকশনে এমন একটি অভিযানে হকারদের সঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অভিযানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের সংঘর্ষে রূপ নেয়। এতে পুলিশ সদস্যসহ কয়েকজন আহত হয়েছেন। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ডিএনসিসির দুটি গাড়ি।
গত কিছুদিন যেসব এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে, কিছুদিন পর আবার সেগুলোতে দোকান বসাতে দেখা গেছে। মিরপুরের ঘটনার পর আবারও প্রশ্ন উঠেছে, বারবার চালানো এসব উচ্ছেদ অভিযান কি ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার দীর্ঘমেয়াদি কোনও পরিকল্পনার অংশ? নাকি হকারদের ফিরে আসা ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় এগুলো শেষ পর্যন্ত সাময়িক উদ্যোগেই সীমাবদ্ধ থাকছে?
অভিযোগ আছে, এসব ফুটপাতে একধরনের অসাধু প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রচ্ছায়ায় ভাসমান ব্যবসায়ীরা দোকান বসান। মিরপুরের অভিযানে সংঘর্ষের পর বিষয়টি উঠে এসেছে এই আসনের সংসদ সদস্য ও বিরোধী দলীয় নেতা, জামায়াতের আমির ড. শফিকুর রহমানের বক্তব্যেও। তিনি ঘটনার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘দুর্ভাগ্যের বিষয়, মাসের পর মাস ধরে একদল অসাধু ও চাঁদাবাজ ব্যক্তি এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা নিয়ে তাদের এখানে ব্যবসা করার সুযোগ করে দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক ও বার্ষিক ভিত্তিতে চাঁদা আদায় করে থাকে। এটি অত্যন্ত নিন্দনীয় কর্মকাণ্ড। এর ফলে শেষ পর্যন্ত এর আর্থিক বোঝা গিয়ে পড়ে সাধারণ ক্রেতা ও জনগণের ওপর।’
উচ্ছেদের পর যে ফুটপাত আবার দখল হয়, তার অন্যতম একটি নজির ‘ভাইরাল মিজানের’ দোকান। প্রায় এক বছর আগে মিজানের ১০০ টাকায় গরুর মাংস ও ভাত বিক্রির কারণে পরিচিতি পান মিজান। এর আগে কয়েক দফা ভেঙে দেওয়া হলেও আবার দোকান বসিয়েছেন তিনি। সবশেষ মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) আরেক দফায় সরিয়ে দেওয়া হয় তার দোকান।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন সময়ে এসব অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি), ডিএনসিসি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। তবে এসব অভিযানের পর ফুটপাত কতটা কার্যকরভাবে দখলমুক্ত রাখা গেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। অবৈধ দোকান ও হকার উচ্ছেদে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগও একাধিক আলোচিত অভিযান চালিয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অঞ্চলভিত্তিক সমন্বিত অভিযানও চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে দখলদারদের উচ্ছেদের পাশাপাশি কোথাও কোথাও জরিমানাও করা হয়েছে।
গত ১ এপ্রিল ইন্দিরা রোড, গ্রিন রোড, আনন্দ সিনেমা হল, পান্থপথ ও ফার্মগেটের কারওয়ান বাজারসহ কয়েকটি এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে উচ্ছেদ অভিযানের কয়েক দিন পরই আবারও এসব ফুটপাত দখল হয়ে যায় এবং আগের অবস্থায় ফিরে আসে।
অভিযানের প্রথম দিন দখলদারদের সতর্ক করে অবৈধ স্থাপনা ও দোকান সরিয়ে নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। ফুটপাতের ওপর বাড়িয়ে দেওয়া দোকানের কিছু অংশ ভেঙে দেওয়া হয়। অন্যদের সরে যেতে বলা হয়। কিন্তু অভিযানের প্রভাব স্থায়ী হয়নি। অভিযান শেষ হওয়ার পর কয়েকটি এলাকায় আবারও অবৈধ দখল ফিরে আসে বলে জানা গেছে।
বারবার উচ্ছেদ, বারবার দখল
২৫ সেপ্টেম্বর শেওড়াপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনের আশপাশে অবৈধ স্থাপনা ও হকার উচ্ছেদে অভিযান চালায় কর্তৃপক্ষ। এর পাঁচ দিন পর, ৩০ সেপ্টেম্বর, উচ্ছেদ করা এলাকার বড় একটি অংশে আবারও হকাররা বসেছেন বলে জানা গেছে। মার্চ থেকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় প্রতি মাসেই নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে আসছে কর্তৃপক্ষ।
এতে প্রশ্ন উঠেছে, এসব অভিযান কি কোনও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অধীনে পরিচালিত হচ্ছে? অভিযানের পর এলাকাগুলো নজরদারিতে রাখা হচ্ছে কি না এবং পুনরায় দখল ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ফুটপাতের ব্যবসার ওপর জীবিকা নির্ভর করা হাজার হাজার হকারের জন্য বিকল্প জায়গা দেওয়া হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। নির্দিষ্ট জায়গা বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না থাকলে উচ্ছেদের পর হকাররা প্রায়ই একই ফুটপাতে ফিরে আসেন। ফলে তৈরি হয় উচ্ছেদ আর পুনর্দখলের এক ঘূর্ণাবর্ত। এ নিয়ে হকারদের মধ্যেও ক্ষোভ রয়েছে।
জামায়াত আমির এ বিষয়ে বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে সংঘাতের পরিবর্তে বাস্তবতা উপলব্ধি করে এমন একটি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যাতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অযথা ক্ষতিগ্রস্ত না হন এবং একই সঙ্গে সাধারণ জনগণের চলাচলের পথও নির্বিঘ্ন ও ব্যবহার উপযোগী থাকে। এ জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএনসিসির এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যেখানে নির্দেশনা পাওয়া যায়, সেখানেই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। সাধারণত এক-দুদিন আগে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
ওই কর্মকর্তা বলেন, “এখন নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চলছে। তবে এসব অভিযান নিয়ে কোনও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে কিনা, তা আমি জানি না।”
ডিএনসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, উচ্ছেদ অভিযানের কথা আগে থেকে জানানো হয় না। কারণ আগে থেকে জানলে হকার ও অবৈধ দখলদাররা প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পেয়ে যান। এ কারণেই অভিযানগুলো হঠাৎ পরিচালনা করা হয়।
বুধবার মিরপুর-১০ নম্বরে অভিযান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হকাররা আগে থেকেই অভিযানের খবর জানতেন। ফলে তারা জড়ো হয়ে অভিযানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ওপর হামলার সুযোগ পেয়েছেন।
নির্দিষ্ট জায়গা চান হকাররা
দুর্ঘটনায় এক পা হারানো মিরপুর-১০-এর প্রতিবন্ধী হকার মো. সোহেল মোল্লা ১২ বছর ধরে সেখানে পণ্য বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, ব্যবসা করার জন্য কর্তৃপক্ষের উচিত তাদের স্থায়ী জায়গা দেওয়া। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি ১২ বছর ধরে এখানে ব্যবসা করছি। সিটি করপোরেশন যদি আমাদের জন্য স্থায়ী জায়গার ব্যবস্থা করে, আমরা সেখানে চলে যাব। সবাই গেলে আমিও যাবো। কিন্তু এরপর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে আর কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এখন হঠাৎ এসে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে। আজও হঠাৎ এসে আমার এক লাখ টাকার বেশি মূল্যের মালামাল নিয়ে গেছে এবং সবকিছু ভেঙে দিয়েছে।”
সোহেলের অভিযোগ, জব্দ করা মালামাল পরে ব্যবসায়ীদের কাছেই নিলামে বিক্রি করা হয়। তিনি বলেন, ‘আমি একজন প্রতিবন্ধী মানুষ। আমি কী করবো? আমরা ব্যবসায়ীরা রাস্তায় নামছি। প্রশাসন কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটা আমরা দেখবো। আমরা এটা শেষ পর্যন্ত দেখবো। পেটে খাবার না থাকলে আর কিছুই গুরুত্বপূর্ণ না।’
মিরপুর-১০-এর আরেক হকার ইসমাইল শেখ বলেন, কর্তৃপক্ষের উচিত অন্তত আগে থেকে তাদের জানানো অথবা ব্যবসার জন্য নির্দিষ্ট জায়গার ব্যবস্থা করা।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখানে উচ্ছেদ অভিযান হবে, সেটা অন্তত আগে থেকে জানানো উচিত। অথবা আমাদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গার ব্যবস্থা করা উচিত। হঠাৎ করে উচ্ছেদ করে আমাদের যাওয়ার কোনও জায়গা না দিলে আমরা কোথায় যাব? আমাদের সবার পরিবার আছে।’
মিরপুরে কী ঘটেছিল?
বুধবার সকাল ১০টার দিকে মিরপুর-১০ থেকে মিরপুর-১৪ পর্যন্ত এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। সাড়ে ১০টার দিকে হোপ মার্কেটের সামনে ফুটপাতে ডিএনসিসির অভিযানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে হকারদের সংঘর্ষ শুরু হয়। ডিএনসিসির দুটি ডাম্প ট্রাকে আগুন দেওয়া হয় এবং তিনটি বুলডোজার ভাঙচুর করা হয়। পুলিশের একটি গাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় হকারদের ভাষ্য, ডিএনসিসির লোকজন ফুটপাতের দোকান সরাতে শুরু করলে একটি বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে পড়ে আগুনের সূত্রপাত হয়।
তাদের দাবি, আগুনে কিছু মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হকাররা উচ্ছেদ অভিযানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে লাঠি ও ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। পরে ডিএনসিসির দুটি গাড়ি ভাঙচুর করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ছিঁড়ে পড়া বৈদ্যুতিক তারের আগুন বায়তুল কুদ্দুস জামে মসজিদের পশ্চিম পাশের একটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
সংঘর্ষের কারণে কিছু সময়ের জন্য মিরপুর-১০ এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরিস্থিতির অবনতি হলে পুলিশ পরে সেখানে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করে। ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাসের রিকাবদার বলেন, সংঘর্ষে পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক। দুপুর ২টা ২০ মিনিটের দিকে আবারও উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়।
ডিএনসিসি: অভিযান চলবে
ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, পথচারীরা যাতে ফুটপাত ব্যবহার করতে পারেন, সে জন্য অবৈধ দখলমুক্ত রাখতে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা নগরবাসীকে পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল একটি শহর দিতে চাই এবং ফুটপাতগুলো হাঁটার উপযোগী রাখতে চাই। আমরা কনোভাবেই ফুটপাত কাউকে দখল করে রাখতে দেবো না।’
তিনি বলেন, ‘যতদিন এসব দখলদার ফুটপাত দখল করে রাখবে, ততদিন আমাদের চেষ্টা চলবে। ফুটপাত পুরোপুরি দখলমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আমরা এভাবেই উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে যাবো।’
ফুটপাতে ব্যবসা করা হকারদের পুনর্বাসনের জন্য শুরুতে নির্দিষ্ট জায়গার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলেও উল্লেখ করেন ডিএনসিসির এই প্রশাসক। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে আরও বলেন, ‘আমি শুরুতে ফুটপাতে ব্যবসা করা হকারদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করেছিলাম। তারা যাতে ব্যবসা করতে পারেন, সে জন্য নির্দিষ্ট জায়গা দেওয়ার বিভিন্ন উদ্যোগও নিয়েছিলাম।’ তবে হকাররা পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে আগ্রহী ছিলেন না এবং ফুটপাতেই ব্যবসা চালিয়ে যেতে চেয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘হকাররা পুরোপুরি ফুটপাত ছেড়ে না দেওয়া পর্যন্ত নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চলবে।’