বিমানবন্দরে জামায়াত এমপিদের ‘তুলকালাম কাণ্ড’

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ওমরাহ ফেরত বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর সংসদ সদস্য ও নেতাদের ‘তুলকালাম কাণ্ড’ ঘটানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। লাগেজ পেতে দেরি ও সঠিক সময়ে জমজমের পানি না পাওয়ার কারণে বিমানবন্দরে তারা হট্টগোল করতে থাকেন বলে জানা গেছে। 

জামায়াতের সংসদ সদস্যদের এমন মারমুখী আচরণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সংসদ সদস্যরা এ বিষয়ে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। পরে বিমান এ ঘটনায় দায়ীদের চিহ্নিত করে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সকালে এ ঘটনা ঘটে।

জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা ১০ মিনিটে মদিনা থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বিজি ৩৩৮ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। ওই ফ্লাইটেই জামায়াতের সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ নেতারাও ছিলেন। ফ্লাইটটি অবতরণের পর তারা নেমে ইমিগ্রেশন শেষ করেন। এরপর তারা ট্রলি বা লাগেজ এবং জমজমের পানির জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। একপর্যায়ে তারা হট্টগোল শুরু করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে ১০টা ৩৫ মিনিটের দিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিমানবন্দরে কর্মরত এক কর্মী জানান, নির্বাহী পরিচালক আসার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। সদ্য জামায়াতে যোগ দেওয়া মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান নির্বাহী পরিচালকের ওপর চড়াও হন। তাকে নানা ধরনের অসম্মানজনক ভাষায় কথা বলতে থাকেন। তিনি নির্বাহী পরিচালককে অশ্রাব্য ভাষায় বিমানবন্দরের দায়িত্ব থেকে বের করে দেয়ারও হুমকি দেন। এমন অবস্থায় তিনি শান্ত থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তিনি তাদের বলেন, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা বিমান দিয়ে থাকে। পরে সেখানে বিমানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত হলে তাদের সঙ্গেও অসদাচরণ করেন সংসদ সদস্য ও নেতারা। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং করে বিমান, জমজমের পানিও দেবে বিমান- এমনটা বোঝানোর পর তারা শান্ত হন।

বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ

একপর্যায়ে সংসদ সদস্যরা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি৩৩৮ ফ্লাইটে লাগেজ নিয়ে ভোগান্তির অভিযোগ করেন। এতে স্বাক্ষর করেন চার সংসদ সদস্য। যাত্রী হয়রানি, লাগেজ যথাযথভাবে বুঝিয়ে না দেওয়া এবং দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ তুলে তারা বিমান কর্তৃপক্ষের কাছে এই লিখিত অভিযোগ দেন।

অভিযোগকারী চার সংসদ সদস্য হলেন, শেরপুর-১ আসনের রাশেদুল ইসলাম রাশেদ, ঢাকা-৫ আসনের মোহাম্মদ কামাল হোসেন, গাজীপুর-৪ আসনের সালাহউদ্দিন আইউবি ও খুলনা-২ আসনের জাহাঙ্গীর হুসাইন।

লিখিত অভিযোগে বলা হয়, বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে মদিনা থেকে ঢাকায় অবতরণ করে বিজি৩৩৮ ফ্লাইটটি। তবে অবতরণের পর তিন ঘণ্টা পার হলেও বেশির ভাগ যাত্রী তাদের ট্যাগযুক্ত লাগেজ বুঝে পাননি।

আরও বলা হয়, ওই ফ্লাইটে অন্তত ৩৫ জন সংসদ সদস্যসহ বিপুল সংখ্যক যাত্রী ছিলেন। লাগেজ না পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও এর যৌক্তিক কারণ জানানো কিংবা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় বিমানবন্দরে অপেক্ষা করতে হয়।

ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেন অভিযোগপত্রের ছবি নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এই ভোগান্তির শেষ কোথায়?’

তিনি আরও লেখেন, ‘আজ সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে অবতরণ করা বিজি৩৩৮ ফ্লাইটের সাধারণ যাত্রীদের পক্ষ হতে যাত্রী হয়রানি, মালামাল যথাযথভাবে বুঝিয়ে না পাওয়া ও কর্তব্যে অবহেলার কারণে আমরা ৪ জন জাতীয় সংসদ সদস্য বিমান কর্তৃপক্ষ বরাবর অভিযোগ দাখিল করলাম।’

ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে যা দেখা যায়

ভিডিওতে দেখা যায়, বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে সামনে পেয়ে জামায়াত নেতারা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। জামায়াত নেতা মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামানকে নির্বাহী পরিচালকের দিকে প্রায়ই তেড়ে যাচ্ছিলেন। তাকে উত্তেজিত ভাষায় কথা বলতে দেখা যায়। এমনকি তিনি তাকে বের করে দেওয়ারও হুমকি দিতে দেখা যায়।

এদিকে এ বিষয়ে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমি আসলে কোনও তর্কে জড়াইনি, তিনি কোনও উত্তর শুনতে চাননি। বরং নিজের উত্তেজনা প্রকাশ করেছেন। আমি তাকে শান্ত করার চেষ্টা করেছি।

যা বলছে বিমান

পবিত্র উমরাহ পালন শেষে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা ১০ মিনিটে মদিনা থেকে আগত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বিজি ৩৩৮ (বিজি৩৩৮)-এর যাত্রীদের জমজমের পানি সরবরাহে অনাকাঙ্ক্ষিত সাময়িক বিলম্বের ঘটনায় তাৎক্ষণিক ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ। এক বিবৃতিতে তারা এ কথা জানায়। 

প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, কন্টেইনার অফলোডিং ও পরিচালনগত গাফিলতির কারণে ব্যাগেজ বেল্টে সময়মতো পানি পৌঁছাতে বিলম্ব ঘটে। সেবার মান ও কাজের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে মন্ত্রী মহোদয়ের নির্দেশে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যাগেজ ইনচার্জ মনিরুল ইসলাম প্রধান এবং ফ্লাইট সুপারভাইজার সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

উল্লেখ্য, ঘটনাটি নজরে আসামাত্রই উমরাহ হাজিদের সাময়িক দুর্ভোগ নিরসনে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ নিজস্ব সংরক্ষিত স্টক থেকে দ্রুত জমজমের পানি বিতরণের ব্যবস্থা করে এবং পরে অপর কন্টেইনারটি দ্রুত শনাক্তপূর্বক সরবরাহ নিশ্চিত করে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের নিরবচ্ছিন্ন ও সর্বোচ্চ মানের সেবা প্রদানে অঙ্গীকারবদ্ধ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর অভ্যন্তরীণ তদারকি জোরদার করেছে।

প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার সকালে লাগেজ দেরি ও জমজমের পানি না পাওয়া নিয়ে জামায়াতের ৪ সংসদ সদস্যদের তোপের মুখে পড়েন নির্বাহী পরিচালক। পরে তারা বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন।