আমরা মায়ের গর্ভ থেকে পৃথিবীতে আসি। জীবনের শুরুর সময়টুকু বাবা-মা আমাদের লালন-পালন করেন, পরিবার থেকে পরিচিতি ও প্রাথমিক শিক্ষাগুলো পাই। কিন্তু একটা সময় আমাদের সরাসরি শিক্ষকদের হাতে অর্পণ করা হয়। তখন শুধু বইয়ের শিক্ষা নয়, মানবিক শিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা, মানুষ হওয়ার শিক্ষা, মানুষের প্রতি মানুষের আচরণ; জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পাঠই আমরা শিক্ষকদের কাছ থেকে শিখি।
প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আমার জীবনে যত শিক্ষক আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন, দীক্ষা দিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকের প্রতি আমার শ্রদ্ধা। তাঁদের সামনে মাথা নত করার মতোই আমার অনুভূতি। তারপরও কিছু শিক্ষক আছেন, যাঁদের কথা আলাদা করে না বললে নিজের ভেতরেই এক ধরনের অপরাধবোধ কাজ করে।
আমার মাধ্যমিক জীবনের তেমনই একজন শিক্ষক ছিলেন বাবু জ্যোতিলাল দে। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। পরলোক গমন করেছেন। কিন্তু আমার জীবনে তাঁর যে উপস্থিতি, যে শিক্ষা, যে ঋণ, তা তো চলে যায়নি। আমি যখন আলিনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম, তিনি আমাদের ইংরেজি পড়াতেন। একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁকে দেখেছি শুধু শ্রেণিকক্ষের ভেতরে নয়, শিক্ষার্থীদের জীবনের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত থাকতে। এমন অনেক শিক্ষার্থী ছিল, যাদের পড়াশোনার খরচ দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। তিনি নিজের বেতনের টাকা থেকে তাদের পড়ার খরচ দিতেন। কারও খাতা-কলম কেনার টাকা নেই, সেটাও নিজের পকেট থেকে দিতেন।
একজন শিক্ষক চাইলে তাঁর দায়িত্বকে স্কুলের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে পারেন। কিন্তু বাবু জ্যোতিলাল দে তেমন ছিলেন না। স্কুলের সময় সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত। এরপরও সন্ধ্যার পর শিক্ষার্থীরা বাসায় ঠিকমতো পড়াশোনা করছে কি না, কারও কোনো অসুবিধা হচ্ছে কি না, তা জানতে তিনি নিজেই সাইকেল চালিয়ে অনেক দূর থেকে আবার স্কুল এলাকার দিকে আসতেন। শিক্ষার্থীদের খোঁজ নিতেন। আজ পেছনে ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, শিক্ষকতা তাঁর কাছে শুধু একটি পেশা ছিল না। শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর যে দায়িত্ববোধ, মমতা ও দায়বদ্ধতা ছিল, সেটাই তাঁকে আমার কাছে আলাদা করে তুলেছে।
আমি আজ যে জায়গায় আছি, সেখানে পৌঁছানোর পেছনে বাবু জ্যোতিলাল দের অবদান আমি কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারি না। আমার জীবনে তিনি ছিলেন একটি খুঁটির মতো, একটি স্তম্ভের মতো। মাথার ওপর ছাতার মতো ছিলেন। জীবনের অনেক পরিবর্তনের পেছনে তাঁর শিক্ষা জড়িয়ে আছে।
মানুষ হওয়া, মানুষের প্রতি সম্মান দেখানো, সমাজের প্রতি কর্তব্যবোধ রাখা, বড়দের সম্মান করা, শ্রদ্ধাবোধ ধারণ করা এবং নৈতিকতার জায়গায় অটল থাকা; এই শিক্ষাগুলো আমি বাবু জ্যোতিলাল দের কাছ থেকে পেয়েছি। আজ আমার জীবনে এই মূল্যবোধগুলোর কোনো জায়গা যদি থেকে থাকে, তার পেছনে তাঁর অবদান আছে।
স্যার আজ নেই। এই না-থাকার কথাটাই কখনো কখনো খুব বেশি মনে পড়ে। মনে হয়, যাঁর কাছ থেকে এত কিছু পেয়েছি, তাঁকে হয়তো আর সামনে বসে বলা হবে না; স্যার, আপনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। জীবনের এই জায়গায় এসে তাঁর কথা মনে করলে সেই না-বলা কথাগুলো আরও বেশি অনুভব করি।
আমি পরম করুণাময়ের কাছে কামনা করি, বাবু জ্যোতিলাল দে যেখানেই থাকুন, তাঁর আত্মা যেন চিরশান্তিতে থাকে। তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার কোনো শেষ নেই। আমি তাঁর কাছে চিরঋণী।
—জনসংযোগ ডিভিশন প্রধান, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ