নারীর নেতৃত্বে মানবিক এশিয়া 

দুর্যোগ-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে জেন্ডার-সংবেদনশীলতা ও সামাজিক জবাবদিহি জোরদারের আহ্বান

যে কোনও দুর্যোগে নারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, তারাই প্রথম সাড়াদানকারী। তৃণমূলে বাস্তবায়নকারী হিসেবে নারী নেত্রীদের ভূমিকা স্বীকৃতি পেলেও জাতীয় বা আন্তর্জাতিক ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীপ্রধান সংগঠনগুলোর মতামত এখনও অনেক সময় অন্তর্ভুক্ত হয় না। এ জন্য তৃণমূলের অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া, জেন্ডার-সংবেদনশীল উদ্যোগ বাড়ানো এবং সামাজিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ‘নারীর নেতৃত্বে মানবিক এশিয়া’ শীর্ষক এক রাউন্ড টেবিল বৈঠকের আলোচকরা।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাজধানীর ফার্মগেটের তুলা ভবনের প্রশিক্ষণ কক্ষে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ‘শিফট এশিয়া’ প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ উইমেন হিউম্যানিটারিয়ান প্ল্যাটফর্ম (বিডব্লিউএইচপি) আয়োজিত এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে আভাস এবং সহযোগিতায় অক্সফাম। বৈঠকের লক্ষ্য ছিল জেন্ডার-রূপান্তরমুখী মানবিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নীতি ও অ্যাডভোকেসি কার্যক্রমকে এগিয়ে নেওয়া যেখানে নারী প্রধান সংগঠনগুলো শুধু অংশগ্রহণকারী হিসেবে নন, বরং নীতি নির্ধারণী পর্যায়েও মূল ভুমিকায় থাকবেন।

বৈঠকের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন বিডব্লিউএইচপির (বিডব্লিউএইচপি) সভাপ্রধান ও আভাসের নির্বাহী পরিচালক রহিমা সুলতানা কাজল। সঞ্চালনা করেন বিডব্লিউএইচপির (বিডব্লিউএইচপি) নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং নারীপক্ষের রওশন আরা। শিফট এশিয়া প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য উপস্থাপনা করেন অক্সফামের জ্যেষ্ঠ প্রোগ্রাম কর্মকর্তা খাদিজা আক্তার অন্তরা। পরবর্তী সময়ে পরামর্শক মুনশি মাহবুবুর রহমান বৈঠকে উপস্থিত প্রতিনিধিদের সামনে সামাজিক জবাবদিহি নিশ্চিতে ‘টুলকিট’ তুলে ধরেন। এরপর টুলকিটটি ও মানবিক কার্যক্রমে নারীবাদী নেতৃত্ব নিশ্চিত নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা হয়।

আলোচনায় বাংলাদেশের দুর্যোগ এবং মানবিক সহায়তা ব্যবস্থায় গত তিন দশকে অগ্রগতির পাশাপাশি বিদ্যমান ঘাটতিও উঠে আসে। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, দুর্যোগে নারীরা সাধারণত ক্ষতিগ্রস্থ এবং তৃণমূল পর্যায়ে প্রথম সাড়াদানকারী হলেও উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীপ্রধান সংগঠন ও তৃণমূল নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ যথেষ্ট নয়। তাই ক্ষমতা ও দায়িত্বের বণ্টনে পরিবর্তন আনা এবং উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে নারীর নেতৃত্ব ও নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করা অতি প্রয়োজন।

বক্তারা আরও বলেন, জেন্ডার-সংবেদনশীল মানবিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে তৃণমূল থেকে নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যেতে হবে। শুধু প্রকল্পভিত্তিক আলোচনা নয়, নিয়মিত বিভিন্ন অ্যাডভোকেসি আয়োজন দীর্ঘস্থায়ী এবং নীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে, পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়নের পথ তৈরি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় নারী নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা, নারী সংগঠনগুলোর কাজ এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

রহিমা সুলতানা কাজল আলোচনায় ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার পর বাংলাদশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগের সাধুবাদ জানিয়ে তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। একই সাথে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে দুর্যোগে নারীদের ভোগান্তির অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অগ্রগতি থাকলেও আরও অনেক ক্ষেত্রে উন্নতির সুযোগ রয়েছে। নারীবাদী নেতৃত্ব, জেন্ডার-সংবেদনশীলতা ও সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে তৃণমূলের অভিজ্ঞ তার সঙ্গে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সংযোগ এবং সামাজিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। 

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সানজিদা ইয়াসমিন সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন, পাশাপাশি দুর্যোগের বহুমাত্রিক প্রভাব এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জেন্ডার-সংবেদনশীলতা কেবল নারী-পুরুষের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়; শিশু, প্রবীণসহ বিভিন্ন ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও মানবিক সহায়তা পরিকল্পনার উপরে গুরুত্বারোপ করেন। দেশে এবং বিদেশে কর্মরত নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, ন্যায্য পারিশ্রমিক ও সুরক্ষার বিষয়টিও তার আলোচনায় উঠে আসে।

বৈঠকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের সাবেক পরিচালক ও সহযোগী প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরিন সোস্যাল একাউন্টেবিলিটি টুলকিট বাস্তবায়নে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ের সমন্বয়ের উপর গুরুত্বারোপ করেন। টুলকিটটি সহজবোধ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাষায়, বিশেষ করে সহজ বাংলায় তৈরি করা জরুরি, যাতে তৃণমূলের নারীরা তা বুঝতে ও স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োগ করতে পারে।

আলোচকরা টুলকিটকে আরও ব্যবহারবান্ধব ও বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগের প্রেক্ষাপটের উপযোগী করার সুপারিশ করেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বিভাগের মধ্যে এর ব্যবহার সীমাবদ্ধ না রেখে অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের কাজেও সামাজিক জবাবদিহি কাঠামো প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। এছাড়াও টুলকিটটিকে সময়োপযোগী ব্যাখ্যা করে, বিভিন্ন দুর্যোগের সময় কাজে লাগানোর অভিমত ব্যক্ত করেন।

অক্সফামের জেন্ডার সমতা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ রওশন আক্তার উর্মি ও টুলকিটের উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং আলোচনার সুপারিশগুলো বিবেচনায় নিয়ে এটি চূড়ান্ত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

বৈঠকে শিফট এশিয়া প্রকল্পের মাধ্যমে বিডব্লিউএইচপি এবং উইমেন কমিউনিটি লিডারশিপ প্ল্যাটফর্মের (ডব্লিউসিএলপি) কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগের প্রশংসা করেন অংশগ্রহণকারীরা। তাদের মতে, তৃণমূলের নারী নেতৃত্বকে শক্তিশালী করা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটানো গেলে মানবিক সহায়তা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক হতে পারে।

বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন বিডব্লিউএইচপির সদস্য ও বাদাবন সংঘের নির্বাহী পরিচালক লিপি রহমান, ডব্লিউসিএলপির সদস্য হোমায়রা বেগম, সম্পূর্ণা'র প্রেসিডেন্ট জয়া শিকদার, সাঙ্গাতের কো-অর্ডিনেটর বিপাশা সাঈদ, অগ্রযাত্রা নারী ফোরামের জাকিয়া শিশির, আরএসিআইএন-এর নির্বাহী পরিচালক ও বিডব্লিউএইচপির নির্বাহী কমিটির সদস্য আসমা আক্তার মুক্তা, স্টার্ট নেটওয়ার্ক এবং নাহাবের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন নারী অধিকার ও মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিরা।